সারা দিন ফোনের নোটিফিকেশনের টুংটাং শব্দে আমরা কীভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠি, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। সারাক্ষণ যেন একটা তাড়া—নতুন কোনো মেসেজ বা নতুন খবর এলে মুহূর্তেই চোখ বুলাতে হবে ডিসপ্লেতে। এই অন্তহীন ভার্চুয়াল দৌড়ঝাঁপ থেকে বের হয়ে কে না একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে চায়?
তবে অনেকেরই মনে হতে পারে, বর্তমান যুগে স্মার্টফোন ছাড়া কি আর জীবন চলে? চেনা পথ চিনতে জিপিএস নেভিগেশন, পছন্দের কনসার্ট বা সিনেমার টিকিট কাটা, কিংবা রেস্তোরাঁয় বসে কিউআর কোড স্ক্যান করে মেনু দেখা—এতসব কাজ স্মার্টফোন ছাড়া হবে কীভাবে?
তবে এই ধারণার একেবারেই বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে ভিন্ন এক পথের কথা বলছেন নিউ ইয়র্কের বিশিষ্ট দৃশ্যশিল্পী ও প্রযুক্তি সচেতন সমাজকর্মী আগস্ট লাম। তার লেখা নতুন বই ‘ইউ ডোন্ট নিড এ স্মার্টফোন: এ প্র্যাকটিক্যাল গাইড টু ডাউনগ্রেডিং ইউর ফোন অ্যান্ড আপগ্রেডিং ইউর লাইফ’-এ তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তিকে কিছুটা দূরে সরিয়ে সাধারণ একটি বোতামওয়ালা বা ফ্লিপ ফোন ব্যবহার করার সুফল এতই বেশি যে, সামান্য কিছু ঝামেলার কথা অনায়াসেই ভুলে থাকা যায়।
কাজের চেয়ে স্ক্রিনেই বেশি সময় কেটে যাচ্ছিল, একটা সময় নিজেকে স্মার্টফোনে আসক্ত মনে হতে শুরু করে আগস্টের। নিজের সৃজনশীলতাকে ধরে রাখতে ২০২২ সালে ২৭তম জন্মদিনের পরপরই জীবনের বড় এই সিদ্ধান্ত নেন—বিদায় জানান স্মার্টফোনকে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বইটি লিখেছেন তিনি। সেখানে একদিকে যেমন আছে স্মার্টফোন বর্জনের জোরালো যুক্তি, তেমনি রয়েছে এই নতুন জীবনে কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়, তার সহজ নির্দেশনা।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনহঠাৎ বাইকের মাইলেজ কমে যাচ্ছে? জানুন সম্ভাব্য কারণবিজ্ঞানও কিন্তু আগস্ট লামের এই ভাবনাকে সমর্থন দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেলের কার্যালয়ের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি কিশোর-কিশোরীরা দিনে গড়ে আট ঘণ্টারও বেশি সময় কাটায় নানা ধরনের ডিজিটাল পর্দায়। আর এই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম যে মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত।
ইন্টারনেট সুবিধাহীন একটা সাধারণ ফ্লিপ ফোন ব্যবহার শুরু করার পর কীভাবে আগস্ট লামের জীবন পালটে গেল এবং সাধারণ মানুষের জীবনেই বা তা কী ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে—তা নিয়ে তার সঙ্গে সম্প্রতি এক দীর্ঘ কথা হয় সিএনএনের। সংক্ষেপে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
সিএনএন: স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দেওয়ার পর আপনি নাকি অন্যদের সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক তৈরি করতে পারছেন? ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটল?
