স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায় কি তাকে তালাক দেওয়া যায়? তালাক দিলে কত দিন পর তা কার্যকর হবে? সন্তানের হেফাজত ও ভরণপোষণের দায়িত্ব কার ওপর থাকবে? এ বিষয়ে আইন কী বলে?
মৌলভীবাজার থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি এসব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন, তার স্ত্রী প্রায়ই তাকে না জানিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান। এ ছাড়া একাধিক পুরুষের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন। বিষয়টি জানার পর নিষেধ করলেও স্ত্রী তার কথা শোনেন না বলে অভিযোগ তার।
এমন পরিস্থিতিতে স্ত্রীর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব নয় জানিয়ে তিনি তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। তার স্ত্রীর ভাষ্যমতে, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। এ অবস্থায় তালাক দেওয়ার নিয়ম, তালাক কার্যকর হওয়ার সময় এবং সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে জানতে চেয়েছেন ওই ব্যক্তি।
এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শুভ্র সিনহা রায়।
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তালাক দেওয়া যাবে কি?
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থায়ও তালাক দেওয়া যায়। তবে এ ক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৭ ধারায় বলা হয়েছে, তালাক উচ্চারণের পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা প্রযোজ্য কর্তৃপক্ষকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে এবং স্ত্রীর কাছেও নোটিশের অনুলিপি পাঠাতে হবে। কর্তৃপক্ষ নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পার না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত তালাক কার্যকর হয় না। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকলে ৯০ দিন অথবা গর্ভাবস্থার অবসান—যেটি পরে ঘটবে, তার আগে তালাক কার্যকর হবে না।
অর্থাৎ, স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা থাকলে সন্তান জন্মের পরও ৯০ দিনের সময়সীমা শেষ না হলে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আবার নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পার হলেও সন্তান প্রসব না হলে গর্ভাবস্থার অবসান পর্যন্ত তালাক কার্যকর হবে না।
সন্তানের হেফাজত ও ভরণপোষণের দায়িত্ব কার?
তালাকের পর সন্তান কার কাছে থাকবে, তা নির্ধারণে সন্তানের বয়স, পরিস্থিতি এবং তার সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করা হয়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, সাধারণত ছেলে সন্তান সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তান বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকতে পারে। তবে এটি সব পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত নিয়ম নয়। সন্তানের কল্যাণ বিবেচনায় আদালত ভিন্ন সিদ্ধান্তও দিতে পারেন।
সন্তানের হেফাজত মায়ের কাছে থাকলেও তার ভরণপোষণের দায়িত্ব সাধারণত বাবার ওপর বর্তায়। সন্তানের প্রয়োজন, ভরণপোষণের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
আইনি জটিলতা এড়াতে করণীয়
তালাকের সিদ্ধান্ত নিলে আইন অনুযায়ী লিখিত নোটিশ দেওয়া, স্ত্রীর কাছে নোটিশের অনুলিপি পাঠানো এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। নিয়ম না মেনে তালাকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া সন্তানের হেফাজত, ভরণপোষণ ও অন্যান্য পাওনা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে পারিবারিক আদালতের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে।
তাই তালাকের আগে পারিবারিক আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া এবং সম্ভব হলে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা উচিত।
মতামত