এখন প্রকৃতিতে শরৎ চলছে। সকালে মৃদু শীত আর সবুজ ধানের পাতায় সাদা রুপালি শিশির। এ সময় ক্ষেতে পানি কমে যায়। আর পানিতে সহজেই মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড়, চিংড়ি ও ছোট জলজ প্রাণী, কেঁচো, ইঁদুর সহজেই পাওয়া যায়।
আশ্বিন-কার্তিক মাসের এই সময়ে বলাকা (বক) দল বেঁধে খুব সকাল থেকেই গ্রামবাংলার খাল-বিল, জলাভূমি, ধানখেত ও নদীর চরে আসে খাদ্য অন্বেষণে। বলাকার এই বিচরণ আবহমান বাংলার বিশেষ এক রূপ। বকের আনাগোনা বাড়ার এই সুযোগে শিকারিরা ভোরের আলো ফোটার আগেই জটিল ফাঁদ পেতে নিরীহ এই প্রাণীকে ধরে বিক্রি করছে। এতে হুমকির মুখে পড়ছে প্রকৃতির বন্ধু নিরীহ বলাকা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন প্রশাসন, সিভিল ও পুলিশ প্রশাসন এবং বার্ড ক্লাবের তৎপরতা বেড়েছে। লিফলেট, পোস্টার বিলি করা হয়েছে। তবে বন বিভাগের লোকসংকটের কারণে কার্যকারিতা কম।
জানা গেছে, প্রচলিত নানা কৌশলে বক ধরছে শিকারিরা। এখন বক ধরার সবচেয়ে প্রচলিত ফাঁদ হলো, আলো-আঁধারি সকালে ধানখেতে পাতার ঘর বানিয়ে ওই ঘরের মধ্যে শিকারি অবস্থান করে বক শিকার করছে। শেরপুরের সবুজ ধানখেতের অন্তত ৫০টি বিলে তিন শতাধিক মানুষ বক শিকারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষ করে সদর উপজেলার পাকুড়িয়া, ধলা, কামারিয়া, ভাতশালা, ইশরি বিল, কেউটা বিল, নকলার পেকুয়া বিল, বড়ডুবি পদ্মাবিল, কুর্শা বিলসহ অন্তত ৮টি বিল, শ্রীবরদীর শৈয়া বিল, বাবুয়া বিল, বড় বিলসহ অন্তত ৬টি বিল, নালিতাবাড়ীর সাপনই বিল, দুফথন বিল, চাংতলা বিল, খুশকি বিল, কলস বিল, ক’শা বিল, টেংরামারি বিলসহ অন্তত ১০টি বিল, ঝিনাইগাতী উপজেলার ধলী বিল, সোনাইকুড়া বিল, পলকা বিল, বান্ধা বিলসহ অন্তত পাঁচটি বিলে এই বক নিধন চলছে।
শেরপুর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, আশ্বিন-কার্তিক মাসে পানি কমতে শুরু করে। তখন মাছ, ব্যাঙ, জলজ পোকামাকড়সহ বকের খাবার সহজলভ্য হয়ে ওঠে। সহজলভ্য খাবার খেতে এসে ধানখেত ও জলাভূমিতে শিকারির ফাঁদে নিধন হচ্ছে বকপাখি। সূত্র আরও জানায়, পাতার ঘরে শিকারি অবস্থান করে তার একটি পালিত বককে লাঠির সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে পাতার তৈরি ঘরের ওপরে রেখে দেয়। বকের ঝাঁক দেখলেই লাঠির সঙ্গে বাঁধা বকটিকে নাড়াচাড়া করায়। এ সময় উড়ন্ত বকেরা সঙ্গী ভেবে পাতার ঘরের ওপর এসে বসে। এই সুযোগে স্থানীয় ভাষায় কপকপ করে বকের লম্বা পাগুলো ধরে ব্যাগের ভেতর ভরে ফেলে। রোদ উঠলে শিকারের পরিমাণ কমে গেলে ওই বকগুলোকে ধরে লোকালয়ে ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি করে। তবে কয়েক বছর ধরে বাজারে বিক্রি করার প্রবণতা কমেছে। কিন্তু গ্রামের বাজারে এখনো চালু আছে।
পরিবেশপ্রেমীদের মতে, বকের প্রাকৃতিক খাবারের স্থান সংকুচিত হচ্ছে। তার ওপর আবার নির্বিচারে বক নিধনে এই প্রাণীটি একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এতে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা, ধরা বা দখলে রাখার ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ ও শাস্তির বিধান রয়েছে। কোনো রকম দয়া প্রদর্শন না করে আইনের প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা জরুরি। জলাভূমি ও পাখির বিচরণস্থলে নিয়মিত নজরদারি করা দরকার।
ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে প্রাণবন্ত বক প্রকৃতিতে বিশেষ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। সকালে ঝাঁক বেঁধে খাদ্য অন্বেষণে যাওয়া ও সন্ধ্যামালতিতে বিশেষ শব্দ করে ঘরে ফেরার দৃশ্য বড়ই মনোরম। এর বিস্তার ঘটাতে শিকার নয়, বকের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ হিউম্যানিটি, ইন্টারাপ্টেড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (শাইন)-এর নির্বাহী পরিচালক মুগনিউর রহমান মনি বলেছেন, পাখির সঙ্গে এমন নির্মমতা বন্ধ করতে হবে। আগামী এক মাস বক শিকারিদের তৎপরতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এ সময় সবাইকে সিরিয়াস থাকতে হবে। তবে প্রশাসনে ম্যাজিস্ট্রেট কম, পুলিশও কম। তাই সময়মতো তাঁদের পাওয়া সম্ভব হয় না। নানা সীমাবদ্ধতায় বক শিকার বন্ধে কাজ কম হচ্ছে।
শেরপুর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা আল আমিন জানিয়েছেন, বক শিকারিরা তৎপর, সামনে তৎপরতা আরও বাড়বে। আমরা প্রতিদিন সাধ্যমতো অভিযান করছি। শিকার করা হয় বিলের মধ্যে, তার ওপর আবার সময়মতো সবাইকে পাওয়া যায় না। আর শিকারিরা ব্যাপক চালাক। শুধু প্রশাসন নয়, সবাই তৎপর হলে বক নিধন বন্ধ হবে।
বিডি-প্রতিদিন/এআইডি
মতামত