কক্সবাজারের উখিয়ার ১৬ বছর বয়সী তাহমিনার সামনে তখন দশম শ্রেণির পড়াশোনা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট ও বাবার অসুস্থতার কারণে হঠাৎ করেই বদলে যেতে বসেছিল তার ভবিষ্যৎ।
পড়াশোনার বদলে পরিবার তার বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করে। বিয়ের কথা শুনে ভেঙে পড়ে তাহমিনা। তবে বিয়ে মেনে না নিয়ে নিজের কথা জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় কিশোরীটি। ২০২৩ সালে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এ গল্পটি উঠে আসে।
এ ঘটনা থেকেই বাংলাদেশের কন্যাশিশুর অবস্থান, অধিকার ও সমাজব্যবস্থার করুণ বাস্তবতা উপলব্ধি করা যায়।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে সেই দেশের কন্যাশিশুরা কিভাবে বেড়ে উঠছে তার ওপর। যে সমাজ একটি মেয়ের শৈশবকে নিরাপদ রাখে, তার শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে দেখে, তার স্বপ্নকে পরিবারের সামর্থ্যের সঙ্গে মেপে ছোট করে না এবং তাকে নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়, সেই সমাজ শুধু একটি প্রজন্মকে বদলায় না, তার পরবর্তী প্রজন্মের ভিত্তিও শক্তিশালী করে। আর যে সমাজ মেয়ের ভবিষ্যেক বাল্যবিবাহ, নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক কুসংস্কারের কাছে সমর্পণ করে, সেখানে উন্নয়নের অনেক অর্জনই শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাই কন্যাশিশুর প্রশ্নটি আজ দেশের মানবসম্পদ, অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায় এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্ন।
আজ ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করুন এবং মেয়েদের অধিকারে বিনিয়োগ করুন’। প্রতিপাদ্যটির তাৎপর্য এখানেই যে কন্যাশিশুর সুরক্ষাকে শুধু ক্ষতিকর একটি প্রথা বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, নিরাপত্তা, নেতৃত্ব এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারকে একই আলোচনার অংশ করা হয়েছে। জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়।
একই সঙ্গে গত ২৫ বছরে শিক্ষা, আইন সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের ফলে আনুমানিক ছয় কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। আবার ইউনিসেফের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে এও বলা হয়েছে, গ্রামীণ মেয়েরা শহরের মেয়েদের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে দরিদ্র পরিবার ও কম শিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে বাল্যবিবাহের হার অনেক বেশি। অর্থাৎ শুধু স্কুলে ভর্তি করানো যথেষ্ট নয়, মেয়েকে স্কুলে ধরে রাখা, মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করানো এবং তারপর উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথে নিয়ে যাওয়া, এটাই হওয়া উচিত পরবর্তী লক্ষ্য। ফলে সমস্যাটি বড় হলেও পরিবর্তন অসম্ভব নয়; সঠিক নীতি, ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং সামাজিক পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করলে বাস্তব ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট। একদিকে মেয়েদের শিক্ষায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্যদিকে বাল্যবিবাহ এখনো সেই অগ্রগতির সামনে বড় বাধা। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে এবং ১৩.৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি। অর্থাৎ মেয়েদের বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, তাদের শৈশব, কৈশোর ও জীবন-সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় একটি পথ বাকি।
এই জায়গায়ই কন্যাশিশুর উন্নয়নকে শুধু অধিকারের দৃষ্টিতে নয়, সক্ষমতার দৃষ্টিতেও বোঝা জরুরি। অমর্ত্য সেনের ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো অধিকার কাগজে থাকা এবং সেই অধিকার বাস্তবে ব্যবহার করার ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়। একটি মেয়ের স্কুলে যাওয়ার অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু যদি দারিদ্র্যের কারণে তাকে স্কুল ছাড়তে হয়, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তার চলাচল সীমিত হয়, পরিবারের সিদ্ধান্তে তার মতামতের মূল্য না থাকে কিংবা অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে তার আনুষ্ঠানিক অধিকার বাস্তব স্বাধীনতায় রূপ নেয় না। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একটি মেয়ে শুধু সুযোগ পায় না, সেই সুযোগ ব্যবহার করার সক্ষমতাও অর্জন করে।
বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষায় অগ্রগতির ইতিহাস তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় উপবৃত্তি ও অন্যান্য প্রণোদনা চালু করার ফলে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ে। পরবর্তীকালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময় মেয়েদের শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের এই দর্শন আরো দৃশ্যমান রূপ পায়। মেয়েদের জন্য সর্বজনীন উপবৃত্তির যে নীতি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে, তার মূল দর্শন ছিল পরিষ্কার : একটি মেয়ের শিক্ষা তার পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করবে না; রাষ্ট্রও তার ভবিষ্যতের অংশীদার হবে। এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জনের পথকে উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করেছে। এমনকি ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সভায় বেগম খালেদা জিয়ার সময়কার ‘ইউনিভার্সাল গার্লস স্টাইপেন্ডস’-এর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য তা পুনঃপ্রবর্তনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সভায় ড্রপ-আউট কমানো এবং স্কুল পর্যায়ে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এখানে একটি বড় নীতিগত ধারাবাহিকতা দেখা যায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে নারী উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৬ সালে উইমেনস অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন এবং ১৯৭৮ সালে উইমেনস অ্যাফেয়ার্স মিনিস্ট্রি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি স্বতন্ত্র ক্ষেত্র হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে মেয়েদের শিক্ষায় ব্যাপক রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সেই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে। আর বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নারীকে শুধু সামাজিক সহায়তার গ্রহীতা হিসেবে নয়, পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার নীতিগত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই ধারাবাহিকতাকে শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না; বরং এটিকে নারী উন্নয়ন সম্পর্কে একটি বিবর্তিত ‘পলিসি ফিলোসফি’ হিসেবে দেখা যায়। প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজন ছিল নারীর জন্য রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি তৈরি করা। পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজন ছিল মেয়েদের শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়া। এখন প্রয়োজন সেই শিক্ষাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় রূপান্তর করা।
বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মধ্যেও এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। ২০২৬ সালের মার্চে প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় এনে প্রতি মাসে দুই হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। সহায়তার অর্থ সরাসরি নারী উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে কর্মসূচিটি আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব শুধু মাসিক দুই হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরতর অর্থ হলো, পরিবারের সামাজিক সুরক্ষার সম্পদ সরাসরি নারীর হাতে পৌঁছানো। একজন নারীর হাতে সরাসরি সম্পদ গেলে পরিবারের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
কন্যাশিশুর সঙ্গে এর সম্পর্ক আরো গভীর। কারণ একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ তার নিজের মেধা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি তার পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে। যখন একটি পরিবার খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খায়, তখন মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করা কিংবা অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়ে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সেই চাপ কমাতে পারলে তা সরাসরি কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষার একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সভায় মেয়েদের ড্রপ-আউট কমানো, উপবৃত্তি এবং স্কুল পর্যায়ে পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবারের বিষয়কে গুরুত্ব দেন। মেয়েদের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত ইউনিভার্সাল স্টাইপেন্ড পুনঃপ্রবর্তনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশও দেওয়া হয়। শিক্ষা ও পুষ্টিকে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি শিশুর শেখার সক্ষমতা তার শারীরিক সুস্থতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
কন্যাশিশুর ওপর বিনিয়োগের অর্থ আরো বিস্তৃত। একটি মেয়ের শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু তার পরীক্ষার ফল ভালো করা নয়; এর অর্থ ভবিষ্যতের দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, গবেষক, চিকিৎসক, প্রশাসক এবং সচেতন নাগরিক তৈরির ভিত্তি তৈরি করা। একজন শিক্ষিত নারী তাঁর নিজের জীবনকে যেমন বদলান, তেমনি তাঁর সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও প্রভাব ফেলেন। ফলে একটি মেয়ের শিক্ষায় বিনিয়োগের সামাজিক ‘রিটার্ন’ তার ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা ছাড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মেও পৌঁছে যায়।
তবে এখানেই বাংলাদেশের সামনে নতুন প্রশ্ন দাঁড়ায়। মেয়েকে বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পর তার ভবিষ্যৎ কোথায়? শিক্ষা যদি কর্মসংস্থান, দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং নিজের আয় ব্যবহারের স্বাধীনতায় পৌঁছাতে না পারে, তাহলে মানবসম্পদে বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না। এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নারী উন্নয়নভিত্তিক পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে কন্যাশিশুর প্রশ্নের একটি স্বাভাবিক যোগসূত্র তৈরি হয়।
বর্তমান বিএনপি সরকারের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ঋণ, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা, মেয়েদের একাডেমিক ও ভোকেশনাল কার্যক্রম সম্প্রসারণ, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ, নিরাপদ চলাচল এবং ডে কেয়ারের মতো কেয়ার ইফ্রাস্ট্রাকচারের ওপর গুরুত্বকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ অর্থ বোঝা কঠিন। এগুলোকে একটি ‘লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচ’-এর মধ্যে দেখলে বোঝা যায়, লক্ষ্যটি শুধু একটি মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া নয়; তাকে এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, যেখানে সে নিজের শিক্ষা ও দক্ষতাকে নিজের আয়, পেশা ও সিদ্ধান্তের ক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারে।
এমআইসিএস ২০২৫-এর তথ্যও এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। ১৮ বছরের আগে বিয়ের হার সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের নারীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে তা ৪১ শতাংশ; উচ্চশিক্ষা পাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ১৩ শতাংশ। অর্থাৎ বাল্যবিবাহ শুধু একটি সামাজিক প্রথা নয়, এর সঙ্গে দারিদ্র্য, শিক্ষা ও সুযোগের বৈষম্য গভীরভাবে যুক্ত। তাই এর সমাধানও শুধু আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। মেয়েকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়া, কিশোরীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে যাওয়ার বাস্তব পথ তৈরি করাও সমান জরুরি।
রাষ্ট্র সুযোগের কাঠামো তৈরি করবে, পরিবার তাকে সেই সুযোগ ব্যবহারের স্বাধীনতা দেবে এবং সমাজকে মেয়ের ভবিষ্যেক শুধু বিয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পুরনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একটি মেয়েকে শুধু শিক্ষিত করে তোলা নয়, তাকে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দেওয়া, নিজের আয় অর্জনের সুযোগ দেওয়া এবং নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করাই হবে প্রকৃত অর্থে ক্ষমতায়ন।
বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের এই দীর্ঘ পথচলায় রাষ্ট্রীয় নীতি ও বিনিয়োগের ধরনও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে নারী উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ থেকে বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে মেয়েদের শিক্ষায় বড় পরিসরে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সময়ে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, দক্ষতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একসঙ্গে দেখার প্রচেষ্টা, এই ধারাকে একটি ক্রমবিকাশমান নীতিগত যাত্রা হিসেবে দেখা যায়। লক্ষ্যটি শেষ পর্যন্ত একই, নারীকে শুধু সুরক্ষার বিষয় হিসেবে নয়, দেশের উন্নয়নের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্য কন্যাশিশুর ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কন্যাশিশুর ওপর বিনিয়োগ কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয়; এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ।
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকারও হওয়া উচিত আরো স্পষ্ট : মেয়েকে শুধু রক্ষা নয়, সক্ষম করতে হবে; শুধু সুযোগ নয়, সেই সুযোগ ব্যবহারের স্বাধীনতাও দিতে হবে। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার প্রতিটি মেয়ে নিজের শিক্ষা, পেশা, আয় ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজের কণ্ঠে কথা বলার এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। কন্যাশিশুর সেই সক্ষমতাই আসলে আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত