৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে ফুটপাতের পাশের দেয়ালে ১০ জন গুণী ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকা হয়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম, লালন, জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান, জহির রায়হান, শাহ আবদুল করিম, হুমায়ুন ফরীদি এবং পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিতর্ক শুরু হয়। কেউ কেউ অভিযোগ তুলে বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের লোকদের ছবি কেন?’ ১০ অক্টোবর দুপুরের দিকে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী শুধু রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপন করছেন। কবিগুরুর অপরাধ—তিনি নাকি বাংলাদেশবিরোধী ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিলেন। ঘটনাটিতে পুলিশ চারজনকে আটক করে। আটক ব্যক্তিরা রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সঙ্গে যুক্ত।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সাংবাদিকসহ কিছু লোক সেই নারীকে কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিলে উত্তর দিতে না পেরে বক্তব্য পাল্টে বলেন, তিনি জ্বরে আক্রান্ত। তাঁকে সাধারণ প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা বলে আনা হয়েছে, কালি লাগানোর বিষয়টি তিনি জানতেন না। তাহলে কি ওই নারীকে অর্থের বিনিময়ে কালি লেপনের জন্য ঘটনাস্থলে যেতে বলা হয়েছিল? সন্দেহ হয়।
আবার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন রিকশাচালক পানি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি থেকে কালি মুছে দিচ্ছেন। এই ঘটনায় দেখা গেল, একজন রবীন্দ্রনাথকে ভুলভাবে পাঠ করেছেন, হতে পারে তিনি বিদ্বান। আর বিপরীতে আরেকজন কবিকে সম্মান দেখাচ্ছেন, সমাজে যিনি নিম্নবিত্তের, স্বল্প জ্ঞানী।
দুজন ব্যক্তি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমরা কোন সংস্কৃতির অংশ হতে চাই। যারা কালি দিচ্ছে, তারা বলতে চায়, বিশ্বকবি বাংলাদেশের কেউ নন। এটা কি সংস্কৃতিকে খণ্ডিত করার অপচেষ্টা নয়?
বারবার কেন রবীন্দ্রনাথই আক্রান্ত হন? সেটা কি শুধু আজকের ব্যাপার; সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। তাঁর বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। এটি বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত একটি ভুল তথ্য। কোনো ঐতিহাসিক দলিলে এর প্রমাণ নেই। ঢাবি প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন মূলত কলকাতার কিছু জমিদার ও হিন্দু নেতা। কিন্তু এই তথ্যকে বারবার ব্যবহার করা হয় রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে।
আলোচিত ঘটনায় পুলিশ আইনিভাবে সঠিক কাজ করেছে। তবে প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি সংস্কৃতিকে পাহারা দিতে চায় পুলিশ দিয়ে? অথচ সংস্কৃতি নিজেই নিজেকে রক্ষা করার কথা, সাধারণেরই সংস্কৃতিকে আগলে রাখার কথা।
অপতথ্য ছড়ানো বন্ধ করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাঠ্যবইসহ নানা সূত্রে সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে রাষ্ট্রকেই। পুলিশ দিয়ে নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। যারা সংকীর্ণ, বহুত্ববাদে বিশ্বাস করে না, তারাই রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করে। তাই রাষ্ট্রকে কঠোরভাবে দাঁড়াতে হবে তাদের বিরুদ্ধে; তাদের কট্টর, সংকীর্ণ বয়ানকে পাল্টা চিন্তা, বাহাস ও যুক্তি দিয়ে সঠিক ইতিহাস নির্মাণ করে।
মতামত