সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে পর্যালোচনা খুব একটা স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখাচ্ছে না। জিডিপির প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে মন্দা, নতুন করে দারিদ্র্যের হার বাড়ার ঝুঁকি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও এর পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি—এ সবকিছু ভাবিয়ে তুলেছে অর্থনীতির বিশ্লেষকদেরও।
প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে ধীরগতি এবং এর পাশাপাশি দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের চ্যালেঞ্জ থাকলেও বর্তমানে মোটাদাগে অগ্রাধিকারের মূল জায়গা দুটি—দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি আর বিনিয়োগে শ্লথগতি। আর ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে গতি এলে তার প্রতিফলন প্রবৃদ্ধিতে পড়বে এবং অর্থনীতির চাকা গতি পেলে এর সুফল সাধারণ মানুষও পাবে।
তবে একই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে একদিকে যেমন দীর্ঘ মেয়াদে কিছু কাঠামোগত সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে তেমনি আপৎকালীন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়াও প্রয়োজন।
প্রথমত, অবকাঠামো, বিশেষত গ্যাস-বিদ্যুৎসহ সব জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রাথমিক শর্ত। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে উদ্ভূত জ্বালানি পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখন থেকেই স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। স্বল্প মেয়াদে এলএনজির সরবরাহ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি টেংরাটিলাসহ অন্যান্য মজুত, বিশেষ করে অফশোরে গ্যাস উত্তোলনে নজর দেওয়া দরকার। মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে সৌরবিদ্যুৎসহ অন্যান্য বিকল্প ও বড় ধরনের বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার একটি জটিল নীতিগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদের হার কমানোর বিষয়ে যেমন কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে, অপর পক্ষে উচ্চ সুদের হার ব্যবসায়ীদের, বিশেষ করে রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে স্বল্প মেয়াদে সুদের হার কমানো হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, ব্যবসায়ীদের বিকল্প পদ্ধতিতে সহায়তার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মে মাসে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ও বিনিয়োগে গতি ফেরাতে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
কিন্তু এই প্রণোদনার ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাড়া এখনো পাওয়া যায়নি। দীর্ঘদিন পর্যন্ত যেসব কারখানা বন্ধ হয়ে আছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের শর্ত পূরণ করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে প্রণোদনার ক্ষেত্রে কিছু কিছু শর্ত পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা আবশ্যক।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে (তৃতীয়ত) বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সম্ভবত প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি। বিভিন্ন স্থলবন্দরে জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করছে। চলমান ২০২৬-২৭ সালের জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগে জটিলতা কমানোর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হলেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না—অতি দ্রুত সময়ে সেসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।
বিনিয়োগে গতি আনতে (চতুর্থত) উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাবোধের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতাই শুধু নয়, এর পাশাপাশি দুর্নীতি ও মাস্তানির মতো বিষয়গুলো উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে থাকে—ব্যবসায়ীদের স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার পরিবেশ নিশ্চিত করার তাই কোনো বিকল্প নেই। তবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় ব্যাংকিংসহ আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুসংহত করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
ব্যাংকিং খাতে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের সঠিক সংজ্ঞায়ন, কার্যকর ও দ্রুত নিষ্পত্তি, ঋণ বিতরণে কঠোর তদারকির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, শক্তিশালী ব্যাংকের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য যৌক্তিক ও টেকসই সমাধান ইত্যাদি বিষয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ও সুশাসন আনা সম্ভব। তবে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করতে বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদন, বিশেষ করে রপ্তানি খাতকেন্দ্রিক শিল্পোৎপাদনের জন্য রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই।
ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করা বর্তমানে অগ্রাধিকারের জায়গা হলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অর্থনৈতিক নীতিমালার কেন্দ্রে রেখেই অন্যান্য বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। মূল্যস্ফীতির প্রশ্নে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় অধিক মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বাজার ব্যবস্থাপনায় যথাযথ গুরুত্ব না দেওয়া হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
এর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে দূর করে উৎপাদন, আমদানি ও সর্বোপরি সরবরাহের ক্ষেত্রে গতি আনতে হবে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি ও প্রতিযোগিতার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটানো হলে তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—তদারকির বিষয়টি অনিয়মিতভাবে করলে দীর্ঘ মেয়াদে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। তদারকির জন্য সুসংগঠিত টিম, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা (গাইডলাইন), স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়, পরিবহনব্যবস্থায় দুর্নীতি দমন, মালামাল পরিবহনে সময় কমানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগীদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, পণ্য সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতির বিষয়টি যেহেতু একটি সমন্বিত বিষয়, তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন বাণিজ্য, কৃষি, খাদ্যের মধ্যে সঠিক সমন্বয় দরকার। মূলত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্রে রেখে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী নীতিনির্ধারক কমিটি প্রণয়ন করা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সাপেক্ষে মুদ্রানীতির ভূমিকা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খুব একটা কার্যকর না হলেও সুদের হার, বিশেষ করে নীতি সুদের হার ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে অন্তত স্বল্প মেয়াদে পরবর্তী মুদ্রানীতি কিংবা তারও কিছুদিন পর পর্যন্ত না কমানোই যৌক্তিক।
রাজস্ব কিংবা করনীতির ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণে কিছুটা চাপ পড়লেও গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের ওপর বাণিজ্য শুল্ক কমানো; জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের দাম স্বল্প মেয়াদে না বাড়ানো ইত্যাদি পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরার জন্য কার্যকর হতে পারে। এর পাশাপাশি টিসিবির পরিধি ও কার্যক্রমের ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধি, কিছু পণ্যের দামের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ভর্তুকি, টিসিবির ট্রাকবাহী পণ্যের বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে রেজিস্ট্রির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিনিয়োগের ধীরগতি ও দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের জায়গা হলেও মৌলিক আরেকটি সমস্যার জায়গা রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার অভাব। দুর্বল রাজস্ব প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ব্যয়ের ক্ষেত্র যেমন সংকুচিত করে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভর্তুকি, সহায়তা ও প্রণোদনার সুযোগও সীমিত করে দেয়—অর্থনীতির নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মূলে তাই থাকতে হবে প্রত্যক্ষ করের আওতা এবং করজাল বিস্তৃত করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির সর্বোচ্চ প্রয়াস।
সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে—উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতি আর এর পাশাপাশি জটিল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে বিনিয়োগকে চাঙা করার কাজটি সহজ নয়। তবে সন্তোষজনক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ, ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমানের স্থিতিশীলতা, কৃষি উৎপাদন; শিল্প খাতে, বিশেষ করে পোশাকশিল্পে অভিজ্ঞতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা—অর্থনীতির ইতিবাচক এই বিষয়গুলোকে পুঁজি করে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়, যেমন রাজস্ব খাত, সরকারি ব্যয়, আর্থিক খাত, বিনিয়োগ ও রপ্তানি খাতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করতে হবে।
সায়মা হক বিদিশা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
মতামত