যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে গোপনে আড়িপাতার যন্ত্র বসানোর অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন সৌদি নাগরিক প্রকৌশলী আবদুর রহমান আলফোজান।
তবে তিনি গ্রেফতারের আগে সৌদি আরবে যাওয়ার একমুখী বিমানের টিকিট কেটেছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন মার্কিন কৌঁসুলিরা। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকায় আলফোজানের বিরুদ্ধে করা ফৌজদারি অভিযোগের নথি গোপন রাখার আবেদন করেছিলেন তারা।
৩৫ বছর বয়সী আলফোজান ওপেনএআইয়ের সাবেক প্রকৌশলী। প্রতিষ্ঠানটির সান ফ্রান্সিসকোর প্রধান কার্যালয়ের একটি সম্মেলনকক্ষে গোপনে শব্দ ধারণের যন্ত্র পাওয়ার পর গত ৯ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। এর আগে গত সপ্তাহে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তিনি প্রায় ১৫ মাস ওপেনএআইয়ে কাজ করেছেন।
বুধবার প্রকাশ্যে আসা আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, আলফোজান তার স্ত্রী ও পরিবারের আরেক সদস্যকে নিয়ে গত ১২ অক্টোবর সৌদি আরবে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। মার্কিন কৌঁসুলিদের দাবি, তার বিমানের টিকিট ছিল একমুখী।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৮ অক্টোবর বিচারকের কাছে দেওয়া এক আবেদনে কৌঁসুলিরা আলফোজানের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের নথি সিলগালা করে রাখার অনুরোধ জানান। তাদের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তার রয়েছে এবং পরিস্থিতির কারণে দেশ ছাড়ার প্রণোদনাও তৈরি হতে পারে।
কী অভিযোগ আনা হয়েছে? আলফোজানের বিরুদ্ধে মৌখিক কথোপকথন গোপনে ধারণ বা আড়িপাতার উদ্দেশ্যে ইলেকট্রনিক, যান্ত্রিক কিংবা অন্য কোনও যন্ত্র ব্যবহার বা ব্যবহারের চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মার্কিন আইনে এ অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার জরিমানা।
ওপেনএআইয়ের কর্মীরা সান ফ্রান্সিসকোর প্রধান কার্যালয়ের একটি সম্মেলনকক্ষে গোপনে বসানো শব্দ ধারণের যন্ত্রটি খুঁজে পাওয়ার পর বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। এরপর তদন্তে নামে এফবিআই। তবে যন্ত্রটি বসানোর উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর মাধ্যমে কোনও কথোপকথন ধারণ করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকারের প্রস্তুতি আইনজীবীর আলফোজানের আইনজীবী উইলিয়াম পার্নিক জানিয়েছেন, তার মক্কেল অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে আদালতে লড়বেন। একই সঙ্গে তাকে আটক রাখার সিদ্ধান্তও চ্যালেঞ্জ করা হবে।
আল-জাজিরাকে পার্নিক বলেন, “বর্তমানে সংবাদমাধ্যমে যে বয়ান তুলে ধরা হচ্ছে, তা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বাস করি, মার্কিন বিচারব্যবস্থা আমাদের মক্কেলের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের মক্কেল একজন সুপরিচিত পেশাজীবী, যার স্থানীয় সমাজের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।”
আলফোজানকে নির্দোষ বলে ধরে নেওয়ার আইনি নীতির ওপর জোর দিয়ে তার আইনজীবী বলেন, “তাকে নির্দোষ বলে ধরে নিতে হবে। ন্যায়সংগত আচরণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকার তার রয়েছে।”
অভিযুক্তের সৌদি জাতীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া এবং সে কারণে তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তাকে পলাতক হওয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখানোর সমালোচনা করেন পার্নিক। তার ভাষায়, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, এসবের বিরুদ্ধে তারা পূর্ণ শক্তি দিয়ে লড়বেন।
আলফোজানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আদালতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলো এখনও বিচারাধীন এবং আইন অনুযায়ী তাকে নির্দোষ বলে ধরে নিতে হবে।
মেটা ও মাইক্রোসফটেও কাজ করেছেন আলফোজান পেশাগত জীবনে আলফোজান প্রযুক্তি খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তার নামে থাকা লিংকডইন প্রোফাইল অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার আগে তিনি মেটায় সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়া মাইক্রোসফটেও ইন্টার্নশিপ করেছেন তিনি।
আলফোজানের নাম রিয়াদভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান রায়েদ ভেঞ্চারসের ওয়েবসাইটেও রয়েছে। সেখানে তাকে প্রতিষ্ঠানটির একজন ভেঞ্চার পার্টনার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্য অংশীদারদের মধ্যে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স খালিদ বিন বান্দার বিন সুলতান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের নামও রয়েছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আলফোজানকে নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রায়েদ ভেঞ্চারস তাকে প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপে ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাজীবী হিসেবে বর্ণনা করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, তার দায়িত্বের মধ্যে থাকবে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা এবং স্টার্টআপগুলোকে প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করা।
এআই খাতে গুপ্তচরবৃত্তির উদ্বেগ আলফোজানের গ্রেফতারের ঘটনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি খাতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্বজুড়ে এআই উন্নয়নে এগিয়ে থাকার প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো গুপ্তচরবৃত্তি ও শিল্পসংক্রান্ত গোপন তথ্য চুরির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে অত্যাধুনিক এআই মডেল, গবেষণা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক কৌশল নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য থাকে। এসব তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ করা গেলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বা অন্য পক্ষ সুবিধা পেতে পারে।
তবে আলফোজানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে কোনও রাষ্ট্র, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে- এমন কোনও তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য পরিণতি নির্ধারিত হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সূত্র: আল-জাজিরা
বিডি প্রতিদিন/একেএ
মতামত