সাহিত্যের দুই মহীরুহকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আমরা আসলে নিজেদের কোন সংকট আড়াল করি?
বাঙালি জাতির একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। যে মানুষটি তার চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করতে পারে, তাকে সে একসময় পূজার আসনে বসায়; তারপর তার নামে একটি সম্প্রদায় তৈরি করে, তার চারপাশে নিষেধের বেড়া তোলে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের সংকীর্ণতার পাহারাদার বানিয়ে ফেলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের সমাজে যে দ্বৈরথের কাহিনি প্রচলিত, তার মধ্যে এই মানসিকতার একটি প্রকট নমুনা দেখা যায়। দুই কবিকে আমরা পাশাপাশি বসিয়ে তাঁদের সাহিত্য পড়তে চাই না; বরং একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে নিজেদের পছন্দ, পক্ষপাত ও পরিচয়ের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে চাই।
প্রশ্ন হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল কি সত্যিই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন? তাঁদের মধ্যে কি এমন কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল, যার কারণে একজনের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা অন্যজনের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল? নাকি তাঁদের সম্পর্ককে ঘিরে যে বিরোধের গল্প আমরা শুনে আসছি, তার বড় অংশই পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যা, অতিরঞ্জন এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতির নির্মাণ?
প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আমাদের একটা বদভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। ইতিহাসকে নিজের পছন্দমতো সাজিয়ে নেওয়া ইতিহাসচর্চা নয়। যে তথ্য আমাদের বিশ্বাসকে সমর্থন করে, শুধু সেটুকু গ্রহণ করা এবং বিপরীত তথ্যকে উপেক্ষা করা আত্মপ্রবঞ্চনারই নামান্তর।
১. রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠা, নজরুলের আবির্ভাব
রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্যের আকাশে প্রতিষ্ঠিত, নজরুল তখনো তাঁর সাহিত্যিক জীবন নির্মাণের পথে। দুজনের বয়সের ব্যবধান প্রায় আটত্রিশ বছর। রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে, নজরুলের ১৮৯৯ সালে। একজনের সাহিত্যিক বিকাশ ঘটেছে উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণ, ব্রাহ্মসমাজের সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তৃত পরিসরে। অন্যজনের অভিজ্ঞতা গড়ে উঠেছে দারিদ্র্য, লোকসংস্কৃতি, লেটো দলের গান, সৈনিকজীবন এবং পরাধীন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে।
এই পার্থক্য তাঁদের সাহিত্যিক পরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষাকে এমন এক ব্যাপ্তি দিয়েছিলেন, যেখানে ব্যক্তিমানুষের প্রেম, প্রকৃতি, মৃত্যু, ঈশ্বর, সমাজ ও বিশ্বমানবতার প্রশ্ন পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে। নজরুল সেই ভাষার ভেতরে প্রবেশ করে তাকে নতুন উত্তাপ দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় এসেছে বিদ্রোহ, সাম্য, নিপীড়িত মানুষের অধিকার, ধর্মীয় অনুষঙ্গের সাহসী সংমিশ্রণ এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ।
নজরুলের আবির্ভাব তাই রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতির দাবি নিয়ে ঘটেনি। তিনি এসেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অভিজ্ঞতাকে আরও বিস্তৃত করতে। রবীন্দ্রনাথ যে ভাষাকে গভীরতা ও ব্যাপ্তি দিয়েছিলেন, নজরুল সেই ভাষারই আরেকটি সম্ভাবনা উন্মোচন করেছেন।
কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই উত্তরাধিকারকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে ভুল করি। কোনো নতুন লেখক পূর্বসূরির সাহিত্যিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেই ধরে নিই, তিনি পূর্বসূরির শত্রু। অথচ সাহিত্য কোনো রাজসিংহাসন নয়, যেখানে একজনের অভিষেক ঘটলে অন্যজনের নির্বাসন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
২. ‘বিদ্রোহী’: রবীন্দ্রবলয়ের বিরুদ্ধে ঘোষণা?
১৯২২ সালে ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্যে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, তার কারণ বোঝা কঠিন নয়। কবিতাটি শুধু নতুন ছন্দের পরীক্ষা ছিল না; এটি ছিল ব্যক্তিমানুষের শক্তি, আত্মমর্যাদা ও প্রতিবাদের এক অভূতপূর্ব ঘোষণা। নজরুলের ‘আমি’ কখনো সৃষ্টির, কখনো ধ্বংসের; কখনো প্রেমের, কখনো প্রতিরোধের। তার মধ্যে পুরাণের দেবতা যেমন আছে, তেমনি আছে অত্যাচারিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
এই ‘আমি’ রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতার আত্মসন্ধানী কিংবা বিশ্বসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত ‘আমি’র সঙ্গে এক নয়। কিন্তু অমিল থাকলেই বিরোধের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে কেন?
রবীন্দ্রনাথের কবিতায়ও বিদ্রোহ আছে, প্রতিবাদ আছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান আছে। তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধ, জাতীয়তাবাদবিষয়ক চিন্তা এবং জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নাইটহুড বর্জনের ঘটনা তাঁর অবস্থানের সাক্ষ্য বহন করে। অন্যদিকে নজরুলের কবিতায় কেবল বিদ্রোহের আগুন নেই; আছে প্রেম, বিরহ, ভক্তি, সৌন্দর্য এবং মানুষের অন্তর্গত কোমলতার প্রকাশ।
দুই কবির মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু সেই পার্থক্যকে এমনভাবে সাজানো যায় না যে একজন কেবল শান্তির, অন্যজন কেবল বিদ্রোহের কবি। সাহিত্যকে এভাবে খণ্ডিত করা আসলে সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে।
‘বিদ্রোহী’ রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে লেখা হয়েছিল- এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট প্রমাণ দরকার। শুধু এই যুক্তি যথেষ্ট নয় যে নজরুল রবীন্দ্রপ্রভাবিত সাহিত্যিক পরিবেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর কবিতা সেই পরিবেশে আলোড়ন তুলেছিল। নতুন কবিতার আবির্ভাব প্রতিষ্ঠিত রুচিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে; কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিই ছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত স্বতঃসিদ্ধ নয়।
৩. রবীন্দ্রনাথের আচরণ কী বলে?
ব্যক্তিগত শত্রুতার অভিযোগ যাচাই করতে হলে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কের কিছু প্রামাণ্য ঘটনার দিকে তাকানো দরকার।
রবীন্দ্রনাথ নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করার ঘটনাও তাঁদের সম্পর্কের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাবন্দি নজরুল অনশন শুরু করলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনশন ভাঙার আবেদন জানিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই ঘটনাগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করে কীভাবে বলা যায় যে রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতিভা সহ্য করতে পারতেন না? অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তাহলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কোথায়?
অবশ্যই, একজন কবির শুভেচ্ছা বা উৎসর্গ দিয়ে তাঁর মনের সমস্ত ভাবনা জানা সম্ভব নয়। মানুষ জটিল; সাহিত্যিক সম্পর্কও জটিল। কিন্তু ইতিহাসের বিচার করতে হলে আমাদের হাতে যে প্রমাণ রয়েছে, তার গুরুত্ব স্বীকার করতে হবে। প্রমাণের বিপরীতে নিছক অনুমানকে বসিয়ে দিলেই ইতিহাস তৈরি হয় না।
এখানে আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বলে নজরুলের সাহিত্যিক মূল্য রবীন্দ্রনাথের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায় না। নজরুলের প্রতিভা তাঁর নিজের। রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, কিন্তু সেই স্বীকৃতি নজরুলের সৃজনশীলতার চূড়ান্ত বিচারক নয়।
৪. নজরুল কি রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেছিলেন?
নজরুলের সাহিত্যিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাঁকে রবীন্দ্রনাথের বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা প্রায়ই দেখা যায়। যেন নজরুলের মৌলিকতা প্রমাণ করতে হলে রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যাখ্যান করা আবশ্যক। এই ধারণা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও অপরিণত।
নজরুল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করার ঘটনা এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কিন্তু শ্রদ্ধা করা মানে অনুসারী হয়ে থাকা নয়। একজন প্রকৃত লেখক পূর্বসূরির কাছ থেকে গ্রহণ করেন, তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন, কখনো তাঁর প্রভাব অতিক্রম করেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভাষা নির্মাণ করেন।
নজরুলের নিজস্বতা তাঁর শব্দচয়ন, ছন্দ, আরবি-ফারসি শব্দসম্পদের সৃজনশীল ব্যবহার, হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক উপাদানের সমন্বয় এবং নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্যে। তাঁর কবিতা ও গানে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা তাঁকে রবীন্দ্রনাথের অনুকরণকারী হিসেবে চিহ্নিত করার সব প্রচেষ্টাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আবার রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক মহিমা অস্বীকার করেও নজরুলের মহত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কারণ, সাহিত্যিক মূল্য কোনো শূন্য-সমষ্টির খেলা নয়। একজনের প্রাপ্তি অন্যজনের ক্ষতি হিসেবে গণ্য হয় না।
আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যকে প্রায়ই শত্রুতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করি। অথচ মৌলিকতা মানে পূর্বসূরিকে ঘৃণা করা নয়; মৌলিকতা মানে নিজের অভিজ্ঞতার সত্যকে এমন ভাষায় প্রকাশ করা, যা আগে ওইভাবে প্রকাশিত হয়নি।
৫. দ্বন্দ্ব ছিল কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সাহিত্যিক পরিবেশের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে ঘিরে সমকালীন সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে মতবিরোধ ছিল। নজরুলের কাব্যভাষা, ছন্দের ব্যবহার, রাজনৈতিক উচ্চারণ এবং ধর্মীয় অনুষঙ্গের সম্মিলন প্রতিষ্ঠিত রুচির একটি অংশকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। সাহিত্যিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহও সেই সময়ের সাহিত্যজগতে ছিল।
‘বিদ্রোহী’র মৌলিকতা নিয়ে বিতর্কও উঠেছিল। মোহিতলাল মজুমদারের ‘আমি’ রচনার সঙ্গে কবিতাটির ভাবগত সম্পর্ক নিয়ে যে অভিযোগের কথা আলোচিত হয়েছে, সেটিকে সাহিত্যিক ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিচার করা যায়। কিন্তু কোনো অভিযোগ প্রচলিত আছে বলেই তা প্রমাণিত সত্য হয়ে যায় না। সাহিত্যিক প্রভাব, ভাবগত সাদৃশ্য এবং চৌর্যবৃত্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নির্দিষ্ট পাঠ ও প্রমাণ ছাড়া একটিকে অন্যটির সমার্থক করা অনুচিত।
এখানে লক্ষণীয়, সাহিত্যিক বিরোধের ইতিহাস আর দুই কবির ব্যক্তিগত শত্রুতার ইতিহাস এক জিনিস নয়। একজন লেখকের বিরুদ্ধে অন্য লেখকের সমর্থকেরা আক্রমণাত্মক হতে পারেন; একটি পত্রিকা অন্য একটি সাহিত্যিক প্রবণতার সমালোচনা করতে পারে; নতুন কবির আবির্ভাব পুরোনো রুচির সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করতে পারে। এসবের কোনোটিই নিজে থেকে প্রমাণ করে না যে সংশ্লিষ্ট দুই কবি ব্যক্তিগতভাবে পরস্পরের শত্রু ছিলেন।
সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই সমকালীন বিরোধের সমস্ত দায় দুই প্রধান কবির ওপর চাপিয়ে দিই। তাঁদের নাম ব্যবহার করে এমন একটি দ্বন্দ্ব নির্মাণ করি, যার অনেক উপাদান আসলে তাঁদের চারপাশের সাহিত্যিক সমাজ, সমালোচক এবং পাঠকগোষ্ঠীর আচরণ থেকে এসেছে।
৬. ধর্মীয় পরিচয়ের ফাঁদ
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের দ্বৈরথের আলোচনা যখন ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়, তখন বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু পরিবারের সন্তান, নজরুল মুসলমান পরিবারের সন্তান—এই পরিচয়কে কেন্দ্র করে তাঁদের সাহিত্যিক অবস্থানকে দুই বিপরীত মেরুতে স্থাপন করা হয়। যেন একজনকে গ্রহণ করতে হলে অন্যজনকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
এটি শুধু ঐতিহাসিক ভুল নয়; বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের জন্যও বিপজ্জনক।
নজরুলের কবিতায় ইসলামী ঐতিহ্য যেমন প্রবলভাবে উপস্থিত, তেমনি রয়েছে হিন্দু পুরাণ, শাক্ত সাধনা এবং বৈষ্ণব ভাবধারার উপাদান। তাঁর শ্যামাসংগীত, গজল, ইসলামী গান ও প্রেমের গান একই সৃষ্টিশীল সত্তার বিভিন্ন প্রকাশ। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যও কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়। তাঁর মানবতাবাদ, ধর্মচিন্তা এবং সমাজভাবনায় মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এই দুই কবিকে ধর্মীয় প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড় করানো মানে তাঁদের সাহিত্যকে নিজেদের সাম্প্রদায়িক হিসাবের অধীন করা। যে নজরুল ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদ এবং শোষণের বিরুদ্ধে বারবার উচ্চারণ করেছেন, তাঁকে একটি সংকীর্ণ পরিচয়ের প্রতিনিধি বানানো তাঁর সাহিত্যিক আদর্শের সঙ্গেই অসংগত। একইভাবে রবীন্দ্রনাথকে কেবল একটি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক প্রতীক বানানোও তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার ব্যাপ্তিকে অস্বীকার করে।
একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা বোঝা যায় সে তার শ্রেষ্ঠ মানুষদের কতখানি স্বাধীনভাবে গ্রহণ করতে পারে, তা দিয়ে। যদি একজনকে ভালোবাসার জন্য অন্যজনকে ঘৃণা করতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে, আমাদের ভালোবাসার মধ্যে এখনো স্বাধীনতা জন্ম নেয়নি।
৭. আমরা কেন দ্বৈরথের গল্প ভালোবাসি?
মানুষের কাছে দ্বন্দ্বের গল্প আকর্ষণীয়। দুই মহান ব্যক্তিকে মুখোমুখি দাঁড় করালে ইতিহাস সহজ হয়ে যায়। কে কার পক্ষে, কে কার বিপক্ষে, কে বিজয়ী, কে পরাজিত- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা জটিল বাস্তবতার বদলে একটি সরল নাটক পেয়ে যাই।
কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস কোনো কুস্তির মঞ্চ নয়। এখানে বিজয়ীর মুকুট পরিয়ে দিলেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।
রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অভিজাত্যবোধ তৈরি হতে পারে; আবার নজরুলকে ঘিরেও এমন আবেগ তৈরি হতে পারে, যা তাঁকে শুধু বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে দেখতে চায়। উভয় ক্ষেত্রেই কবির প্রকৃত সাহিত্যিক সত্তা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একজনকে আকাশে তুলে অন্যজনকে মাটিতে নামিয়ে দেওয়ার মধ্যে যে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা সাহিত্যবোধের লক্ষণ নয়।
আমরা যদি সত্যিই রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে চাই, তাহলে তাঁর জটিলতা, সংশয়, দ্বন্দ্ব এবং চিন্তার বিবর্তনকে বুঝতে হবে। নজরুলকে বুঝতে চাইলে তাঁর বিদ্রোহের পাশাপাশি প্রেম, ভক্তি, মানবিক দুর্বলতা এবং সৃষ্টিশীল বৈচিত্র্যকেও বুঝতে হবে। তাঁদের দুজনকেই সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমাদের নিজেদের পক্ষপাতের মুখোমুখি দাঁড়ানো জরুরি।
রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে সাহিত্যিক পার্থক্য ছিল- এ কথা সত্য। তাঁদের ঘিরে সমকালীন সাহিত্যিক বিরোধ ও সমালোচনাও ছিল- এ কথাও সত্য। কিন্তু এই তথ্যগুলো থেকে তাঁদের ব্যক্তিগত শত্রুতা, ঈর্ষা কিংবা পরস্পরকে খাটো করার সুসংহত প্রচেষ্টার সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
বরং রবীন্দ্রনাথের শুভেচ্ছা, ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য উৎসর্গ এবং কারাবন্দি নজরুলের অনশন ভাঙানোর আবেদন তাঁদের সম্পর্কের অন্য একটি দিক তুলে ধরে। নজরুলের ‘সঞ্চিতা’ রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করার ঘটনাও পারস্পরিক শ্রদ্ধার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করে তাঁদের মধ্যে কখনো কোনো মতপার্থক্য ছিল না- এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া উচিত নয়। ঐতিহাসিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে যেমন শত্রুতার অভিযোগের প্রমাণ চাই, তেমনি সম্পর্কের প্রতিটি মুহূর্তকে সম্পূর্ণ বিরোধহীন ঘোষণা করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।
আমাদের দরকার পক্ষপাতহীন পাঠ, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং সাহিত্যিক বিচারবোধ। ইতিহাসকে নিজের আবেগের অনুগত করে তোলার বদলে আবেগকে ইতিহাসের তথ্যের সামনে দাঁড় করানোই দায়িত্বশীল পাঠকের কাজ।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যকে যে গভীরতা দিয়েছেন, নজরুল তাকে দিয়েছেন নতুন উত্তাপ। একজনের সৃষ্টিতে মানুষ নিজের অন্তর্জগতের বিস্তার খুঁজে পায়, অন্যজনের সৃষ্টিতে খুঁজে পায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। এই দুই অভিজ্ঞতা পরস্পরকে বাতিল করে না; বরং বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক সম্পদকে সমৃদ্ধ করে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি রবীন্দ্রনাথ বড়, না নজরুল বড়- এটি নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা তাঁদের সাহিত্য থেকে কতটা বড় হতে পেরেছি।
যে জাতি তার শ্রেষ্ঠ কবিদেরও ধর্ম, গোষ্ঠী, মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দের খাঁচায় বন্দি করে, সে জাতি নিজের সাংস্কৃতিক সম্ভাবনাকেই সীমাবদ্ধ করে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর আগে তাই আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা দরকার- আমরা কি সত্যিই তাঁদের সাহিত্য পড়েছি, নাকি তাঁদের নাম ব্যবহার করে নিজেদের পূর্বনির্ধারিত বিশ্বাসকেই বারবার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই: দুই কবির মধ্যে যে পার্থক্য ছিল, তাকে বোঝার জন্য তাঁদের শত্রু বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং তাঁদের স্বাতন্ত্র্যকে স্বীকার করার মধ্য দিয়েই আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত ঐশ্বর্য উপলব্ধি করতে পারি।
রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসতে নজরুলকে অস্বীকার করতে হয় না; নজরুলকে ভালোবাসতে রবীন্দ্রনাথকে ছোট করতে হয় না। যেদিন বাঙালি এই সহজ সত্যটি উপলব্ধি করবে, সেদিন হয়তো দুই কবির দ্বৈরথের কৃত্রিম কোলাহল পেরিয়ে তাদের সাহিত্যিক মহিমার নীরব অথচ গভীর জগতে প্রবেশ করতে পারবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
মতামত