ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

মোবাইল পকেটে রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়? যা বলছে গবেষণা



মোবাইল পকেটে রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়? যা বলছে গবেষণা
মোবাইল পকেটে রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়? যা বলছে গবেষণা

মোবাইল ফোন ছাড়া দৈনন্দিন জীবন এখন প্রায় কল্পনাই করা যায় না। যোগাযোগ, কাজ কিংবা বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই মুঠোফোনের ব্যবহার বেড়েছে। অনেক পুরুষ দীর্ঘ সময় ফোন প্যান্টের সামনের পকেটে রাখেন। কিন্তু এই অভ্যাস পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

বিশেষ করে শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন ও চলাচলের ক্ষমতার ওপর মোবাইল ফোনের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের ইঙ্গিত মিললেও অন্য গবেষণায় সুস্পষ্ট কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল বিষয় হলো, মোবাইল ফোন থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গ এবং ফোনের তাপ শুক্রাণুর গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে কি না। তবে পকেটে ফোন রাখলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হবে কিংবা বন্ধ্যত্ব দেখা দেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।

মোবাইল ফোন কি শুক্রাণুর ক্ষতি করে?

মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত। এক্স-রে থেকে নির্গত আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের তুলনায় এই তরঙ্গের শক্তি অনেক কম।

দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকেরা পরীক্ষা করছেন, মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের সংস্পর্শে এলে শুক্রাণুর গুণমানের পরিবর্তন ঘটে কি না। শুক্রাণুর গুণমান বলতে এর সংখ্যা, গঠন, জীবিত থাকার হার এবং চলাচলের সক্ষমতাকে বোঝায়।

২০২১ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৩৯টি গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে পরীক্ষাগারে শুক্রাণুর ওপর বেতার তরঙ্গের সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু পরীক্ষায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার সম্মিলিত ফলাফলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান কমে যাওয়ার সুস্পষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেকটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের সংস্পর্শ ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উঠে আসে।

অর্থাৎ, মোবাইল ফোন শুক্রাণুর ক্ষতি করে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চললেও সাধারণভাবে ফোন ব্যবহার বা পকেটে বহনের কারণে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

প্যান্টের সামনের পকেটে ফোন রাখলে কি ঝুঁকি বাড়ে?

প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে সেটি অণ্ডকোষের কাছাকাছি অবস্থান করে। এ কারণে ফোন থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গ এবং উৎপন্ন তাপের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে।

তবে শরীরের কাছাকাছি ফোন রাখলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হবে, এমনটা বলা যায় না। এর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করতে পারে ফোনের নির্গত শক্তি, ব্যবহারের ধরন, সংস্পর্শের মাত্রা এবং অন্যান্য বিষয়গুলোর ওপর।

২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় সামনের পকেটে ফোন বহনের সঙ্গে শুক্রাণুর ঘনত্ব, মোট সংখ্যা, গঠন, চলাচলের ক্ষমতা কিংবা গর্ভধারণে প্রয়োজনীয় সময়ের সম্পর্কের বিষয়ে প্রমাণকে অনিশ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়। গবেষণাগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

তাই প্যান্টের পকেটে ফোন রাখাকে সরাসরি বন্ধ্যত্বের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখলে তা ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে।

মোবাইল ফোনের তাপ কি শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে?

শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন ও গুণমান প্রভাবিত হতে পারে।

এ কারণে দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত গরম পরিবেশে থাকা কিংবা নিয়মিত তীব্র তাপের সংস্পর্শে আসার বিষয়গুলো পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় গুরুত্ব পায়।

তবে প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোন রাখার ফলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা এতটা বেড়ে যায় যে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়, এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি। ফোন ব্যবহারের সময় তাপ তৈরি হওয়া এবং সেই তাপের কারণে প্রজননস্বাস্থ্যে বাস্তব ক্ষতি হওয়া এক বিষয় নয়।

ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে না রেখে ঠান্ডা হতে দেওয়া উচিত। একইভাবে, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে থাকা যন্ত্র শরীরের সংস্পর্শে রাখা এড়িয়ে চলা এবং প্রস্তুতকারকের নিরাপত্তানির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো।

শুক্রাণুর গুণমান কমে গেলে কী সমস্যা হয়?

শুক্রাণুর সংখ্যা কমে গেলে, চলাচলের ক্ষমতা দুর্বল হলে কিংবা গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। তবে বীর্য পরীক্ষায় কোনো একটি সূচকের ফল অস্বাভাবিক হলেই একজন পুরুষকে বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত বলা যায় না।

পুরুষের প্রজননক্ষমতায় বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—

- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার

- অতিরিক্ত মদ্যপান

- স্থূলতা ও কিছু বিপাকীয় সমস্যা

- নির্দিষ্ট সংক্রমণ ও হরমোনজনিত সমস্যা

- কিছু ওষুধের ব্যবহার

- অণ্ডকোষের নির্দিষ্ট রোগ ও অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ

এ ছাড়া বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং জীবনযাপনের অন্যান্য অভ্যাসও প্রজননক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই সন্তান ধারণে সমস্যা হলে শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী না করে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সম্ভাব্য কারণগুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কী করবেন?

মোবাইল ফোনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা চললেও প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে।

ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখুন: দীর্ঘ সময় ফোন পকেটে রাখার প্রয়োজন না হলে ব্যাগে বা শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। তবে এতে শুক্রাণুর গুণমান বাড়ে বা বন্ধ্যত্ব প্রতিরোধ হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

ফোন অতিরিক্ত গরম হতে দেবেন না: চার্জ দেওয়ার সময় বা ভারী কাজ করার সময় ফোন বেশি গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে রাখবেন না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার সুযোগ দিন।

ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান শুক্রাণুর গুণমান ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ধূমপান ত্যাগ করা উপকারী।

স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন: সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্য বজায় রাখতেও সহায়ক।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাবেন না: শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণমান বাড়ানোর দাবি করে বাজারে বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়। তবে সব পণ্যের কার্যকারিতা ও  নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব পণ্য ব্যবহার না করাই ভালো।   আরও পড়ুনআরও পড়ুনমোবাইলের ছোট ভিডিওতেই আয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও এক বছর গর্ভধারণ না হলে দম্পতির উভয়েরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে সাধারণত ছয় মাস চেষ্টা করার পর প্রজননস্বাস্থ্য মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। আগে থেকেই প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা জানা থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্য পরীক্ষা বা সিমেন অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে শুক্রাণুর সংখ্যা, চলাচলের ক্ষমতা ও গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক হরমোন পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

শুধু পকেটে মোবাইল ফোন রাখার কারণে বীর্য পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক নয়। তবে সন্তান ধারণে সমস্যা হলে কিংবা প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে শুক্রাণুর ক্ষতি হয় কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল একরকম নয়। বিশেষ করে ফোনের অবস্থানের সঙ্গে পুরুষের প্রজননক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত।

তাই এ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। চাইলে সতর্কতামূলকভাবে ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। তবে প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


মোবাইল পকেটে রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়? যা বলছে গবেষণা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মোবাইল ফোন ছাড়া দৈনন্দিন জীবন এখন প্রায় কল্পনাই করা যায় না। যোগাযোগ, কাজ কিংবা বিনোদন—সব ক্ষেত্রেই মুঠোফোনের ব্যবহার বেড়েছে। অনেক পুরুষ দীর্ঘ সময় ফোন প্যান্টের সামনের পকেটে রাখেন। কিন্তু এই অভ্যাস পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

বিশেষ করে শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন ও চলাচলের ক্ষমতার ওপর মোবাইল ফোনের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গবেষণা হয়েছে। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য ক্ষতিকর প্রভাবের ইঙ্গিত মিললেও অন্য গবেষণায় সুস্পষ্ট কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল বিষয় হলো, মোবাইল ফোন থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গ এবং ফোনের তাপ শুক্রাণুর গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে কি না। তবে পকেটে ফোন রাখলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হবে কিংবা বন্ধ্যত্ব দেখা দেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।

মোবাইল ফোন কি শুক্রাণুর ক্ষতি করে?

মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত। এক্স-রে থেকে নির্গত আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের তুলনায় এই তরঙ্গের শক্তি অনেক কম।

দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকেরা পরীক্ষা করছেন, মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের সংস্পর্শে এলে শুক্রাণুর গুণমানের পরিবর্তন ঘটে কি না। শুক্রাণুর গুণমান বলতে এর সংখ্যা, গঠন, জীবিত থাকার হার এবং চলাচলের সক্ষমতাকে বোঝায়।

২০২১ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৩৯টি গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে পরীক্ষাগারে শুক্রাণুর ওপর বেতার তরঙ্গের সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রাণীর ওপর পরিচালিত কিছু পরীক্ষায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার সম্মিলিত ফলাফলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান কমে যাওয়ার সুস্পষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেকটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গের সংস্পর্শ ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উঠে আসে।

অর্থাৎ, মোবাইল ফোন শুক্রাণুর ক্ষতি করে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চললেও সাধারণভাবে ফোন ব্যবহার বা পকেটে বহনের কারণে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

প্যান্টের সামনের পকেটে ফোন রাখলে কি ঝুঁকি বাড়ে?

প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে সেটি অণ্ডকোষের কাছাকাছি অবস্থান করে। এ কারণে ফোন থেকে নির্গত বেতার তরঙ্গ এবং উৎপন্ন তাপের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে।

তবে শরীরের কাছাকাছি ফোন রাখলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হবে, এমনটা বলা যায় না। এর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করতে পারে ফোনের নির্গত শক্তি, ব্যবহারের ধরন, সংস্পর্শের মাত্রা এবং অন্যান্য বিষয়গুলোর ওপর।

২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় সামনের পকেটে ফোন বহনের সঙ্গে শুক্রাণুর ঘনত্ব, মোট সংখ্যা, গঠন, চলাচলের ক্ষমতা কিংবা গর্ভধারণে প্রয়োজনীয় সময়ের সম্পর্কের বিষয়ে প্রমাণকে অনিশ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়। গবেষণাগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

তাই প্যান্টের পকেটে ফোন রাখাকে সরাসরি বন্ধ্যত্বের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখলে তা ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে।

মোবাইল ফোনের তাপ কি শুক্রাণুর ওপর প্রভাব ফেলে?

শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন ও গুণমান প্রভাবিত হতে পারে।

এ কারণে দীর্ঘক্ষণ অতিরিক্ত গরম পরিবেশে থাকা কিংবা নিয়মিত তীব্র তাপের সংস্পর্শে আসার বিষয়গুলো পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় গুরুত্ব পায়।

তবে প্যান্টের পকেটে মোবাইল ফোন রাখার ফলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা এতটা বেড়ে যায় যে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়, এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।

এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি। ফোন ব্যবহারের সময় তাপ তৈরি হওয়া এবং সেই তাপের কারণে প্রজননস্বাস্থ্যে বাস্তব ক্ষতি হওয়া এক বিষয় নয়।

ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে না রেখে ঠান্ডা হতে দেওয়া উচিত। একইভাবে, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে থাকা যন্ত্র শরীরের সংস্পর্শে রাখা এড়িয়ে চলা এবং প্রস্তুতকারকের নিরাপত্তানির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো।

শুক্রাণুর গুণমান কমে গেলে কী সমস্যা হয়?

শুক্রাণুর সংখ্যা কমে গেলে, চলাচলের ক্ষমতা দুর্বল হলে কিংবা গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। তবে বীর্য পরীক্ষায় কোনো একটি সূচকের ফল অস্বাভাবিক হলেই একজন পুরুষকে বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত বলা যায় না।

পুরুষের প্রজননক্ষমতায় বিভিন্ন বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—

- ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার

- অতিরিক্ত মদ্যপান

- স্থূলতা ও কিছু বিপাকীয় সমস্যা

- নির্দিষ্ট সংক্রমণ ও হরমোনজনিত সমস্যা

- কিছু ওষুধের ব্যবহার

- অণ্ডকোষের নির্দিষ্ট রোগ ও অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ

এ ছাড়া বয়স, পারিবারিক ইতিহাস এবং জীবনযাপনের অন্যান্য অভ্যাসও প্রজননক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই সন্তান ধারণে সমস্যা হলে শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী না করে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও সম্ভাব্য কারণগুলো মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কী করবেন?

মোবাইল ফোনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা চললেও প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে কিছু অভ্যাস অনুসরণ করা যেতে পারে।

ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখুন: দীর্ঘ সময় ফোন পকেটে রাখার প্রয়োজন না হলে ব্যাগে বা শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। তবে এতে শুক্রাণুর গুণমান বাড়ে বা বন্ধ্যত্ব প্রতিরোধ হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

ফোন অতিরিক্ত গরম হতে দেবেন না: চার্জ দেওয়ার সময় বা ভারী কাজ করার সময় ফোন বেশি গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে রাখবেন না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার সুযোগ দিন।

ধূমপান এড়িয়ে চলুন: ধূমপান শুক্রাণুর গুণমান ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ধূমপান ত্যাগ করা উপকারী।

স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন: সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি প্রজননস্বাস্থ্য বজায় রাখতেও সহায়ক।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট খাবেন না: শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণমান বাড়ানোর দাবি করে বাজারে বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট পাওয়া যায়। তবে সব পণ্যের কার্যকারিতা ও  নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব পণ্য ব্যবহার না করাই ভালো।   আরও পড়ুনআরও পড়ুনমোবাইলের ছোট ভিডিওতেই আয় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও এক বছর গর্ভধারণ না হলে দম্পতির উভয়েরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে সাধারণত ছয় মাস চেষ্টা করার পর প্রজননস্বাস্থ্য মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। আগে থেকেই প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা জানা থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

পুরুষের ক্ষেত্রে বীর্য পরীক্ষা বা সিমেন অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে শুক্রাণুর সংখ্যা, চলাচলের ক্ষমতা ও গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক হরমোন পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

শুধু পকেটে মোবাইল ফোন রাখার কারণে বীর্য পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক নয়। তবে সন্তান ধারণে সমস্যা হলে কিংবা প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে শুক্রাণুর ক্ষতি হয় কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল একরকম নয়। বিশেষ করে ফোনের অবস্থানের সঙ্গে পুরুষের প্রজননক্ষমতার সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সীমিত।

তাই এ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। চাইলে সতর্কতামূলকভাবে ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। তবে প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত