ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

নোট-গাইডই কি যথেষ্ট



নোট-গাইডই কি যথেষ্ট
নোট-গাইডই কি যথেষ্ট

নোট, গাইড আর সাজেশনের স্তূপের নিচে চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে আছে বেচারা পাঠ্যবই। দিনের আলো দেখাটা তার জন্য দুর্লভ এক ব্যাপার। তাই সে ভারি অভিমান করেছে। তার কথা শুনতে সোজা চলে গেছে কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব!

নোট-গাইড পড়েই তো ছেলে-মেয়েরা পাস করে যায়। হ্যাঁ, পাস করে যায়, কিন্তু বিষয়টি মোটেও শিখে যায় না! তুমি নিজেই বলো, ট্রেলার দেখে কি সিনেমা দেখা হয়? যেকোনো গাইড তোমাকে দেয় উত্তরটা, আর আমি দেখাই উত্তরে পৌঁছানোর পথটা। এই পথটাই আসল। প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে এলেই সারাংশ-পড়ুয়া আটকে যায়; কারণ, সে কিছু তথ্য জানে; কিন্তু তথ্যগুলোর সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক বুঝতে পারে না।

এক কামারের ছেলের গল্প বলি তাহলে। ছেলেবেলায় স্কুলের শিক্ষা বলতে তার কিছুই জোটেনি। চৌদ্দ বছর বয়সে সে লন্ডনের এক বই বাঁধাইয়ের দোকানে শিক্ষানবিশ হিসেবে ঢোকে। দোকানে যেসব বই বাঁধাই করতে আসত, মালিকের অনুমতি নিয়ে সে সেগুলো পড়ে ফেলত। বই বাঁধাইয়ের সময় তাঁকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে জেন মার্সের ‘কনভারসেশনস অন কেমিস্ট্রি’ আর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার বিদ্যুৎ-বিষয়ক নিবন্ধ। বই পড়ে সে তাঁর শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে কাজে লাগাতে চাইত। ছেলেটির নাম মাইকেল ফ্যারাডে। নামটা চেনা চেনা লাগছে? হ্যাঁ, তিনিই সেই ইংরেজ বিজ্ঞানী, যিনি ‘বিদ্যুতের জনক’ নামে পরিচিত। তাঁর বই বাঁধাইয়ের কাজের ফাঁকে পড়া থেকে একদিন বেরিয়ে এল তড়িৎ আবেশের সূত্র, যার ওপর ভর করে আজ চলছে পৃথিবীর সব জেনারেটর আর মোটর। তিনি যদি আনন্দ নিয়ে বই না পড়তেন, তাহলে তোমার মাথার ওপর ফ্যান, মোটর গাড়ির চাকা, পানির পাম্প এবং বৈদ্যুতিক যত কিছু আছে, সবই অকল্পনীয় থাকত। গাইড বই পড়ে কিন্তু তিনি এই আবিষ্কারগুলো করেননি।

সমস্যা আছে কি না, সেটা তোমাদের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। একটা মজার ব্যাপার শোনো। ২০১৮ সালে ডেলগাদো ও তাঁর সহকর্মীরা ৫৪টি গবেষণার ফলাফল একত্রে পর্যালোচনা করে দেখেন, যেখানে মোট পাঠক বা অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি। তাঁদের রিভিউ পেপারটির নাম দেন ‘কাগজের বইগুলো ফেলে দিয়েন না’। তাঁদের গবেষণায় তাঁরা দেখতে পান, তথ্যভিত্তিক লেখা পড়ার বেলায় কাগজে পড়া শিক্ষার্থীরা ডিভাইসের পর্দায় পড়াদের চেয়ে ভালো বুঝেছিল এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল। গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়, পর্দায় পড়ার সময় পাঠকদের মধ্যে একটি অতি আত্মবিশ্বাস কাজ করে। তারা মনে করে, তারা খুব দ্রুত এবং ভালো বুঝছে, কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষা নেওয়ার পর দেখা যায়, কাগজের পাঠকদের তুলনায় তাদের পারফরম্যান্স ও মনে রাখার ক্ষমতা অনেক কম। ডিজিটাল ডিভাইসে সাধারণত দ্রুত স্ক্রল বা স্কিম করার অভ্যাসের কারণে মস্তিস্ক গভীরভাবে তথ্য গ্রহণ করতে পারে না। তাই পাঠকেরা একটা ‘বুঝে ফেলেছি’ ফাঁদে আটকে যায়।

মোটেও না! এখানেই বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ঠকে। দাগিয়ে দাগিয়ে বারবার পড়লে মনে হয় সব চেনা। কিন্তু বাস্তবে কিছুই মাথায় দাগ কাটে না। শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানী ডানলস্কি ও তাঁর সহকর্মীরা ২০১৩ সালে বিভিন্ন পড়ার কৌশল যাচাই করে দেখিয়েছেন, দাগিয়ে বারবার পড়ার উপকার সবচেয়ে কম। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি কাজ দেয় নিজেকে যাচাই করা এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে বারবার পড়া। তাই নিয়ম হলো একটি অধ্যায় পড়ার পর বই বন্ধ করে ফেলা। এবার পুরো বিষয়টি নিজের ভাষায় খাতায় লিখে ফেলা, এবং তারপর মূল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা—কী কী বাদ পড়ল।

গাইড বই তোমাকে একটা ঠিকানা ধরিয়ে দেয়; আমি তোমাকে দিই পুরো মানচিত্র। তুমি গাইড বই ব্যবহার করতে পারো। কিন্তু সেটা অবশ্যই মূল বই পড়ার পরে। ঠিকানাওয়ালা একবার রাস্তা বদলালেই হারিয়ে যায়, মানচিত্রওয়ালা নতুন পথ খুঁজে নেয়। তুমি কোনটা হতে চাও? আজ তবে আসি, নিয়মিত এসো কিন্তু!

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নোট-গাইডই কি যথেষ্ট

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

নোট, গাইড আর সাজেশনের স্তূপের নিচে চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে পড়ে আছে বেচারা পাঠ্যবই। দিনের আলো দেখাটা তার জন্য দুর্লভ এক ব্যাপার। তাই সে ভারি অভিমান করেছে। তার কথা শুনতে সোজা চলে গেছে কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব!

নোট-গাইড পড়েই তো ছেলে-মেয়েরা পাস করে যায়। হ্যাঁ, পাস করে যায়, কিন্তু বিষয়টি মোটেও শিখে যায় না! তুমি নিজেই বলো, ট্রেলার দেখে কি সিনেমা দেখা হয়? যেকোনো গাইড তোমাকে দেয় উত্তরটা, আর আমি দেখাই উত্তরে পৌঁছানোর পথটা। এই পথটাই আসল। প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে এলেই সারাংশ-পড়ুয়া আটকে যায়; কারণ, সে কিছু তথ্য জানে; কিন্তু তথ্যগুলোর সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক বুঝতে পারে না।

এক কামারের ছেলের গল্প বলি তাহলে। ছেলেবেলায় স্কুলের শিক্ষা বলতে তার কিছুই জোটেনি। চৌদ্দ বছর বয়সে সে লন্ডনের এক বই বাঁধাইয়ের দোকানে শিক্ষানবিশ হিসেবে ঢোকে। দোকানে যেসব বই বাঁধাই করতে আসত, মালিকের অনুমতি নিয়ে সে সেগুলো পড়ে ফেলত। বই বাঁধাইয়ের সময় তাঁকে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করে জেন মার্সের ‘কনভারসেশনস অন কেমিস্ট্রি’ আর এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার বিদ্যুৎ-বিষয়ক নিবন্ধ। বই পড়ে সে তাঁর শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে কাজে লাগাতে চাইত। ছেলেটির নাম মাইকেল ফ্যারাডে। নামটা চেনা চেনা লাগছে? হ্যাঁ, তিনিই সেই ইংরেজ বিজ্ঞানী, যিনি ‘বিদ্যুতের জনক’ নামে পরিচিত। তাঁর বই বাঁধাইয়ের কাজের ফাঁকে পড়া থেকে একদিন বেরিয়ে এল তড়িৎ আবেশের সূত্র, যার ওপর ভর করে আজ চলছে পৃথিবীর সব জেনারেটর আর মোটর। তিনি যদি আনন্দ নিয়ে বই না পড়তেন, তাহলে তোমার মাথার ওপর ফ্যান, মোটর গাড়ির চাকা, পানির পাম্প এবং বৈদ্যুতিক যত কিছু আছে, সবই অকল্পনীয় থাকত। গাইড বই পড়ে কিন্তু তিনি এই আবিষ্কারগুলো করেননি।

সমস্যা আছে কি না, সেটা তোমাদের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। একটা মজার ব্যাপার শোনো। ২০১৮ সালে ডেলগাদো ও তাঁর সহকর্মীরা ৫৪টি গবেষণার ফলাফল একত্রে পর্যালোচনা করে দেখেন, যেখানে মোট পাঠক বা অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি। তাঁদের রিভিউ পেপারটির নাম দেন ‘কাগজের বইগুলো ফেলে দিয়েন না’। তাঁদের গবেষণায় তাঁরা দেখতে পান, তথ্যভিত্তিক লেখা পড়ার বেলায় কাগজে পড়া শিক্ষার্থীরা ডিভাইসের পর্দায় পড়াদের চেয়ে ভালো বুঝেছিল এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল। গবেষণায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়, পর্দায় পড়ার সময় পাঠকদের মধ্যে একটি অতি আত্মবিশ্বাস কাজ করে। তারা মনে করে, তারা খুব দ্রুত এবং ভালো বুঝছে, কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষা নেওয়ার পর দেখা যায়, কাগজের পাঠকদের তুলনায় তাদের পারফরম্যান্স ও মনে রাখার ক্ষমতা অনেক কম। ডিজিটাল ডিভাইসে সাধারণত দ্রুত স্ক্রল বা স্কিম করার অভ্যাসের কারণে মস্তিস্ক গভীরভাবে তথ্য গ্রহণ করতে পারে না। তাই পাঠকেরা একটা ‘বুঝে ফেলেছি’ ফাঁদে আটকে যায়।

মোটেও না! এখানেই বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ঠকে। দাগিয়ে দাগিয়ে বারবার পড়লে মনে হয় সব চেনা। কিন্তু বাস্তবে কিছুই মাথায় দাগ কাটে না। শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানী ডানলস্কি ও তাঁর সহকর্মীরা ২০১৩ সালে বিভিন্ন পড়ার কৌশল যাচাই করে দেখিয়েছেন, দাগিয়ে বারবার পড়ার উপকার সবচেয়ে কম। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি কাজ দেয় নিজেকে যাচাই করা এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে বারবার পড়া। তাই নিয়ম হলো একটি অধ্যায় পড়ার পর বই বন্ধ করে ফেলা। এবার পুরো বিষয়টি নিজের ভাষায় খাতায় লিখে ফেলা, এবং তারপর মূল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা—কী কী বাদ পড়ল।

গাইড বই তোমাকে একটা ঠিকানা ধরিয়ে দেয়; আমি তোমাকে দিই পুরো মানচিত্র। তুমি গাইড বই ব্যবহার করতে পারো। কিন্তু সেটা অবশ্যই মূল বই পড়ার পরে। ঠিকানাওয়ালা একবার রাস্তা বদলালেই হারিয়ে যায়, মানচিত্রওয়ালা নতুন পথ খুঁজে নেয়। তুমি কোনটা হতে চাও? আজ তবে আসি, নিয়মিত এসো কিন্তু!


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত