ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

শহরের বাইরেই হোক সচিবালয়



শহরের বাইরেই হোক সচিবালয়
শহরের বাইরেই হোক সচিবালয়

আবদুল গণি রোড থেকে বাংলাদেশ সচিবালয় সরিয়ে শেরে বাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নিতে চায় সরকার। প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, বাস্তবায়নকাল ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পটিকে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে তোলার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি আর নিছক আলোচনার স্তরে নেই। তাই প্রশ্নটা এখনই তোলা জরুরি যে এই স্থানান্তর কি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নাগরিকের কাছাকাছি আনবে, নাকি ক্ষমতার একই কেন্দ্রকে নতুন ঠিকানায়, নতুন দেয়ালের ভেতরে স্থাপন করবে মাত্র? আমাদের সমস্যা কি ঠিকানায়, নাকি কাঠামোয়?

একটি তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক। মাত্র কয়েক বছর আগে এই মাঠ থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যুক্তি ছিল, জনদুর্ভোগ কমানো। মাসব্যাপী একটি মেলার চাপ যে এলাকা সামলাতে পারেনি, সেখানে সারা বছর হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী, দর্শনার্থী আর সরকারি গাড়িবহরের চাপ কীভাবে সামলানো হবে, সে প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর এখনো জনসমক্ষে আসেনি। এ যেন পুরোনো ভুল শুধরে আবার সেই ভুলের দিকেই ফিরে যাওয়া।

শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা হয়েছিল আইয়ুব খানের আমলে, তৎকালীন পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসেবে। লুই কানের নকশায় সংসদ ভবন সেই পরিকল্পনারই ফসল। সেই পরিকল্পনার পেছনে অন্তত একটি যুক্তি ছিল—ঘনবসতির বাইরে খোলা জমিতে প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়া। সেই খোলা জমি আজ আর খোলা নেই। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরেও এখানে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের দপ্তর বলতে মূলত পরিকল্পনা কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ আরও মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তরের কার্যালয় করা হয়েছে। এর মধ্যে এলাকাটির চরিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রস্তাবিত স্থানের আশপাশে রয়েছে একাধিক বড় হাসপাতাল, মেডিকেল ও নার্সিং কলেজ। ঠিক উল্টো দিকে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। পাশেই আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, যেখানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের দিনে বিপুল পার্কিংয়ের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালমুখী অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থীদের চলাচল, সম্মেলনের প্রটোকল আর সচিবালয়ের নিরাপত্তাবেষ্টনী, সবকিছু এসে মিলবে একই মোড়ে।

তার ওপর এলাকাটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, তেজগাঁও ও ধানমন্ডির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সংযোগবিন্দু। এখানে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র বসানোর অর্থ শহরের হৃৎপিণ্ডে নতুন করে একটি যানজটের কেন্দ্র তৈরি করা। জায়গাটি একটি সুপরিকল্পিত, ভবিষ্যৎ-সম্প্রসারণযোগ্য প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের জন্যও যথেষ্ট নয়। শোনা যাচ্ছে, চাপ সামলাতে নতুন সড়ক বা পাতালপথের কথাও ভাবা হচ্ছে। সমস্যা তৈরি করে তারপর তার সমাধানে আরেকটি ব্যয়বহুল প্রকল্প—এটিই আমাদের উন্নয়ন-চক্রের পরিচিত ছক। আবার বর্তমান সচিবালয়ের জায়গায় পুরান ঢাকার নিম্ন আদালত সরিয়ে আনার প্রস্তাবও আছে। ফলে পল্টন-গুলিস্তানের চাপ কমবে, এমন আশাও করা যাচ্ছে না। পুরোনো জায়গা ভরবে নতুন ভিড়ে আর নতুন জায়গায় জন্ম নেবে আরেক ধরনের ভিড়। দেশের পরিকল্পনাবিদদের পেশাজীবী সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা ইতিমধ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর পরিকল্পনার ন্যূনতম মানদণ্ডে এই সিদ্ধান্ত টেকে না। বলা চলে, প্রায় ৭০ বছর আগের পাকিস্তানি পরিকল্পনাও এর চেয়ে দূরদর্শী ছিল।

সচিবালয় কেবল একটি ভবন নয়, একটি শাসনপদ্ধতিও। জেলা-উপজেলার ছোটখাটো সিদ্ধান্তও ফাইল হয়ে এখানে আসে, এখানেই আটকে থাকে। সাধারণ নাগরিকের কাছে এটি কার্যত একটি দুর্গম ব্যাপার। আর যেখানে প্রবেশ কঠিন, সেখানেই জমে ওঠে তদবির ও মধ্যস্বত্বভোগীর বাজার। অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড়ও সেখানে। এ কারণেই বহু বছর ধরে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দাবি উঠছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক ক্ষমতা বিভাগ, জেলা ও স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করে সচিবালয়ের ভার কমানো। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে দাবিতে কান দেয়নি। ঢাকার বাইরের মানুষের চোখে প্রশ্নটা আরও স্পষ্ট। কুড়িগ্রাম বা ভোলার একজন নাগরিকের কাছে সচিবালয় পল্টনে না আগারগাঁওয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না। একটি সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে ঢাকায় আসতেই হবে। বিকেন্দ্রীকরণের অর্থ সেই যাত্রার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা।

এখন শহরের এক অংশ থেকে আরেক অংশে কয়েক কিলোমিটার ভবন সরালে কেন্দ্রীভবনের এক বিন্দুও কমবে না। ঠিকানা বদলালে ক্ষমতার মানচিত্র বদলায় না। যদি ভৌত স্থানান্তর একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে মূল শহর থেকে দূরে পূর্বাচল, আশুলিয়া বা ঢাকার মূল শহরের বাইরে যেখানে যানজট হওয়ার কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই—এ রকম সুবিধাজনক এবং পরিকল্পিত এলাকায় নিলে অন্তত কেন্দ্রীয় ঢাকার চাপ কমাত, একটি নতুন প্রশাসনিক নগরকেন্দ্র গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো। মূল ঢাকার বাইরে নিয়ে গিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া যে উদ্দেশ্যে সচিবালয় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটা নিশ্চিতভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। আর ৫০ বছরের পরিকল্পনা করেই সেটা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

অর্থনীতি এখন গভীর চাপে। মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ধাক্কায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা। সরকার নিজেও রাজস্ব জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, পরিচালন ব্যয় আর উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি মেটানোই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন সময়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে কোন সেবার মান বাড়বে? কোন ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? কোন নাগরিকের ভোগান্তি কমবে? প্রকল্প প্রস্তাবে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে এটি অর্থের যথার্থ ব্যবহারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বাড়ার যে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, তাতে প্রস্তাবিত অঙ্কটিই শেষ অঙ্ক হবে, এমন ভরসাও কম। তার ওপর কয়েক বছরের স্থানান্তরপর্বে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে যে বিঘ্ন ঘটবে, তার খরচ কোনো হিসাবেই ধরা নেই। একই অর্থে জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ কিংবা ই-গভর্ন্যান্সে বিনিয়োগ হলে নাগরিক অনেক বেশি উপকৃত হতো। সংকটকালে এমন অনুৎপাদনশীল অবকাঠামো সরকারের নৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে দেখলে প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ হয়: এ প্রকল্পে লাভবান কারা হবে? প্রকল্প পরিচালকের পদ ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন সংশ্লিষ্ট আমলারা। বড় বাজার পাবে সিমেন্ট ও রডের মতো নির্মাণশিল্প। কাজ পাবেন ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্যপ্রাপ্ত নানা স্তরের ঠিকাদার। অর্থাৎ এই অবকাঠামোকে ঘিরে গড়ে উঠবে ঘুষ-দুর্নীতি-চাঁদাবাজির এক নতুন মহাযজ্ঞ। এ প্রবণতা নতুন নয়। ভৌত অবকাঠামো দৃশ্যমান, তাতে ফিতা কাটা যায়, ফলক বসানো যায়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অদৃশ্য, তাতে ভাগাভাগির সুযোগও কম। তাই আমাদের রাজনীতি ইট-পাথরে যতটা আগ্রহী, ক্ষমতার বণ্টনে ততটাই অনাগ্রহী। আর নাগরিকের ভাগে থাকবে করের বোঝা এবং এই ঘিঞ্জি শহরে আরেক প্রস্থ যানজট।

তাই সরকারের প্রতি আহ্বান, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং যানবাহন ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক। পরিকল্পনাবিদ, নগরবিদ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে প্রকাশ্য পরামর্শ গ্রহণ করা হোক। সবচেয়ে জরুরি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি সময়বদ্ধ রূপরেখা হাজির করা হোক। কারণ, রাষ্ট্রের দক্ষতা মাপা হয় ভবনের উচ্চতায় নয়, নাগরিকের সেবা পাওয়ার সহজতায়।

শুরুর প্রশ্নে ফিরি। সমস্যা ঠিকানায় নয়, কাঠামোয়। সচিবালয় সরবে, কিন্তু ক্ষমতা যদি না সরে, তবে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব কমবে না এক বিন্দুও। বাড়বে কেবল যানজটে আটকে থাকার সময়।

যানজট কমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে যদি সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে নগরবাসী যানজট থেকে মুক্তি না পেয়ে যে আরও বড় যানজটের মুখোমুখি হবে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। সে জন্য মূল ঢাকার বাইরে সচিবালয় স্থানান্তর করাই যৌক্তিক হবে।

লেখক: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


শহরের বাইরেই হোক সচিবালয়

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আবদুল গণি রোড থেকে বাংলাদেশ সচিবালয় সরিয়ে শেরে বাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে নিতে চায় সরকার। প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, বাস্তবায়নকাল ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পটিকে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে তোলার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি আর নিছক আলোচনার স্তরে নেই। তাই প্রশ্নটা এখনই তোলা জরুরি যে এই স্থানান্তর কি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে নাগরিকের কাছাকাছি আনবে, নাকি ক্ষমতার একই কেন্দ্রকে নতুন ঠিকানায়, নতুন দেয়ালের ভেতরে স্থাপন করবে মাত্র? আমাদের সমস্যা কি ঠিকানায়, নাকি কাঠামোয়?

একটি তথ্য দিয়ে শুরু করা যাক। মাত্র কয়েক বছর আগে এই মাঠ থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। যুক্তি ছিল, জনদুর্ভোগ কমানো। মাসব্যাপী একটি মেলার চাপ যে এলাকা সামলাতে পারেনি, সেখানে সারা বছর হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী, দর্শনার্থী আর সরকারি গাড়িবহরের চাপ কীভাবে সামলানো হবে, সে প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর এখনো জনসমক্ষে আসেনি। এ যেন পুরোনো ভুল শুধরে আবার সেই ভুলের দিকেই ফিরে যাওয়া।

শেরে বাংলা নগরের পরিকল্পনা হয়েছিল আইয়ুব খানের আমলে, তৎকালীন পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসেবে। লুই কানের নকশায় সংসদ ভবন সেই পরিকল্পনারই ফসল। সেই পরিকল্পনার পেছনে অন্তত একটি যুক্তি ছিল—ঘনবসতির বাইরে খোলা জমিতে প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়া। সেই খোলা জমি আজ আর খোলা নেই। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরেও এখানে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের দপ্তর বলতে মূলত পরিকল্পনা কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ আরও মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তরের কার্যালয় করা হয়েছে। এর মধ্যে এলাকাটির চরিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রস্তাবিত স্থানের আশপাশে রয়েছে একাধিক বড় হাসপাতাল, মেডিকেল ও নার্সিং কলেজ। ঠিক উল্টো দিকে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। পাশেই আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, যেখানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের দিনে বিপুল পার্কিংয়ের প্রয়োজন হয়। হাসপাতালমুখী অ্যাম্বুলেন্স, শিক্ষার্থীদের চলাচল, সম্মেলনের প্রটোকল আর সচিবালয়ের নিরাপত্তাবেষ্টনী, সবকিছু এসে মিলবে একই মোড়ে।

তার ওপর এলাকাটি মিরপুর, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, তেজগাঁও ও ধানমন্ডির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সংযোগবিন্দু। এখানে একটি স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র বসানোর অর্থ শহরের হৃৎপিণ্ডে নতুন করে একটি যানজটের কেন্দ্র তৈরি করা। জায়গাটি একটি সুপরিকল্পিত, ভবিষ্যৎ-সম্প্রসারণযোগ্য প্রশাসনিক কমপ্লেক্সের জন্যও যথেষ্ট নয়। শোনা যাচ্ছে, চাপ সামলাতে নতুন সড়ক বা পাতালপথের কথাও ভাবা হচ্ছে। সমস্যা তৈরি করে তারপর তার সমাধানে আরেকটি ব্যয়বহুল প্রকল্প—এটিই আমাদের উন্নয়ন-চক্রের পরিচিত ছক। আবার বর্তমান সচিবালয়ের জায়গায় পুরান ঢাকার নিম্ন আদালত সরিয়ে আনার প্রস্তাবও আছে। ফলে পল্টন-গুলিস্তানের চাপ কমবে, এমন আশাও করা যাচ্ছে না। পুরোনো জায়গা ভরবে নতুন ভিড়ে আর নতুন জায়গায় জন্ম নেবে আরেক ধরনের ভিড়। দেশের পরিকল্পনাবিদদের পেশাজীবী সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা ইতিমধ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর পরিকল্পনার ন্যূনতম মানদণ্ডে এই সিদ্ধান্ত টেকে না। বলা চলে, প্রায় ৭০ বছর আগের পাকিস্তানি পরিকল্পনাও এর চেয়ে দূরদর্শী ছিল।

সচিবালয় কেবল একটি ভবন নয়, একটি শাসনপদ্ধতিও। জেলা-উপজেলার ছোটখাটো সিদ্ধান্তও ফাইল হয়ে এখানে আসে, এখানেই আটকে থাকে। সাধারণ নাগরিকের কাছে এটি কার্যত একটি দুর্গম ব্যাপার। আর যেখানে প্রবেশ কঠিন, সেখানেই জমে ওঠে তদবির ও মধ্যস্বত্বভোগীর বাজার। অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড়ও সেখানে। এ কারণেই বহু বছর ধরে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দাবি উঠছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আর্থিক ক্ষমতা বিভাগ, জেলা ও স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করে সচিবালয়ের ভার কমানো। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে দাবিতে কান দেয়নি। ঢাকার বাইরের মানুষের চোখে প্রশ্নটা আরও স্পষ্ট। কুড়িগ্রাম বা ভোলার একজন নাগরিকের কাছে সচিবালয় পল্টনে না আগারগাঁওয়ে, তাতে কিছু যায় আসে না। একটি সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে ঢাকায় আসতেই হবে। বিকেন্দ্রীকরণের অর্থ সেই যাত্রার প্রয়োজনটাই কমিয়ে আনা।

এখন শহরের এক অংশ থেকে আরেক অংশে কয়েক কিলোমিটার ভবন সরালে কেন্দ্রীভবনের এক বিন্দুও কমবে না। ঠিকানা বদলালে ক্ষমতার মানচিত্র বদলায় না। যদি ভৌত স্থানান্তর একান্তই প্রয়োজন হয়, তবে মূল শহর থেকে দূরে পূর্বাচল, আশুলিয়া বা ঢাকার মূল শহরের বাইরে যেখানে যানজট হওয়ার কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই—এ রকম সুবিধাজনক এবং পরিকল্পিত এলাকায় নিলে অন্তত কেন্দ্রীয় ঢাকার চাপ কমাত, একটি নতুন প্রশাসনিক নগরকেন্দ্র গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হতো। মূল ঢাকার বাইরে নিয়ে গিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া যে উদ্দেশ্যে সচিবালয় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেটা নিশ্চিতভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে। আর ৫০ বছরের পরিকল্পনা করেই সেটা বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হতে হবে।

