ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

চন্দ্রালোকিত রাত ও নির্বাচনের দিন-তারিখ



চন্দ্রালোকিত রাত ও নির্বাচনের দিন-তারিখ
চন্দ্রালোকিত রাত ও নির্বাচনের দিন-তারিখ

পাজি শব্দটি পঞ্জিকার অপভ্রংশ বলেই হয়তো শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা ঘাঁটেন না। এককালে রাজদরবারে থাকতেন রাজজ্যোতিষী, তিনি তিথি-গ্রহ-নক্ষত্রের শুভাশুভ বিচার করে রাজকীয় কর্মের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দিতেন। সে পাট চুকেবুকে গেছে কবেই। সম্রাট আকবরের সময় চান্দ্র পঞ্জিকা থেকে সৌর পঞ্জিকায় উত্তরণের পর রাজকর দিতেও আর চাঁদের তারিখ গুনতে হয় না। ধর্মীয় পরবের দিন জানা ছাড়া চাঁদের হিসাব রাখার চলও ধীরেধীরে গেছে উঠে। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে উপকূলীয় মানুষ হিসাব করে ভরাকটাল আর মরাকটালের। জোয়ার ভাটায় থাকে উপার্জন, থাকে জীবনের ঝুঁকি। জীবনের ঝুঁকিটুকু আছে বলেই চাঁদের প্রতি এটুকু মান্যতা। আমাদের শৈশব-কৈশোরে দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারে দেখতাম অমাবস্যা, প্রতিপদ, দ্বিতীয়া এমনি করে পূর্ণিমা আবারও কৃষ্ণপক্ষ প্রতিপদ দ্বিতীয়া প্রভৃতি। রোজা পূজা প্রভৃতি ধর্মাচরণের দিন- তারিখ দেখে নিতেন ক্যালেন্ডারে, অমাবস্যা পূর্ণিমার লগ্ন দেখে বাতের ব্যথার প্রস্তুতি নিতেন অনেকেই। পূর্ণিমার হিসাব করে পাড়ায় পাড়ায় বসত গানের আসর কিংবা খেলাধুলা। ফসলি পূর্ণিমায় অনেক রাত ধরে দেখেছি ধানের মলান। বিদ্যুতের আলো আর যন্ত্রের আবির্ভাবে সেসব এখন বিলীন। ধর্মীয় উৎসবের দিন জানতে মানুষ কান পেতে থাকে টিভির পর্দায় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা শুনতে। দেওয়াল ক্যালেন্ডারে উৎসবের দিন ‘রেড লেটার ডে'—ছুটির দিন। পহেলা বৈশাখ ছাড়া অনেকে বাংলা তারিখই জানি না, চাঁদের তারিখ না জানলেও চলে। লাল তারিখে যে উৎসব সেটা জানা হয়ে যায় বছরের গোড়াতেই।

বড় কর্তারা পঞ্জিকা না ঘাঁটায় যখনই ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ে, তখন ধুক করে ওঠে নিযুত মানুষের বুক। এই নিযুত মানুষকে ভোটকেন্দ্রে ভোটের ডিউটি করতে হয়। তাদের পরিবারের সদস্যদের টেনশনে প্রহর কাটাতে হয়। ছেচল্লিশ সহস্রাধিক ভোটকেন্দ্রে অন্তত লাখ সাতেক মানুষ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। নির্বাচন কমিশনের থমকে যাওয়া প্রস্তাবিত সম্ভাব্য সাত ধাপে সমাপ্য নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকবল একাধিক নির্বাচন দিনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তাই মোটসংখ্যা মাথা গুনতিতে হয়তো একটু কম হবে। সাকুল্য সংখ্যা তবু লাখ পাঁচেকের এদিক-ওদিক। ভোটের দিনগুলিতে নারী- পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় ১২ লাখ মানুষ ছড়িয়ে থাকবেন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে।

ভোটগ্রহণের শেষ সময় যদি বিকাল ৪টা পর্যন্তও নির্ধারিত হয়; তবু বেশি ভোটারের কেন্দ্রে বেষ্টনীর ভেতরে থাকা মানুষদের ভোট নিতে নিতে এক-আধ ঘণ্টা সময় বেশি লেগেই যায়। একটা কেন্দ্রে গড়পড়তায় ১ হাজার ৫০০ ভোট পড়লে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য তিন প্রকারের ব্যালটে ব্যবহৃত মোট ব্যালট পেপার হবে ৪ হাজার ৫০০টি। অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সীমিতসংখ্যক লোক ব্যালট পেপার নাড়াচাড়া করবেন। প্রতি মিনিটে কুড়িটি পেপার বাছাই করতে পারলে ব্যালট বাছাইয়ে সময় লাগবে ২২৫ মিনিট। তিন জন অফিসার ৪ হাজার ৫০০ ব্যালট গুনতে সময় নেবেন ১৫ মিনিট। ফর্ম পূরণ, ব্যালট সিলগালাকরণ সব মিলে আরো ৩০ মিনিট। মোট সময় সাড়ে চার ঘণ্টা।

তাড়াহুড়া করে এর চেয়ে কম সময়ে শেষ করতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে অনেক বেশি, যেমনটি এবার ঘটেছে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। ভোট শেষে প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে যদি বিকাল ৫টাতেও ব্যালট বাক্স খোলা হয়, তাহলে রাত্রি সাড়ে ৯টায় ফলাফল চূড়ান্ত করে ভোট কর্তারা কেন্দ্ৰ ত্যাগ করতে পারবেন। প্রদত্ত ভোট কম হলে আরো আগে বেরোতে পারবেন আর ভোটার বেশি হলে সময় লাগবে আরো বেশি।

নির্বাচন কমিশনের ১৪ সেপ্টেম্বর ঘোষিত কেঁচে গণ্ডূষ হয়ে যাওয়া প্রস্তাবিত সাত ধাপের নির্বাচনের প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম ধাপে ভোটের পরে রাতে চাঁদের আলো পাওয়া যেত না। প্রস্তাবিত তৃতীয় ও সপ্তম ধাপের ভোটের পরে রাত প্রায় একটার দিকে চাঁদের উদয়ের সময়। ২১ এপ্রিল ৬ষ্ঠ ধাপের প্রস্তাবিত দিনটি হতো একেবারে চমৎকার রাতভর চাঁদের আলো ছড়ানোর আগে। চতুর্থ ধাপের ভোটের তারিখটিও মন্দ ছিল না। সেদিন রাত একটার দিকে চাঁদ অস্ত যাবে, ফলে আশা করা যায় নির্বাচনি অফিসাররা সেদিনও চাঁদের আলোর ভেতরেই যার যার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতেন।

নির্বাচনের দিন ইউনিয়ন পরিষদের ৯ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে কমপক্ষে একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপিত হয়। কোথায়ও একাধিক কেন্দ্রও হয়ে থাকে। কোনো কেন্দ্রের ফলাফল তৈরিতে যৌক্তিক কারণে দেরি হলেও অন্যান্য কেন্দ্রের ফলাফল যোগ করে বিলম্বিত কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। চাঁদনি রাতে এই ঝুঁকি যতটা থাকে, অন্ধকারে থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি। দেশের বেশ কিছু ইউনিয়ন পরিষদ অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় এবং রাতে কেন্দ্র থেকে উপজেলা সদরে আসা খুবই কষ্টকর। ঝুঁকি থাকে পরাজিত প্রার্থী বা সমর্থকদের আক্রমণের মুখে পড়ার। আমাদের দেশে পারস্পরিক বিশ্বাস এত ঠুনকো যে, কেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স উপজেলা সদরে এনে দুয়েক দিন পরে প্রকাশ্য দিবালোকে ভোট গণনা করার কথা চিন্তা করাই সম্ভব না। কিন্তু তা করতে পারলে ভালো হতো। একাধিক দিনে ভোট হওয়ায় ফলাফল হয়ে যাওয়া এলাকার বিজয়ী ও পরাজিত সব পক্ষই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন পরে ভোট হওয়া এলাকাগুলোয়। যতই বলা হোক, রাজনৈতিকভাবে স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছে না, তথাপি রাজনৈতিক দলসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা থেকেই যায়। দলীয় ব্যানার না থাকায় চিহ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা কম মনে করে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আরো তীব্র হতে পারে। সে কারণে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাগণ যেন আলোকিত পরিমণ্ডলে ভোট গণনা শেষে উপজেলা সদরে ও নিজ নিজ গৃহে ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিতকরণ নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় থাকলে সবার মঙ্গল।

দেশের আর্থিক সক্ষমতা বেড়ে যতদিন সব ভোটকেন্দ্র আলোকোজ্জ্বল ও ভোটকেন্দ্রের সঙ্গে উপজেলা সদরে আসার পথ সুগম না হয়, ততদিন অন্তত শুক্লা নবমী থেকে কৃষ্ণা তৃতীয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে একাধিক দিন ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করলে ভোটগ্রহণের দায়িত্ব পালনকারীগণ স্বস্তিতে থাকতে পারবেন। সময়ের অভাবে অনালোকিত রাতের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে ভোট নিতে হলে তা হতে পারে কেবল উপজেলা সদর বা সদরের কাছাকাছি ইউনিয়নগুলোয়। নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের দৈহিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এভাবে চাঁদের আলোকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের দিন ধার্য করলে অজস্র মানুষের মনে স্বস্তি আসতে পারত।

ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০২৭-এর শেষদিকে নির্বাচনের জন্য চিন্তাভাবনা করলেও ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। ধরে নিচ্ছি সরকারের সবুজ সংকেত পেয়েই তারিখ ঠিক হয়েছে। প্রথম তারিখটি ২১ জানুয়ারি শুক্লা চতুর্দশীর দিন। রাতভর চমৎকার পূর্ণিমার আলো থাকবে ভোটের দিনের পর। কিন্তু চারটি ধাপের তারিখ মাঠ পর্যায়ের ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তারা ভোটের পর আলোকিত রাত পাবেন না। দ্বিতীয় ধাপের ৪ ফেব্রুয়ারির রাতটি অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। তৃতীয় ধাপের ২৯ এপ্রিল কৃষ্ণ অষ্টমী ও শেষ ধাপের ২৭ মে কৃষ্ণা সপ্তমীতে ভোটের পর আঁধারই ছেয়ে রাখবে ভোটগ্রহণকারীদের। চতুর্থ ধাপের ১৩ মে ২০২৭ শুক্ল অষ্টমীতে রাতের প্রথম ভাগে চাঁদের আলো কিছুটা ভরসা জোগাবে।

আশায় থাকছি শান্তিপূর্ণভাবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হোক। ভোট সম্পন্ন হওয়ার পর নিরাপদে বাড়ি ফিরুক ভোটের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাগণ।

 লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


চন্দ্রালোকিত রাত ও নির্বাচনের দিন-তারিখ

প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

পাজি শব্দটি পঞ্জিকার অপভ্রংশ বলেই হয়তো শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা ঘাঁটেন না। এককালে রাজদরবারে থাকতেন রাজজ্যোতিষী, তিনি তিথি-গ্রহ-নক্ষত্রের শুভাশুভ বিচার করে রাজকীয় কর্মের দিনক্ষণ নির্ধারণ করে দিতেন। সে পাট চুকেবুকে গেছে কবেই। সম্রাট আকবরের সময় চান্দ্র পঞ্জিকা থেকে সৌর পঞ্জিকায় উত্তরণের পর রাজকর দিতেও আর চাঁদের তারিখ গুনতে হয় না। ধর্মীয় পরবের দিন জানা ছাড়া চাঁদের হিসাব রাখার চলও ধীরেধীরে গেছে উঠে। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে উপকূলীয় মানুষ হিসাব করে ভরাকটাল আর মরাকটালের। জোয়ার ভাটায় থাকে উপার্জন, থাকে জীবনের ঝুঁকি। জীবনের ঝুঁকিটুকু আছে বলেই চাঁদের প্রতি এটুকু মান্যতা। আমাদের শৈশব-কৈশোরে দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারে দেখতাম অমাবস্যা, প্রতিপদ, দ্বিতীয়া এমনি করে পূর্ণিমা আবারও কৃষ্ণপক্ষ প্রতিপদ দ্বিতীয়া প্রভৃতি। রোজা পূজা প্রভৃতি ধর্মাচরণের দিন- তারিখ দেখে নিতেন ক্যালেন্ডারে, অমাবস্যা পূর্ণিমার লগ্ন দেখে বাতের ব্যথার প্রস্তুতি নিতেন অনেকেই। পূর্ণিমার হিসাব করে পাড়ায় পাড়ায় বসত গানের আসর কিংবা খেলাধুলা। ফসলি পূর্ণিমায় অনেক রাত ধরে দেখেছি ধানের মলান। বিদ্যুতের আলো আর যন্ত্রের আবির্ভাবে সেসব এখন বিলীন। ধর্মীয় উৎসবের দিন জানতে মানুষ কান পেতে থাকে টিভির পর্দায় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণা শুনতে। দেওয়াল ক্যালেন্ডারে উৎসবের দিন ‘রেড লেটার ডে'—ছুটির দিন। পহেলা বৈশাখ ছাড়া অনেকে বাংলা তারিখই জানি না, চাঁদের তারিখ না জানলেও চলে। লাল তারিখে যে উৎসব সেটা জানা হয়ে যায় বছরের গোড়াতেই।

বড় কর্তারা পঞ্জিকা না ঘাঁটায় যখনই ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ে, তখন ধুক করে ওঠে নিযুত মানুষের বুক। এই নিযুত মানুষকে ভোটকেন্দ্রে ভোটের ডিউটি করতে হয়। তাদের পরিবারের সদস্যদের টেনশনে প্রহর কাটাতে হয়। ছেচল্লিশ সহস্রাধিক ভোটকেন্দ্রে অন্তত লাখ সাতেক মানুষ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। নির্বাচন কমিশনের থমকে যাওয়া প্রস্তাবিত সম্ভাব্য সাত ধাপে সমাপ্য নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকবল একাধিক নির্বাচন দিনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তাই মোটসংখ্যা মাথা গুনতিতে হয়তো একটু কম হবে। সাকুল্য সংখ্যা তবু লাখ পাঁচেকের এদিক-ওদিক। ভোটের দিনগুলিতে নারী- পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় ১২ লাখ মানুষ ছড়িয়ে থাকবেন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে।

ভোটগ্রহণের শেষ সময় যদি বিকাল ৪টা পর্যন্তও নির্ধারিত হয়; তবু বেশি ভোটারের কেন্দ্রে বেষ্টনীর ভেতরে থাকা মানুষদের ভোট নিতে নিতে এক-আধ ঘণ্টা সময় বেশি লেগেই যায়। একটা কেন্দ্রে গড়পড়তায় ১ হাজার ৫০০ ভোট পড়লে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য তিন প্রকারের ব্যালটে ব্যবহৃত মোট ব্যালট পেপার হবে ৪ হাজার ৫০০টি। অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সীমিতসংখ্যক লোক ব্যালট পেপার নাড়াচাড়া করবেন। প্রতি মিনিটে কুড়িটি পেপার বাছাই করতে পারলে ব্যালট বাছাইয়ে সময় লাগবে ২২৫ মিনিট। তিন জন অফিসার ৪ হাজার ৫০০ ব্যালট গুনতে সময় নেবেন ১৫ মিনিট। ফর্ম পূরণ, ব্যালট সিলগালাকরণ সব মিলে আরো ৩০ মিনিট। মোট সময় সাড়ে চার ঘণ্টা।

তাড়াহুড়া করে এর চেয়ে কম সময়ে শেষ করতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে অনেক বেশি, যেমনটি এবার ঘটেছে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। ভোট শেষে প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে যদি বিকাল ৫টাতেও ব্যালট বাক্স খোলা হয়, তাহলে রাত্রি সাড়ে ৯টায় ফলাফল চূড়ান্ত করে ভোট কর্তারা কেন্দ্ৰ ত্যাগ করতে পারবেন। প্রদত্ত ভোট কম হলে আরো আগে বেরোতে পারবেন আর ভোটার বেশি হলে সময় লাগবে আরো বেশি।

নির্বাচন কমিশনের ১৪ সেপ্টেম্বর ঘোষিত কেঁচে গণ্ডূষ হয়ে যাওয়া প্রস্তাবিত সাত ধাপের নির্বাচনের প্রথম, দ্বিতীয় ও পঞ্চম ধাপে ভোটের পরে রাতে চাঁদের আলো পাওয়া যেত না। প্রস্তাবিত তৃতীয় ও সপ্তম ধাপের ভোটের পরে রাত প্রায় একটার দিকে চাঁদের উদয়ের সময়। ২১ এপ্রিল ৬ষ্ঠ ধাপের প্রস্তাবিত দিনটি হতো একেবারে চমৎকার রাতভর চাঁদের আলো ছড়ানোর আগে। চতুর্থ ধাপের ভোটের তারিখটিও মন্দ ছিল না। সেদিন রাত একটার দিকে চাঁদ অস্ত যাবে, ফলে আশা করা যায় নির্বাচনি অফিসাররা সেদিনও চাঁদের আলোর ভেতরেই যার যার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারতেন।

নির্বাচনের দিন ইউনিয়ন পরিষদের ৯ ওয়ার্ডের প্রতিটিতে কমপক্ষে একটি ভোটকেন্দ্র স্থাপিত হয়। কোথায়ও একাধিক কেন্দ্রও হয়ে থাকে। কোনো কেন্দ্রের ফলাফল তৈরিতে যৌক্তিক কারণে দেরি হলেও অন্যান্য কেন্দ্রের ফলাফল যোগ করে বিলম্বিত কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। চাঁদনি রাতে এই ঝুঁকি যতটা থাকে, অন্ধকারে থাকে তার চেয়ে অনেক বেশি। দেশের বেশ কিছু ইউনিয়ন পরিষদ অত্যন্ত দুর্গম এলাকায় এবং রাতে কেন্দ্র থেকে উপজেলা সদরে আসা খুবই কষ্টকর। ঝুঁকি থাকে পরাজিত প্রার্থী বা সমর্থকদের আক্রমণের মুখে পড়ার। আমাদের দেশে পারস্পরিক বিশ্বাস এত ঠুনকো যে, কেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স উপজেলা সদরে এনে দুয়েক দিন পরে প্রকাশ্য দিবালোকে ভোট গণনা করার কথা চিন্তা করাই সম্ভব না। কিন্তু তা করতে পারলে ভালো হতো। একাধিক দিনে ভোট হওয়ায় ফলাফল হয়ে যাওয়া এলাকার বিজয়ী ও পরাজিত সব পক্ষই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন পরে ভোট হওয়া এলাকাগুলোয়। যতই বলা হোক, রাজনৈতিকভাবে স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছে না, তথাপি রাজনৈতিক দলসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহণে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা থেকেই যায়। দলীয় ব্যানার না থাকায় চিহ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা কম মনে করে প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা আরো তীব্র হতে পারে। সে কারণে ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাগণ যেন আলোকিত পরিমণ্ডলে ভোট গণনা শেষে উপজেলা সদরে ও নিজ নিজ গৃহে ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিতকরণ নির্বাচন কমিশনের বিবেচনায় থাকলে সবার মঙ্গল।

দেশের আর্থিক সক্ষমতা বেড়ে যতদিন সব ভোটকেন্দ্র আলোকোজ্জ্বল ও ভোটকেন্দ্রের সঙ্গে উপজেলা সদরে আসার পথ সুগম না হয়, ততদিন অন্তত শুক্লা নবমী থেকে কৃষ্ণা তৃতীয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে একাধিক দিন ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করলে ভোটগ্রহণের দায়িত্ব পালনকারীগণ স্বস্তিতে থাকতে পারবেন। সময়ের অভাবে অনালোকিত রাতের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে ভোট নিতে হলে তা হতে পারে কেবল উপজেলা সদর বা সদরের কাছাকাছি ইউনিয়নগুলোয়। নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের দৈহিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এভাবে চাঁদের আলোকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের দিন ধার্য করলে অজস্র মানুষের মনে স্বস্তি আসতে পারত।

ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০২৭-এর শেষদিকে নির্বাচনের জন্য চিন্তাভাবনা করলেও ১২ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। ধরে নিচ্ছি সরকারের সবুজ সংকেত পেয়েই তারিখ ঠিক হয়েছে। প্রথম তারিখটি ২১ জানুয়ারি শুক্লা চতুর্দশীর দিন। রাতভর চমৎকার পূর্ণিমার আলো থাকবে ভোটের দিনের পর। কিন্তু চারটি ধাপের তারিখ মাঠ পর্যায়ের ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তারা ভোটের পর আলোকিত রাত পাবেন না। দ্বিতীয় ধাপের ৪ ফেব্রুয়ারির রাতটি অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার। তৃতীয় ধাপের ২৯ এপ্রিল কৃষ্ণ অষ্টমী ও শেষ ধাপের ২৭ মে কৃষ্ণা সপ্তমীতে ভোটের পর আঁধারই ছেয়ে রাখবে ভোটগ্রহণকারীদের। চতুর্থ ধাপের ১৩ মে ২০২৭ শুক্ল অষ্টমীতে রাতের প্রথম ভাগে চাঁদের আলো কিছুটা ভরসা জোগাবে।

আশায় থাকছি শান্তিপূর্ণভাবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হোক। ভোট সম্পন্ন হওয়ার পর নিরাপদে বাড়ি ফিরুক ভোটের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তাগণ।

 লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত