আমাদের চোখের সামনেই আলমগীর খান আলম গোড়াপত্তন করেছিলেন ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডসের। ম্যানহাটানের রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ থেকে শুরু করে কুইন্সের ইয়র্ক কলেজের পারফর্মিং আর্টস সবখানেই উপস্থিত থেকেছি। এমনকি কোনো দিন টিকেট কেনার প্রয়োজনও পড়েনি। আলমগীর খান আলম যেন এক প্রচ্ছন্ন জাদুকর; ঠান্ডা মাথায় বছরের পর বছর কী চমৎকার অনুষ্ঠানই না উপহার দিয়ে গেছেন! একেক সময় ঢালিউডের এই অনুষ্ঠানের টানে পুরো ঢাকাই যেন খালি হয়ে যেত, সব তারকার মেলা বসত আমাদের এই নিউ ইয়র্কে।
আলম ভাই প্রবাসের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অনন্য ধারক। কেবল তার কারণেই একটানা প্রায় আড়াই যুগ ধরে শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো উপমহাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। তার কারণেই প্রবাসের মঞ্চে পা রেখেছেন রুনা লায়লা ও সাবিনা ইয়াসমিনের মতো কিংবদন্তিরা। রানী মুখার্জি একবার ঢালিউডের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের শাহরুখ খান কিংবা সালমান খানের মতোই এই আলমগীর খান!’
এবার আয়োজিত হলো আলম-বিহীন ঢালিউড। তবে মিলনায়তন ভর্তি শ্রোতা-দর্শক যেন প্রতি মুহূর্তেই মিস করেছেন আলম ভাইকে। শাকিব খান থেকে শুরু করে সাগর ভাই, সবাই হৃদয়ের গভীর থেকে তার অনুপস্থিতি অনুভব করেছেন। ঢালিউডের প্রাক্কালে আয়োজিত ‘মিট দ্য প্রেস’ এ আমার বিশেষ অনুরোধ ছিল, অন্তত আলম ভাইয়ের উপস্থিতি যেন আমরা ডিজিটাল পর্দায় দেখতে পাই। আমার সেই আশা পূর্ণ হয়েছে।
ঢালিউডের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনেকেই এসেছেন, এসেছেন মেগাস্টার শাকিব খানও। তবে আমার কাছে আরও দুজনের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ফরিদুর রেজা সাগর ভাই ও আফজাল হোসেন ভাই। তারা দুজনেই কালজয়ী ব্যক্তিত্ব, আবার একই সাথে আমার জীবনের বহু যুগের পরম প্রিয়জন। সাগর ভাইয়ের স্ত্রী কনা আপা আমার অত্যন্ত আপন একজন মানুষ, তার স্নেহচ্ছায়ায় থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আর আফজাল ভাইয়ের স্ত্রী সম্পর্কে আমার ভাতিজি, স্বভাবতই খুব কাছের।
সাগর ভাইয়ের আজীবন সম্মাননা প্রাপ্তি যেন পুরো ঢালিউড উৎসবকেই মহিমান্বিত করেছে। তার মতো একজন অসাধারণ মানুষের সরাসরি উপস্থিতি সত্যিই এক বিরাট পাওয়া। অনুষ্ঠানের প্রবেশপথে সাগর ভাইয়ের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘আমার কনা আপু কোথায়?’ তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘একটু পরেই পেয়ে যাবে তোমার বোনকে।’ মিলনায়তনে কনা আপার মমতাময় স্পর্শ, আফজাল ভাইয়ের উষ্ণ কোলাকুলি আর মনা মামনির দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন, সব মিলিয়ে পরিবেশটা অপূর্ব হয়ে উঠেছিল। এর মাঝে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম নিহার সিদ্দিকী ভাইয়ের জন্য। দূর শহর থেকে এসে অনুষ্ঠানের ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করার জন্য অবশেষে যখন তিনি এলেন, তার ক্যামেরার ক্লিকে পুরো দৃশ্যপট যেন এক লহমায় বদলে গেল।
আমি ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছিলাম সাগর ভাইকে নিয়ে তৈরি বিশেষ পর্বটির জন্য। শাকিব খান ও আফজাল ভাইসহ মঞ্চে সবার সাথে যোগ দিলেন তিনি। এরপর বিরাট পর্দায় দেখা গেল তাকে নিয়ে নির্মিত একটি বিশেষ তথ্যচিত্র, যার নেপথ্যে ছিল আফজাল ভাইয়ের অসাধারণ ধারাবর্ণনা। ঢালিউডের এই বিশেষ আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিক মনে হয়েছে ফরিদুর রেজা সাগর ভাইয়ের আজীবন সম্মাননা লাভ। তার মতো এক ক্ষণজন্মা মানুষকে সম্মানিত করতে পেরে ‘শোটাইম মিউজিক অ্যান্ড প্লে’ যেন ধন্য হলো।
ঢালিউড অ্যাওয়ার্ডসের ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন কোনো সাদামাটা আয়োজন নয়; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ পরিকল্পনা, বিশাল টিমওয়ার্ক ও স্মার্ট আউটলাইন। আলমগীর খান আলম সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও তার চেতনা ও স্পিরিট কাজ করেছে প্রতিটা মুহূর্তে। খাইরুল আলম খোকন, ফাহাদ সোলায়মান, শারমিন সিরাজ সোনিয়াসহ বাকিরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন পুরো অনুষ্ঠানকে সার্থক করতে। সাউন্ড গিয়ারের সায়েমও চমৎকার কাজ উপহার দিয়েছেন।
আমার এই লেখাটি কোনো আনুষ্ঠানিক সংবাদ প্রতিবেদন নয়, বরং শ্রদ্ধেয় সাগর ভাইয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা ও বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
মতামত