কালো জাদু, বদ নজর কিংবা হিংসুক মানুষের অনিষ্ট থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে ইসলামে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর দিকনির্দেশনা রয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব আমল বর্ণনা করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও যেকোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচতে সর্বদা মহান আল্লাহর দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। বিশেষ করে সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠের মাধ্যমে তিনি সুরক্ষা চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনের ১১৩তম সুরায় সৃষ্টির অনিষ্ট, রাতের অন্ধকারের ক্ষতিকর দিক, জাদুকরের জাদু এবং হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। অন্যদিকে ১১৪তম সুরায় শয়তানের প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
সুরা ফালাকের পাঁচটি আয়াতে জীবনের বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর দিক থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ রয়েছে। সুরার সূচনায় প্রভাতের প্রতিপালকের শরণাপন্ন হতে বলা হয়েছে। এরপর—
বিশেষ করে শেষ আয়াতে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে বাঁচার কথা আলাদাভাবে বলা হয়েছে। কারণ, হিংসা মানুষের ভেতরে বিদ্বেষ তৈরি করে এবং অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা বাড়ায়।
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সূচনা পর্বে জিন ও মানুষের বদ নজরের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন বাক্যে দোয়া করতেন। কিন্তু যখন সুরা ফালাক ও সুরা নাস নাজিল হলো, তখন থেকে তিনি অন্য সব বাক্য ছেড়ে কেবল এই দুই সুরা পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর আশ্রয় নিতে শুরু করেন। (জামে তিরমিজি, সুনানে ইবনে মাজাহ)। এতে বোঝা যায়, যেকোনো অনিষ্ট থেকে সুরক্ষায় এই দুই সুরার আমল অত্যন্ত বরকতময়।
সহিহ বুখারিতে উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, লাবিদ ইবনুল আসাম নামের এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জাদু করেছিল। এর প্রভাবে তিনি কখনো কখনো মনে করতেন একটি কাজ করেছেন, অথচ বাস্তবে তা করেননি। পরবর্তীকালে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয় এবং তিনি আল্লাহর অনুগ্রহে তা থেকে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করেন।
তবে এ ঘটনা থেকে আতঙ্কিত হওয়া বা জীবনের প্রতিটি সমস্যাকেই জাদুটোনা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বরং এর আসল শিক্ষা হলো—যেকোনো অবস্থাতে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা এবং তাঁর শেখানো পদ্ধতিতে আশ্রয় প্রার্থনা করা।
ইসলামে জাদু করা, শেখা বা করানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১০২ নম্বর আয়াতে জাদুর আলোচনার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ এর মাধ্যমে কারও সামান্যতম ক্ষতিও করতে পারে না।
একই সঙ্গে গণক, জাদুকর বা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে যাওয়া এবং তাদের কথা বিশ্বাস করার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। তাই যেকোনো বিপদে প্রতারক কবিরাজ, ভণ্ড গণক বা কুফরি তাবিজ-কবচের শরণাপন্ন না হয়ে খাঁটি মনে কোরআন-সুন্নাহর আমল আঁকড়ে ধরা উচিত।
অন্যের সাফল্য বা নিয়ামত দেখে হিংসা করা মারাত্মক গুনাহ। সুরা ফালাকের শিক্ষা হলো—হিংসুকের হিংসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া এবং নিজের অন্তরকে হিংসা-বিদ্বেষ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।
মনে রাখা প্রয়োজন, সুরা ফালাক ও সুরা নাস শুধু বিপদে পড়ার পর পড়ার বিষয় নয়; এগুলো দৈনন্দিন জীবনের আত্মরক্ষা, মনের প্রশান্তি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম। নিয়মিত এসব সুরা পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন নিজেকে ও তাঁর পরিবারকে সব ধরনের অদৃশ্য অনিষ্ট থেকে হেফাজতে রাখতে পারেন।
মতামত