আগস্ট লাম: প্রথম দিকে বেশ ভয় করছিল। ভেবেছিলাম স্মার্টফোন না থাকলে পরিচিত মানুষগুলোর থেকে দূরে সরে যাব, আবার নতুন কারও সঙ্গেও হয়তো আর দেখা-সাক্ষাৎ হবে না। কারণ অনলাইনে কোথায় কী অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেসব তো আর জানতে পারব না। কিন্তু সত্যি বলতে, স্মার্টফোন ছাড়ার পর দেখলাম আমার বন্ধুসংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কটাও আরও মজবুত ও নিবিড় হয়েছে।
এর একটি বড় কারণ হলো, প্রযুক্তি বা ডিভাইসে যখন আপনি মন না দিচ্ছেন, তখন মানুষের প্রতি আপনার মনোযোগ ও আন্তরিকতা এমনিতেই বেড়ে যায়। আপনি যখন কারো সঙ্গে থাকছেন, পুরোপুরিভাবেই সেখানে উপস্থিত থাকছেন। আর যখন একা থাকছেন, আপনার মন নিজের মতো করেই একা থাকা আর সামাজিক মেলামেশার স্বাভাবিক ছন্দটা ধরে ফেলছে।
কিন্তু কাছে একটা স্মার্টফোন থাকলে পুরো বিষয়টাই উলটে যায়। মানুষের ভিড়ে বসেও ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকে আপনি মানসিকভাবে একা হয়ে পড়েন, আবার যখন সম্পূর্ণ একা থাকেন, তখনো ফোনের পর্দায় সামাজিক জীবন খুঁজতে যান। আমি দেখলাম, যখনই ফোনটা সরিয়ে রাখলাম, আমার শক্তি ও মনঃসংযোগ আরও কেন্দ্রীভূত হলো। আশপাশের মানুষও এই পরিবর্তনের খুব ইতিবাচক সাড়া দিতে শুরু করল।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, বন্ধুত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে আমি ও আমার বন্ধুরা অনেক বেশি আন্তরিক হয়ে উঠলাম। তারা বুঝতে পারল যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণের ছবি বা ব্যক্তিগত জীবনের নতুন কোনো খবর পোস্ট করলেই তা আমার কাছে পৌঁছে যাবে না। কোনো খবর জানাতে হলে আমাকে সরাসরি ফোন করতে হবে কিংবা সামনাসামনি এসে বলতে হবে। কারণ বোতামফোনে কোনো গ্রুপ মেসেজ বা চ্যাট দেখার সুযোগ ছিল না।
আরও পড়ুনআরও পড়ুনহোয়াটসঅ্যাপ দিয়ে ঘরে বসেই আয়ের সহজ ১০ উপায়প্রথমে একটু মানিয়ে নিতে কষ্ট হলেও পরে দেখা গেল, এটি অত্যন্ত সুন্দর এক চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢালাওভাবে সবাইকে জানানোর বদলে নির্দিষ্ট কোনো অনুভূতির খবর ব্যক্তিগতভাবে ভাগাভাগি করার একটা সুযোগ তৈরি হলো।
এ ছাড়া নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগও অনেক বেড়েছে। এখন কারও সঙ্গে দেখা হলে আর বলতে হয় না, ‘চলুন সোশ্যাল মিডিয়ায় একে অপরকে যুক্ত করে নিই।’ বরং সেখানেই তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, ‘আসুন আগামী সপ্তাহে এক জায়গায় বসে চা খাই’ কিংবা ‘আমার একটা অনুষ্ঠান আছে, আপনি আমন্ত্রিত।’ পরে আলাদা করে সময় বের করে মেসেজ দেওয়ার সেই ঝক্কি আর থাকছে না।
সিএনএন: অনেকেই মানসিক ক্লান্তি বা খারাপ লাগা থেকে দূরে থাকতে ফোনের বোতামে আঙুল চালান। ফোন ছাড়া এই সময়গুলো কীভাবে সামাল দেন?
আগস্ট লাম: প্রথম প্রথম মনে হতে পারে আপনি যেন খাঁচায় বন্দি, আর কোনো সমস্যার সমাধান আপনার জানা নেই। দীর্ঘ এক বা দুই দশক পর হঠাৎ করেই যেন নিজের আসল মানসিক অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনালগ বা একদম সাধারণ পদ্ধতিতেই এর সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন মন খারাপ বা মানসিক চাপ হলে কোনো বন্ধুকে ফোন দেওয়া, কোনো বই খুলে বসা, একটু হাঁটাহাঁটি করা কিংবা গান শোনা। খালি জায়গাটা পূরণ করার একটা পথ ঠিকই বের হয়ে আসে, তবে একদম সুস্থ ও সুন্দর উপায়ে।
আর বড় কথা হলো- কোনো খারাপ অনুভূতি এলে এখন আর অত ভয় লাগে না। নিজের সঙ্গে এত সুন্দর একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে যে, মনে হয়—‘ঠিক আছে, খারাপ লাগছে লাগুক, আমি তো এর সঙ্গে পরিচিত!’
সিএনএন: আমাদের ধারণা স্মার্টফোন সময় বাঁচায়। কিন্তু আপনি বলছেন স্মার্টফোন ছাড়ার পর আপনার হাতে নাকি অঢেল সময়! এটা কীভাবে সম্ভব?
আগস্ট লাম: ধরুন, আমরা প্রতিদিন গড়ে পাঁচ ঘণ্টা ফোনে স্ক্রল করি। এখন স্ক্রল করা বন্ধ করলে সেই পাঁচ ঘণ্টা সময় কিন্তু আমাদের জীবনে সরাসরি ফিরে আসছে। এখন অনলাইন বিল না দিয়ে সরাসরি অফিসে গিয়ে বিল পরিশোধ করা, পোস্ট অফিসে যাওয়া বা বাস টিকিট প্রিন্ট করতে লাইব্রেরিতে যাওয়া—এই কাজগুলোতে নিশ্চয়ই পুরো পাঁচ ঘণ্টা লেগে যাবে না? মানুষ হয়তো এগুলোকে বেশ ঝামেলা মনে করে, কিন্তু বাস্তবে এতে খুব সামান্য সময় বেশি লাগে। বরং হেঁটে হেঁটে এসব জায়গায় গেলে কিছুটা শারীরিক ব্যায়াম হয়, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয় এবং বাইরের পৃথিবীর স্বাদ পাওয়া যায়।
দিনের শেষে কিন্তু কেউ ভেবে বলে না, ‘আজ সারা দিন আমি অনলাইনে সময় নষ্ট করেছি।’ কারণ অপচয়টা হয় একটু একটু করে। একটা মেসেজের উত্তর দেওয়া, এরপরই চট করে খবরগুলো একবার দেখে নেওয়া—প্রতিদিন ৫০ বার এমন করলে দেখতে দেখতে কয়েক ঘণ্টা সময় এমনিতেই শেষ হয়ে যায়। এই সুযোগটা বন্ধ করে দিলেই বাড়তি সব সময় নিজের হাতের মুঠোয় চলে আসে।
এই একটা সিদ্ধান্ত আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে। কাজের খুব চাপ থাকলেও দিনশেষে নিজের জন্য কয়েক ঘণ্টা সময় আমি ঠিকই বের করে নিতে পারি। ডিভাইস কাছে থাকার সময় যে সার্বক্ষণিক অস্থিরতা আর প্যানিক বা ভয় কাজ করত, তা এখন একেবারেই নেই। আমরা সবাই নিজেদের অনেক ব্যস্ত ভাবি, কিন্তু আমার মনে হয় এই ভাবনাটাকে এখন একটু প্রশ্নবিদ্ধ করার সময় এসেছে।
সিএনএন: আপনি লিখেছেন যে জিপিএস বা নেভিগেশনের জন্য ফোনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আমরা নাকি নিজেদের স্বনির্ভরতা হারিয়ে ফেলছি। স্মার্টফোন ছেড়ে দেওয়ার পর আপনার বুদ্ধি কি আগের চেয়ে বেশি শানিত মনে হয়?
আগস্ট লাম: মানুষের স্বাভাবিক দক্ষতাগুলো খুব দ্রুতই আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে। এর জন্য আলাদা করে কোনো প্রশিক্ষণের দরকার হয় না। মানুষ হিসেবে প্রকৃতিগতভাবেই আমরা যেকোনো তথ্য মনে রাখতে এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখতে পারদর্শী। এমনকি যাদের মনে রাখার ক্ষমতা দুর্বল, মনসংযোগে সমস্যা আছে কিংবা দিক চেনার হাত কাঁচা, তাদের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই কথা প্রযোজ্য।
দিক বা তথ্য মনে রাখার এই সক্ষমতা মূলত বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক মৌলিক আদিম দক্ষতা। আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। কাগজ-কলম কিংবা লেখার চল শুরু হওয়ার হাজার হাজার বছর আগে থেকেই মানুষের ব্রেন সবকিছু মনে রাখা ও দিক চিনতে পারার কাজে ভীষণ পারদর্শী ছিল।
স্মার্টফোন ছেড়ে দিয়ে যখন নিজের ওপর ভরসা রাখতে শুরু করলাম, নিজের মানসিক সক্ষমতা দেখে আমি নিজেই তাজ্জব হয়ে গিয়েছি! যারা স্মার্টফোন ছেড়েছেন, তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ঠিক একই রকম।
সিএনএন: চারপাশের বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে আপনি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি যুক্ত। এই অনুভূতিটা ঠিক কেমন?
আরও পড়ুনআরও পড়ুনএআইয়ের যুগে ঘরে বসে আয়ের নতুন সম্ভাবনাআগস্ট লাম: স্মার্টফোন থাকার সময়ে পরিবেশ থেকে আমি কতটা বিচ্ছিন্ন ছিলাম, সেই কথাটা বললেই হয়তো বিষয়টা ভালোভাবে বোঝা যাবে। আগে যেমন কারো সঙ্গে কথা বলার সময়ও মাথার ভেতর ঘুরপাক খেত—কখন আবার ফোনটা হাতে নিয়ে দেখতে পারব। এটি ঠিক তেমনই এক ছটফটে অনুভূতি, যেমন চুলোয় রান্না বসিয়ে এসে দরজায় প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলা! মুখে বলছি, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল,’ অথচ মনে মনে ইচ্ছা করছে চট করে ভেতরে গিয়ে রান্নার হাঁড়িটা দেখে আসি! ফোনে থাকলে সব সময় মনে হতো পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ডে এমন কিছু একটা যেন ফুটছে বা ঘটছে, আর সামনের এই জীবনটা যেন আসল নয়!
মনোযোগ বিভক্ত হওয়া মানেই বর্তমান মুহূর্ত থেকে ছিটকে যাওয়া। বাস্তবে উপস্থিত থাকার অর্থ হলো—আপনি এখন যে অবস্থায় আছেন, তাতেই পুরোপুরি শান্ত থাকা। অন্য মুহূর্তের সঙ্গে এর তুলনা না করা, কোনো কিছু দিয়ে এই মুহূর্তটাকে জোর করে ভরিয়ে তোলার চেষ্টা না করা, কিংবা সময় অপচয় হচ্ছে ভেবে অহেতুক ছটফট না করা।
সিএনএন: যাদের মনে হয় স্মার্টফোন ছাড়া তাদের একদিনও চলবে না, তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
আগস্ট লাম: অন্তত একবারের জন্য হলেও স্মার্টফোন ছাড়া থাকার একটা পরীক্ষা চালিয়ে দেখুন না! সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অন্তত এক মাস বোতামফোন ব্যবহার করে দেখুন কেমন লাগে। কারণ আপনি তো চেষ্টা করেই দেখেননি, চেষ্টা না করে কী হবে না হবে তা আগেভাগে বলবেন কীভাবে?
আর হ্যাঁ, চিকিৎসার প্রয়োজনে যদি রক্তের শর্করা (গ্লুকোজ) মাপার মতো কোনো অ্যাপের জন্য স্মার্টফোন রাখতেই হয়, তবে সে ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ থাকবে—সরাসরি যোগাযোগের জন্য একটা বোতামফোন বা সাধারণ ফোন ব্যবহার করুন। আর স্মার্টফোনটিকে ব্যবহার করুন স্রেফ একটা ডিজিটাল মেডিকেল ডিভাইস হিসেবে!
মতামত