ঢাকা    মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

ঢাকায় বাধা, রাউজানে সম্প্রীতি: রোটনকে শেষ বিদায়



ঢাকায় বাধা, রাউজানে সম্প্রীতি: রোটনকে শেষ বিদায়
ঢাকায় বাধা, রাউজানে সম্প্রীতি: রোটনকে শেষ বিদায়

রাজধানী ঢাকায় জানাজা করতে না পারা ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন শেষ পর্যন্ত নিজ জন্মভূমি চট্টগ্রামের রাউজানে পেলেন শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বিদায়।

দল-মতের ভিন্নতা ভুলে তার জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ১০ অক্টোবর, কলকাতার একটি হাসপাতালে মারা যান। পরদিন তার মরদেহ ভারতের পেট্রাপোল হয়ে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

বেনাপোল সীমান্তে তখন পুলিশ, বিজিবি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মরদেহ দেশে আনার পুরো প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা।

পরিকল্পনা ছিল, ঢাকায় একটি জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে রোটনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানে। রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে বাদ আসর জানাজার আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু সাইন্সল্যাব মোড়ে পুলিশ মরদেহবাহী গাড়িটি ধানমন্ডির দিকে যেতে বাধা দেয়। মসজিদ এলাকায় জানাজায় অংশ নিতে জড়ো হওয়া কয়েকজনের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে; পুলিশ চারজনকে আটক করে। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আর জানাজা হয়নি এবং মরদেহ নিয়ে যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রামের পথে।

রোববার দিবাগত রাত প্রায় দুইটার দিকে মরদেহবাহী গাড়ি রাউজান পৌরসভার গহিরায় বক্স আলী চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছায়। সেখানে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও মরদেহ গ্রহণ করেন। পরদিন সোমবার সকাল ১১টায় বাড়ির উঠানে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা।

জানাজা ও দাফন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তার নির্দেশনায় স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এলাকায় অবস্থান নিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাউজান থানার তথ্য অনুযায়ী, তিন প্লাটুন পুলিশ ও এক প্লাটুন আনসার সদস্য সেখানে মোতায়েন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

রোটনের বড় ভাই নাসিমুল হায়দার চৌধুরী মিল্টন জানাজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি উপস্থিত সবার কাছে ভাইয়ের জন্য দোয়া চান এবং তার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল একই বাড়ির বাসিন্দা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা জুয়েল চৌধুরীর বক্তব্য। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে প্রতিবেশী ও একই বাড়ির মানুষ হিসেবে রোটনের শেষ বিদায়কে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

জুয়েল চৌধুরীর বলেন, রোটন তাদের গ্রামের, তাদের বাড়ির মানুষ; জানাজায় যার যে রাজনৈতিক পরিচয়ই থাকুক না কেন, এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে মৃত ব্যক্তির অসম্মান হয়।

একদিকে জানাজায় ছিলেন রোটনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ও ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা; অন্যদিকে ছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। ছিলেন স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং সাধারণ মানুষও। রাজনৈতিক বিভাজনের বদলে সেখানে বড় হয়ে উঠেছিল একজন মৃত মানুষকে শেষ বিদায় জানানোর সামাজিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।

জানাজায় ইমামতি করেন রোটনের স্বজন মাওলানা মঈনুল হায়দার চৌধুরী। পরে বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

শেষ পর্যন্ত কোনো স্লোগান নয়, কোনো সংঘাত নয়; দোয়া, ক্ষমা আর মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের শেষযাত্রা।

২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নও চেয়েছিলেন তিনি। ২০২১ সালে দলের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হন

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


ঢাকায় বাধা, রাউজানে সম্প্রীতি: রোটনকে শেষ বিদায়

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রাজধানী ঢাকায় জানাজা করতে না পারা ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন শেষ পর্যন্ত নিজ জন্মভূমি চট্টগ্রামের রাউজানে পেলেন শান্তিপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বিদায়।

দল-মতের ভিন্নতা ভুলে তার জানাজায় অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন ১০ অক্টোবর, কলকাতার একটি হাসপাতালে মারা যান। পরদিন তার মরদেহ ভারতের পেট্রাপোল হয়ে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়। ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

বেনাপোল সীমান্তে তখন পুলিশ, বিজিবি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মরদেহ দেশে আনার পুরো প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা।

পরিকল্পনা ছিল, ঢাকায় একটি জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে রোটনের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাউজানে। রাজধানীর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে বাদ আসর জানাজার আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু সাইন্সল্যাব মোড়ে পুলিশ মরদেহবাহী গাড়িটি ধানমন্ডির দিকে যেতে বাধা দেয়। মসজিদ এলাকায় জানাজায় অংশ নিতে জড়ো হওয়া কয়েকজনের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে; পুলিশ চারজনকে আটক করে। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আর জানাজা হয়নি এবং মরদেহ নিয়ে যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রামের পথে।

রোববার দিবাগত রাত প্রায় দুইটার দিকে মরদেহবাহী গাড়ি রাউজান পৌরসভার গহিরায় বক্স আলী চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছায়। সেখানে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও মরদেহ গ্রহণ করেন। পরদিন সোমবার সকাল ১১টায় বাড়ির উঠানে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা।

জানাজা ও দাফন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। তার নির্দেশনায় স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এলাকায় অবস্থান নিয়ে শৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা করেন।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাউজান থানার তথ্য অনুযায়ী, তিন প্লাটুন পুলিশ ও এক প্লাটুন আনসার সদস্য সেখানে মোতায়েন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

রোটনের বড় ভাই নাসিমুল হায়দার চৌধুরী মিল্টন জানাজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি উপস্থিত সবার কাছে ভাইয়ের জন্য দোয়া চান এবং তার কোনো ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল একই বাড়ির বাসিন্দা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা জুয়েল চৌধুরীর বক্তব্য। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে প্রতিবেশী ও একই বাড়ির মানুষ হিসেবে রোটনের শেষ বিদায়কে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

জুয়েল চৌধুরীর বলেন, রোটন তাদের গ্রামের, তাদের বাড়ির মানুষ; জানাজায় যার যে রাজনৈতিক পরিচয়ই থাকুক না কেন, এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে মৃত ব্যক্তির অসম্মান হয়।

একদিকে জানাজায় ছিলেন রোটনের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ও ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা; অন্যদিকে ছিলেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। ছিলেন স্থানীয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং সাধারণ মানুষও। রাজনৈতিক বিভাজনের বদলে সেখানে বড় হয়ে উঠেছিল একজন মৃত মানুষকে শেষ বিদায় জানানোর সামাজিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে জানাজা শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়।

জানাজায় ইমামতি করেন রোটনের স্বজন মাওলানা মঈনুল হায়দার চৌধুরী। পরে বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

শেষ পর্যন্ত কোনো স্লোগান নয়, কোনো সংঘাত নয়; দোয়া, ক্ষমা আর মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই শেষ হয়েছে মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের শেষযাত্রা।

২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ রাউজান আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নও চেয়েছিলেন তিনি। ২০২১ সালে দলের শ্রম ও জনশক্তিবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হন


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত