চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে রাঙামাটিয়া গ্রাম। এখানে ঢুকতেই চোখে পড়ে মাটির ঘরের সারি। তবে এসব ঘর আর দশটি গ্রামের মতো সাদামাটা নয়। কোনো দেয়ালে শিকারি জীবনের দৃশ্য, কোথাও সাঁওতাল তরুণ-তরুণীর নাচ-গান, আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র হাতে মানুষের অবয়ব। কোথাও প্রকৃতি, জীবিকা কিংবা উৎসবের দৃশ্য।
দেয়ালে দেয়ালে আঁকা প্রতিটি চিত্র যেন একটি করে গল্প। সেই গল্প দেখতে রাঙামাটিয়া গ্রামে এখন দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন দর্শনার্থীরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউনিয়নের রাঙামাটিয়া গ্রামটি এখন যেন রঙের ক্যানভাস। মাটির ঘরের দেয়ালজুড়ে ফুটে উঠেছে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ। একসময় যে দেয়ালগুলো শুধু মাটি দিয়ে লেপে রাখা হতো, সেগুলোই এখন রংতুলির ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে জীবন্ত শিল্পকর্ম।
শতাধিক মাটির ঘরে বসবাস করেন এ গ্রামের মানুষেরা। এর মধ্যে ৬৭টির বেশি বাড়ির দেয়ালে আলপনা আঁকা হয়েছে। মাত্র তিন দিনে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের এসব বাড়িকে রাঙিয়ে তুলেছেন একদল শিল্পী, শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবী।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রত্ননিদর্শন সংগ্রাহক মাহির ইয়াসির। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও নিজস্ব অর্থায়নে তিনি শুরু করেছেন ব্যতিক্রমী এই কাজ। শুধু একটি গ্রামকে সুন্দর করে তোলা নয়; মাটির দেয়ালে আঁকা শিল্পের মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠীর হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস, জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে দৃশ্যমান করে তোলা তাঁর লক্ষ্য।
মাহির ইয়াসিরের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কৌতূহল। ছোটবেলায় তিনি দেখেছেন, তাঁর দাদার জমিতে চাষাবাদের কাজে নিয়মিত আসতেন স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। তাঁদের জীবনযাপন ও আচরণ তাঁকে বিস্মিত করত।
সময়ের সঙ্গে সেই কৌতূহল পরিণত হয় জানার আগ্রহে। নিজের এলাকার সাঁওতাল জনগোষ্ঠী সম্পর্কে জানতে গিয়ে মাহির উপলব্ধি করেন, আধুনিকতার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অনেক কিছুই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আর সেই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় তাঁর নতুন পথচলা। মাহির বলেন, একজন মানুষের পক্ষে একা একটি জনগোষ্ঠীর পুরো ইতিহাস কিংবা সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে নিজের জায়গা থেকে অন্তত একটি ছোট উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই তিনি মাটির ঘরের দেয়াল বেছে নেন ক্যানভাস হিসেবে।
মাহির ইয়াসির মনে করেন, আলপনা শুধু দেয়ালের সাজসজ্জা নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের নীরব দলিল।
একসময় উৎসব-পার্বণে সাঁওতাল নারীরা মাটির ঘরের দেয়াল মাটি দিয়ে লেপে পরিষ্কার করতেন। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আধুনিক রংতুলির শিল্প। ফলে পুরোনো ঐতিহ্য নতুন রূপে ফিরে এসেছে দেয়ালে দেয়ালে।
আলপনা গ্রাম তৈরির কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। গ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় আড়াই দিনে ৬৭টির বেশি বাড়ির দেয়ালে আলপনা আঁকার কাজ শেষ করা হয়েছে।
দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন শিল্পীরা। কেউ পুরোনো সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে মিল রেখে চিত্রের বিষয় নির্বাচন করেছেন। কেউ দেয়াল প্রস্তুত করেছেন, কেউ নকশা এঁকেছেন, কেউ রং করেছেন।
মাহির জানান, গ্রামের আরও কিছু অংশে আলপনা দেওয়ার কাজ বাকি রয়েছে। ভবিষ্যতে গ্রামের অবশিষ্ট মাটির ঘরকেও এই শিল্পের আওতায় আনার চেষ্টা করবেন তিনি।
রাঙামাটিয়াকে আলপনা গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার কাজে মাহিরের পাশে দাঁড়িয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের একদল তরুণ শিল্পী। তাঁদের রংতুলির ছোঁয়াতেই মাটির দেয়ালগুলোতে প্রাণ পায় নানা গল্প। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আছেন রাশেদীন ইসলাম, ফাহিম ফয়সাল, বাবু রওজা, তুহিন, ইমন সাকিব, মাহফুজ আলী, হিমেল ঘোষ, আয়শা সিদ্দিকা ও দিলশাদ জাহান।
আধুনিকতার প্রভাবে বিশ্বের অনেক প্রান্তেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, শিল্প, আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনধারা বদলে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। একসময় যে সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে, কাজে ও উৎসবের মধ্য দিয়ে টিকে থাকত, তার অনেকটাই এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে পড়ছে।
রাঙামাটিয়ার এই উদ্যোগ সেই হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির কিছু অংশকে অন্তত দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে।
রাঙামাটিয়ার প্রবীণ অধিবাসী লুইস টুডু জানান, শুরুতে তাঁদের কাজ দেখে কিছুটা বিরক্তি বোধ করেছিলেন। পরে ছবিগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় তাঁরা খুশি হয়েছেন।
স্থানীয় লুকাস হাসদা বলেন, ‘মাহির নিজ অর্থায়নে আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য দেয়ালে ফুটিয়ে তুলেছেন। এটা নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। আলপনা আঁকার পর থেকে বহু জায়গার মানুষজন এই গ্রাম দেখতে আসছেন। তাতে আমাদেরও ভালো লাগছে।’
একসময় যে গ্রামটি ছিল বরেন্দ্র অঞ্চলের আর দশটি সাধারণ গ্রামেরই একটি, সেখানে এখন বাড়ছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা। মাটির ঘরের সারি, তার গায়ে রঙিন আলপনা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব চিত্র—সব মিলিয়ে গ্রামটি তৈরি করেছে ভিন্ন এক আবহ।
বরেন্দ্রভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন ও সংস্কৃতি মিলিয়ে রাঙামাটিয়া ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে—এমন সম্ভাবনাই দেখছেন উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
শুধু আলপনা নয়, ভবিষ্যতে রাঙামাটিয়ায় একটি জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন রয়েছে মাহিরের। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক সংরক্ষিত থাকবে সেখানে। থাকবে তাঁদের জীবনযাপনের বিভিন্ন উপকরণ, কৃষিকাজ সরঞ্জাম, বাদ্যযন্ত্র, পোশাক, অলংকার, শিল্পকর্ম, পুরোনো ছবি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন।
তাহলে রাঙামাটিয়া শুধু একটি আলপনা গ্রাম থাকবে না, হয়ে উঠবে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক আর্কাইভ।
কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের এলাকার একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে মানুষের সামনে তুলে ধরার তাগিদ থেকেই মাহির এই উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আমাদের।
মাহির মনে করেন, সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে শুধু একটি জনগোষ্ঠীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের ইতিহাসেরও একটি অংশ।
রাঙামাটিয়ার পথে হাঁটলে মনে হবে, এ যেন একটি খোলা বই। তবে বইটির পৃষ্ঠা কাগজের নয়, মাটির। কালি-কলমের বদলে এখানে ব্যবহার হয়েছে রং ও তুলি। আর তার পাতায় পাতায় লেখা হয়েছে একটি জনগোষ্ঠীর জীবনকথা।
আমাদের চাওয়া, গ্রামের প্রতিটি মাটির ঘর যেন একেকটি শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে। পাশাপাশি এই উদ্যোগে যুক্ত হোক স্থানীয় মানুষ, শিল্পী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। তাতে মাটির দেয়ালে আঁকা রঙিন ছবিগুলো ফিকে হয়ে গেলেও দর্শনার্থীদের মনে থেকে যাবে একটি জনগোষ্ঠীর জীবন ও যাপনের গল্প।
মতামত