অর্থনীতি এখন গভীর চাপে। মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ধাক্কায় সাধারণ মানুষ দিশেহারা। সরকার নিজেও রাজস্ব জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে, পরিচালন ব্যয় আর উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি মেটানোই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন সময়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে কোন সেবার মান বাড়বে? কোন ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হবে? কোন নাগরিকের ভোগান্তি কমবে? প্রকল্প প্রস্তাবে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে এটি অর্থের যথার্থ ব্যবহারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বাড়ার যে অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, তাতে প্রস্তাবিত অঙ্কটিই শেষ অঙ্ক হবে, এমন ভরসাও কম। তার ওপর কয়েক বছরের স্থানান্তরপর্বে মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে যে বিঘ্ন ঘটবে, তার খরচ কোনো হিসাবেই ধরা নেই। একই অর্থে জেলা পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ কিংবা ই-গভর্ন্যান্সে বিনিয়োগ হলে নাগরিক অনেক বেশি উপকৃত হতো। সংকটকালে এমন অনুৎপাদনশীল অবকাঠামো সরকারের নৈতিক বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে দেখলে প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ হয়: এ প্রকল্পে লাভবান কারা হবে? প্রকল্প পরিচালকের পদ ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন সংশ্লিষ্ট আমলারা। বড় বাজার পাবে সিমেন্ট ও রডের মতো নির্মাণশিল্প। কাজ পাবেন ক্ষমতাসীন দলের আনুকূল্যপ্রাপ্ত নানা স্তরের ঠিকাদার। অর্থাৎ এই অবকাঠামোকে ঘিরে গড়ে উঠবে ঘুষ-দুর্নীতি-চাঁদাবাজির এক নতুন মহাযজ্ঞ। এ প্রবণতা নতুন নয়। ভৌত অবকাঠামো দৃশ্যমান, তাতে ফিতা কাটা যায়, ফলক বসানো যায়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অদৃশ্য, তাতে ভাগাভাগির সুযোগও কম। তাই আমাদের রাজনীতি ইট-পাথরে যতটা আগ্রহী, ক্ষমতার বণ্টনে ততটাই অনাগ্রহী। আর নাগরিকের ভাগে থাকবে করের বোঝা এবং এই ঘিঞ্জি শহরে আরেক প্রস্থ যানজট।

তাই সরকারের প্রতি আহ্বান, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হোক। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং যানবাহন ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক। পরিকল্পনাবিদ, নগরবিদ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে প্রকাশ্য পরামর্শ গ্রহণ করা হোক। সবচেয়ে জরুরি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি সময়বদ্ধ রূপরেখা হাজির করা হোক। কারণ, রাষ্ট্রের দক্ষতা মাপা হয় ভবনের উচ্চতায় নয়, নাগরিকের সেবা পাওয়ার সহজতায়।

শুরুর প্রশ্নে ফিরি। সমস্যা ঠিকানায় নয়, কাঠামোয়। সচিবালয় সরবে, কিন্তু ক্ষমতা যদি না সরে, তবে নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্ব কমবে না এক বিন্দুও। বাড়বে কেবল যানজটে আটকে থাকার সময়।

যানজট কমানোর উদ্দেশ্য নিয়ে যদি সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে নগরবাসী যানজট থেকে মুক্তি না পেয়ে যে আরও বড় যানজটের মুখোমুখি হবে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। সে জন্য মূল ঢাকার বাইরে সচিবালয় স্থানান্তর করাই যৌক্তিক হবে।

লেখক: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত