কবি কাজী কাদের নেওয়াজ রচিত ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা' কবিতাটি যাহারা পড়িয়াছেন, তাহাদের নিশ্চয়ই মনে রহিয়াছে বাদশাহ আলমগীরের সেই অমর উক্তি—‘আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির' । কবিতাটিতে মোগল সম্রাটের মহানুভবতার মধ্য দিয়া কবি যেই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন তাহা হইল, শিক্ষকের সম্মান রক্ষা করিবার দায়িত্ব কেবল শিক্ষার্থীর নহে, রাষ্ট্রেরও। কাজী কাদের নেওয়াজ ১৯৮৩ সালে ইহলোক ত্যাগ করিয়াছেন। তিনি যদি এখনো বাঁচিয়া থাকিতেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই প্রবলভাবে ব্যথিত হইতেন। দেখিতে পাইতেন, তাহার রচিত কবিতার বিপরীতে গিয়া কীভাবে সহস্রাধিক শিক্ষককে প্রতি পদে পদে অপদস্থ আর হেনস্তা করা হইয়াছে!
বলিবার অপেক্ষা রাখে না, যেই দেশে শিক্ষকের মাথা নত করিয়া দেওয়া হয়, সেই দেশের ভবিষ্যৎ কখনো উজ্জ্বল হইবার নহে । ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা, শারীরিকভাবে হেনস্তা করা, কর্মস্থল হইতে বিতাড়িত করা এবং বেতন-ভাতা বন্ধ করিয়া দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ উঠিয়াছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, মবের শিকার শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। অন্তত আট জনের মৃত্যুর এবং পাঁচ শতাধিক শিক্ষকের আহত কিংবা অসুস্থ হইবার তথ্যও প্রতিবেদনে আসিয়াছে ।
বহু শিক্ষক পুনর্বহালের নির্দেশ পাওয়া সত্ত্বেও কর্মস্থলে ফিরিতে পারেন নাই। ইহা কেবল কয়েক জন শিক্ষকের ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য নহে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও ভয়াবহ নিদর্শন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট করিয়াছে । চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে পদত্যাগের দাবিতে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ রাখিয়া বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়াছে। তাহার শারীরিক অসুস্থতার কথাও প্রকাশিত হইয়াছে। একই সময়ে বগুড়ায় বিদ্যালয়ে শাসন করিবার কারণে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শরীরচর্চার শিক্ষক রায়হান ইসলামকে গাছের ডাল দিয়া আঘাত করিবার অভিযোগ উঠিয়াছে । শিক্ষকের থুতনিতে আটটি সেলাই দিতে হইয়াছে । দুইটি ঘটনা ভিন্ন প্রকৃতির; কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠিতেছে, শিক্ষকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব পালন করিতেছে কে?
শিক্ষকেরও অন্যায় হইতে পারে। তাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অসদাচরণের অভিযোগও উঠিতে পারে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হইবে, অপরাধ প্রমাণিত হইলে আইনানুগ শাস্তিও হইবে; কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তি করিবার দায়িত্ব কোনো উত্তেজিত জনতার নহে। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ রহিয়াছে। মবের মাধ্যমে পদত্যাগ আদায়, হুমকি প্রদান কিংবা কাউকে কর্মস্থল হইতে বিতাড়িত করিবার ঘটনা আর কত দিন চলিবে? ইহাতে শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচারের শিক্ষা পায় না, পায় শক্তির দাপট দেখাইবার বিপজ্জনক পাঠ ।
সবচাইতে বেদনাদায়ক হইল, প্রশাসনিক নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বহু শিক্ষক তাহাদের কর্মস্থলে ফিরিতে পারিতেছেন না। পুনর্বহালের নির্দেশ কাগজে থাকিল, অথচ শিক্ষক বিদ্যালয়ের দরজায় দাঁড়াইয়া ফিরিয়া গেলেন, বেতন বন্ধ রহিল, পরিবার অনিশ্চয়তায় দিন কাটাইল—ইহা প্ৰশাসনিক ব্যর্থতারই পরিচয় । শিক্ষকের প্রতি অবিচারের প্রতিকার না হইলে প্রতিষ্ঠানের ভিতরে ন্যায়বিচারের শিক্ষা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হইবে? শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করিবার অর্থ তাহাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া নহে । বরং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সিদ্ধান্তের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা । অন্যায়ভাবে অপসারিত শিক্ষকদের পুনর্বহাল, বকেয়া বেতন প্রদান এবং হুমকির মুখে থাকা শিক্ষক ও তাহাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে হইবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিবার জন্য সরকার, প্রশাসন, শিক্ষকসমাজ ও অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগও জরুরি। কাজী কাদের নেওয়াজের কবিতায় শিক্ষকের পায়ের ধূলি ধুইয়া দেওয়ার দৃশ্যকল্পটি নিছক আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার প্রতীক নহে—ইহা জ্ঞানের প্রতি বিনয়, মানবিকতার প্রতি আনুগত্য এবং শিক্ষকের অবদানের স্বীকৃতি। সেই বিনয়কে বাস্তব জীবনে ফিরাইয়া আনিতে হইবে । শিক্ষকের সম্মান কোনো ব্যক্তির অনুগ্রহে টিকিয়া থাকে না, টিকিয়া থাকে সমাজের মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারে।
মতামত