বলা হয় একটি পরিবারে যখন একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয় তখন সেই শিশু তার সঙ্গে করে সেই পরিবারে অনাবিল আনন্দ নিয়ে আসে। কন্যাসন্তান হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া রহমত। কিন্তু সেই আদরের কন্যাসন্তানরা বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভালো নেই। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ১৮৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়। বিভিন্নভাবে নির্যাতনে ৬০ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় নানা কারণে আত্মহত্যা করে ৬১ শিশু। যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ৩৩ শিশু। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের একটি যৌথ প্রতিবেদন বলছে, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এশিয়ার শীর্ষে আর যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার বেশি সেই তালিকায় অবস্থান ৮ম। এ অবস্থায় আজ পালিত হবে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য- ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন এবং মেয়েদের অধিকারে বিনিয়োগ করুন’।
জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ১৮৮ কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়, এ সময় নানা রকম নির্যাতনে ৬০ শিশুর মৃত্যু হয়। ৬১ জন নানা কারণে আত্মহত্যা করে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ৩৩ জন। এ ছাড়াও ইভ টিজিংয়ের শিকার হয় ২ জন, অপহরণ ও পাচারের শিকার হয় ২০ জন। পানিতে ডুবে ১০৬ কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়। রহস্যজনক কারণে মৃত্যু হয় ২৬ জনের। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয় ৫ জন। যৌতুকের শিকার হয় ২ জন। ৫ শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়। এই সংগঠনের তথ্যে, শুধু ধর্ষণের পর গত ৬ মাসে ১১ জন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়। প্রেমঘটিত কারণে ৫ জনকে, পূর্বশত্রুতার জেরে ৯ জনকে, যৌতুকের জন্য ২ জনকে, গোপন তথ্য জানার কারণে ৪ জনকে, তথ্য না দেওয়ার জন্য ৯ জনকে, পারিবারিক সহিংসতার জন্য ১৫ জনকে, ১ জন গৃহকর্মী এবং ১ জন শিশুকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। ৩ জন শিশুকে হত্যার কোনো কারণ জানা যায়নি।
ভয় পরিচিতদের নিয়ে : কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের পরিসংখ্যানে দেওয়া তথ্যে, ধর্ষণের শিকার শিশুদের মধ্যে ১ জনের মৃত্যু হয়। ২০ জনকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। ২ জনকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ করা হয়। একজনকে প্রেমের আশ্বাস দিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ১২ প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়। এ ছাড়া ১৪১ শিশুকে ঘরের ভিতর এবং বাইরে ধর্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ৭২ শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানায়, গত চার বছর ৭ মাসে (২০২১-২৬ এর জুলাই পর্যন্ত) মোট ধর্ষণের মামলা হয়েছে ৩৪ হাজার ৯২২টি। আর এর মধ্যে শুধু শিশু ধর্ষণের জন্য মামলা হয়েছে ১১,৭৪৪টি। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ অপরাধীই শিশুর পূর্বপরিচিত। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগী শিশুর প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, দোকানদার, নৈশপ্রহরী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অপরাধীদের তালিকায় আছে। পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত বড় একটি অংশই আপনজন, পরিবারের সদস্য এবং পরিচিত লোকদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়।
এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে এ অপরাধও কমে আসতে পারে বলে আশা করছি। তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু ধর্ষণ মামলাগুলো খুবই স্পর্শকাতর হওয়ায় এগুলোর তদন্তে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিই। সম্প্রতি অনলাইন জিডি ও পুলিশের কাছে রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। এজন্য এসব ঘটনায় মামলার রেকর্ড সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ জাতীয় ঘটনায় অপরাধ হলে তদন্ত করাই মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে অপরাধ কমাতে সামাজিক সচেতনতাও দরকার।
বাল্যবিবাহ এশিয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ : এখনো বাল্যবিবাহের হারে বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে। আর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহ হয় এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮ম। ‘গার্লাস গোলস : হোয়াট হ্যাজ চেঞ্জড ফর গার্লস? অ্যাডলসেন্ট গার্লস রাইটস ওভার ৩০ ইয়ার্স’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে এমনটি জানানো হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৪ শতাংশেরই বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর হওয়ার আগে। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন এবং প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের একটি যৌথ প্রতিবেদন এটি।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, অনেকেই আছেন যারা জন্মনিবন্ধনে শুধু তারিখ ঠিক রেখে কন্যাসন্তানের জন্মসাল পরিবর্তন করে বাল্যবিবাহ দেন। এটি রোধ করতে হাসপাতালগুলোতে কোনো শিশুর জন্ম হলে সঙ্গে সঙ্গে তার নাম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো শিশুর জন্ম যদি বাড়িতে হয় তাহলে বাধ্যতামূলকভাবে সেই এলাকার চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলর দিয়ে তার জন্মনিবন্ধন করাতে হবে। কেউ যদি তারপরও অবৈধভাবে জাল সার্টিফিকেট দিয়ে কোনো কন্যাশিশুর বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে সেই শিশুটির বিয়ে যে কাজি পড়াবেন তাকে কঠিন শাস্তির আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
মতামত