ঢাকা    রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন আর পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ



প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন আর পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ
প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন আর পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ

মার্টিন লুথার কিং ১৯৬৩ সালে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথ ততটা সহজ ছিল না, এটা সবারই জানা। আমেরিকার সমাজে অহিংসার নীতি প্রতিষ্ঠার সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এখনো বহন করে চলেছে দেশটির জনগোষ্ঠী। মার্টিন লুথার কিং আমেরিকার মানুষের কাছে সব সময়ই একজন স্বপ্নবান মানুষ। তাঁর স্বপ্ন নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই বলেই আমেরিকা বিশ্বে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আসলে মানুষের জীবনে যখন স্বপ্ন থাকে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনাও থাকে, যা প্রকাশ পায় জীবনের পথচলায়।

হয়তো মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই স্বপ্নের মতো বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন নির্বাসিত জীবনে। আর সেই স্বপ্ন কেবল স্বপ্ন ছিল না বলেই নতুন বাংলাদেশের মাটিকে ছুঁয়ে নিজের নির্বাসিত জীবনের যন্ত্রণা দূর করতে চেয়েছেন ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে। তাঁর ফিরে আসার গল্প দেশের মানুষের কারও অজানা নয়। আর তাঁর ভাষণের প্রিয় অংশ ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ কথাটি মুহূর্তেই সারা দেশকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই একই ভাষণে বিএনপির ৩১ দফাকে সামনে রেখে আবার বলেন, ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান। উই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি।’ ‘আমি’ শব্দটিকে জাদুর মতো ‘আমরা’তে পরিণত করার মতো দূরদর্শিতা সেদিন তারেক জিয়া দেখাতে পেরেছেন বলেই মানুষ আবার নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে তাঁর হাত ধরে। যার প্রমাণ দিয়েছে মানুষ ভোটের মাধ্যমে।

দেশে ফিরে আসার পর থেকে আজ অবধি ব্যক্তিজীবনের পরিমিত চালচলন তারেক জিয়াকে আমজনতার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত করতে পেরেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জনগণের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনেকটাই কাছের মানুষ বলে মনে হয়। কারণ, তিনি নিজের নিরাপত্তার আগে ভাবেন জনগণের ভোগান্তির কথা। আর সে কারণে সাধারণ মানুষের মতোই রাস্তায় চলাচল করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কল্পনাতীত। নিজের টাকায় গাড়ির জ্বালানি খরচ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আপ্যায়ন ব্যয় সংকুচিত করেছেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন সাধারণ মানুষের মতো হওয়ার কথা নয়। তবে তারেক জিয়া সেটা করেছেন। তার ছবির ব্যবহার কিংবা নামের আগে ‘মাননীয়’ শব্দের অযাচিত প্রয়োগ করতে নিষেধ করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।

ব্যক্তি তারেক জিয়া এখন অবধি দেশের কাজের পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানকে প্রাধান্য দিয়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন একজন স্বামী ও পিতা হিসেবে। এর পাশাপাশি যে কাজটি তিনি করেন, তা হলো প্রায়ই বাবা-মা ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন। সব মিলিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া সময়ের সঙ্গে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, এটা সত্যিকার অর্থেই সাধুবাদের যোগ্য। হয়তো নির্বাসিত জীবনে তিনি জীবনের সঠিক মূল্যবোধ দিয়ে নিজেকে আত্মস্থ করতে পেরেছেন। তাঁর এই মূল্যবোধ দেখে মনে হতেই পারে, নিশ্চয়ই কোনো জাদুবলে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে এত সহজে সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তি তারেক জিয়ার সাধারণ জীবনবোধ দেশ পরিচালনায় বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কি না। কারণ, একজন প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে সারা দেশের দায়ভার। সাধারণ মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার দিকে লক্ষ রেখে তাঁকে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সে ধারাবাহিকতায় দেশ মূল্যায়ন করবে তারেক জিয়ার সেই কথাকে, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’।

জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে। ১৭ বছর পর আবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার হাত ধরে। যদিও পারিবারিকভাবে তারেক জিয়া তাঁর বাবা-মা দুজনকেই দেশ চালাতে দেখেছেন, কিন্তু নিজের প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে দেশ পরিচালনায় তিনি অনেকটাই নবীন। আর বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে খুব মসৃণভাবে, তা কিন্তু নয়। তাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। দেশের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা তথৈবচ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যা দেশজুড়ে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সরকারকে সংকটে ফেলতে চাইছে বিরোধী দল।

দেশের প্রতিটি খাত সঠিক পথে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া ও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার মতো মানসিকতা থাকতে হবে বিএনপির মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদ সদস্যদের। পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের সার্বিক ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত বিএনপি সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। নিজেদের ৩১ দফার অন্যতম দফা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তারা। তবে এসব বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত ঋণ নেওয়াটা দেশের জন্য সুখকর বিষয় নয়। আর্থিক খাতের সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো ব্যাংকের অর্থসংকট। এ ক্ষেত্রে যদি পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে না পারে, তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে কতটা পারবে, তা সরকারকে ভাবতে হবে।

এর পাশাপাশি যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশের পুলিশিং ব্যবস্থা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে বিগত সরকারের প্রতি তাদের অনুগত আচরণের কারণে। আওয়ামী লীগ সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি সরকারে পরিণত করার পেছনে দেশের প্রশাসন ও পুলিশ অনেক বেশি ভূমিকা পালন করেছে। তারা এ কাজ করেছে নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করে সম্পদের পাহাড় গড়তে। তাই তারেক জিয়ার যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা উচিত, তা হলো রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা সরকার যেন কোনোভাবেই প্রশাসন ও পুলিশের মাধ্যমে প্রভাবিত না হয়। রাজনৈতিক পরিচয়ে লোক নিয়োগ কিংবা চাকরিতে পদোন্নতি দেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা উচিত। কারণ, বর্তমান বাংলাদেশে সবাই এখন বিএনপির নেতা, কর্মী বা সমর্থক। যেমনটা ছিল আওয়ামী লীগের সময়। দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ অনেক ব্যক্তিই রাতারাতি চরিত্র বদল করে বিএনপি সরকারের ছায়াতলে ইতিমধ্যে নিজেদের অবস্থান নিয়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি সব সময়ই দুর্নীতিবাজ, এ কথাটা অকাট্য সত্য। আর এ ধরনের ব্যক্তিরা রাজনৈতিক চরিত্র বদল করেন নিজের স্বার্থে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, দেশটা অনিরাপদ ও দুর্নীতিতে পরিবেষ্টিত। তাই দেশের মানুষের সর্বোচ্চ ম্যান্ডেট নিয়ে আসা বিএনপি সরকারের সবার আগে যে কাজটি করা দরকার ছিল, তা এখন অবধি হয়নি। তা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। পুলিশের নৈতিক অবক্ষয় আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকে কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা অবান্তর। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরও বেশি সচেতন হতে হবে। তাঁর শাসন পরিচালনা দেখে মনে হয়, তিনি অনেকটাই জিয়াউর রহমানের চিন্তাধারাকে অনুসরণ করছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে, সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময়ে ঘুষ-দুর্নীতি শব্দগুলো মানুষ শোনেনি। কিন্তু বর্তমানে ঘুষ ছাড়া মানুষ কোনো কাজ করতে পারে না। দেশটাকে ভালো করতে হলে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার পরিবর্তন প্রয়োজন। আর সেই কাজটি যদি তারেক জিয়া তাঁর সরকার ও দল থেকে শুরু করতে পারতেন, তাহলে হয়তো অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত।

বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সরকারের সাত-আট মাস পার হওয়ার আগেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু তারা জনগণের কথা বলে না। তারা দেশকে এগিয়ে নিতে চায় ১৯৭১ সালকে অস্বীকার করে। যা খুবই হাস্যকর। স্বাধীনতাবিরোধীরা আজ দেশের বিরোধী দল, এটা বাংলাদেশের জন্য সুখকর বিষয় নয়। তাদের সঙ্গে এনসিপি যোগ দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে উপেক্ষা করতে চায় নতুন বন্দোবস্তের নামে। এদের হাত থেকে সংবিধান রক্ষার গুরুদায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার সরকারের।

বিরোধী দল মনে করে, কথায় কথায় আন্দোলন হয়। আন্দোলনের বিষয়টি খুব সহজ নয়। দেশের জনগণ কখন, কেন পথে নামে, তা অতীত থেকে বুঝতে হবে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই। দেশের মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও হাম নিয়ে যে সংকটে আছে, তা সরকারকে দ্রুত সামাল দিতে হবে। বিগত সরকারের দোহাই দিয়ে পরিস্থিতি বেশিদিন সামাল দিতে পারবে না বিএনপি সরকার। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। জনতার কাতারে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি মন্ত্রীদেরও আসতে হবে। তা না হলে একক ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সরকার আবারও মানুষ দেখতে পাবে আগামীতে, যা দেশের জনগণ আর দেখতে চায় না।

এমনিতেই বাংলাদেশের রাজনীতির বড় দুটি দলই পরিবার-কেন্দ্রিক। তাই তারেক জিয়া যদি আগামীর বাংলাদেশকে নতুনভাবে সাজাতে চান, তাহলে দলে নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য কাজ করতে হবে। সুযোগ দিতে হবে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের।

সারা বিশ্ব এখন জেন-জি প্রজন্মের চিন্তাচেতনার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে বেশ বেগ পাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও এর বাইরে নয়। বরং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণে জেন-জিদের ভূমিকা এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এই জেন-জিদের ভাবনার বাংলাদেশকে তারা বিপথে পরিচালিত করেছে বলে আজ তাদের নতুন দল এনসিপি গঠন করে জোট করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে। একজন শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ নয়। তারা মনে করে, মুক্তিযুদ্ধ মানেই আওয়ামী লীগ। এ ভুল ধারণাটি যে অমূলক, তা বোঝাতে হবে তারেক জিয়ার সরকারকে। তা না হলে আগামীর বাংলাদেশ ভুলে যাবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ইতিহাসকে।

বিএনপি বরাবরই ক্ষমতায় আসে দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে। তারেক জিয়ার নিজের পরিকল্পনার প্রতিফলন কতটা কষ্টসাধ্য হবে, তা বোঝা যায় চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা পরিস্থিতিতে। তিনি যেদিন নিজের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছিলেন, তা বাস্তব রূপ দেওয়ার সুযোগ হয়েছে ইউনূস সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন জুলাই সনদ কিংবা আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে ভাবে না। তারা চায় প্রাত্যহিক জীবনের নিশ্চয়তা এবং মৌলিক অধিকার ও চাহিদার পূরণ। জনগণের মনের ভাবনা ধারণ করতে পারলে বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক জিয়ার অর্ধেক স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত-আট মাস পার করেছে। এর মধ্যে তারেক জিয়া কতটা তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন, তা বিচার করার সময় এখনো আসেনি। তবে তারেক জিয়া নিজেকে যতটা সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, ততটা মন্ত্রিপরিষদে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তারা প্রথাগতভাবেই কাজ করছে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো মন্ত্রিপরিষদ ও উপদেষ্টাদের অবস্থান। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আর উপদেষ্টারা পদাধিকারের কারণে মন্ত্রীদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। যার প্রমাণ অতীত থেকে নেওয়া দরকার বিএনপি সরকারের। কারণ, লোকচক্ষুর অন্তরালে মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় পরিচয়ে তদবির, বদলি ও এলাকায় নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকেন। আসলে তারেক জিয়া দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে থেকে দল ও দেশকে দেখেছেন। সে কারণে সরকার পরিচালনায় তাঁকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

এর পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রাখবেন, তার প্রমাণ এখনো সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। যদিও নানা ধরনের আদেশ পালন করছে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে বিমান ক্রয় করে। হয়তো তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবেন বলে আশা করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া সফর ঘিরে বেশ আলোচনা হয়েছে। ওই সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তারেক জিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রকাশ করেছেন ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গানটির মাধ্যমে।

মালয়েশিয়া সফরে তারেক জিয়ার চিন্তাভাবনা অত্যন্ত সুচিন্তিত ছিল। আর তারই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের অধিবেশনে তারেক জিয়া বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার আন্তর্জাতিক সমাধান করা তারেক জিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, রোহিঙ্গাদের সামাল দেওয়া বর্তমান বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বৈরিতা কমিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। সারা বিশ্বে এখন ইরাক যুদ্ধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে তারেক জিয়াকে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তা না হলে সরকারের পক্ষে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও বাণিজ্য বৃদ্ধি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষা, বিচার, আইনশৃঙ্খলা ও বেকারত্বের সমস্যা সীমাহীন পর্যায়ে চলে গেছে। বিগত সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু মানব উন্নয়ন হয়নি বলে মানুষের মানবিকতা হারিয়ে গেছে। তাই তারেক জিয়ার সরকারকে ইট-পাথরের ঝকঝকে দেশ তৈরি করার চেয়ে মানবসম্পদকে শতভাগ সফল করতে হবে। আর এ কাজটি হলেই তারেক জিয়ার ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ দৃশ্যমান হবে নতুন বাংলাদেশে।

একটি কথা বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, স্বপ্ন ও পরিকল্পনা সবাই করে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা ততটা সহজ নয়।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬


প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন আর পরিকল্পনার প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ

প্রকাশের তারিখ : ১১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মার্টিন লুথার কিং ১৯৬৩ সালে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথ ততটা সহজ ছিল না, এটা সবারই জানা। আমেরিকার সমাজে অহিংসার নীতি প্রতিষ্ঠার সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা এখনো বহন করে চলেছে দেশটির জনগোষ্ঠী। মার্টিন লুথার কিং আমেরিকার মানুষের কাছে সব সময়ই একজন স্বপ্নবান মানুষ। তাঁর স্বপ্ন নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই বলেই আমেরিকা বিশ্বে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। আসলে মানুষের জীবনে যখন স্বপ্ন থাকে, তখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনাও থাকে, যা প্রকাশ পায় জীবনের পথচলায়।

হয়তো মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই স্বপ্নের মতো বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন নির্বাসিত জীবনে। আর সেই স্বপ্ন কেবল স্বপ্ন ছিল না বলেই নতুন বাংলাদেশের মাটিকে ছুঁয়ে নিজের নির্বাসিত জীবনের যন্ত্রণা দূর করতে চেয়েছেন ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে। তাঁর ফিরে আসার গল্প দেশের মানুষের কারও অজানা নয়। আর তাঁর ভাষণের প্রিয় অংশ ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ কথাটি মুহূর্তেই সারা দেশকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। তা তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই একই ভাষণে বিএনপির ৩১ দফাকে সামনে রেখে আবার বলেন, ‘উই হ্যাভ আ প্ল্যান। উই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি।’ ‘আমি’ শব্দটিকে জাদুর মতো ‘আমরা’তে পরিণত করার মতো দূরদর্শিতা সেদিন তারেক জিয়া দেখাতে পেরেছেন বলেই মানুষ আবার নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে তাঁর হাত ধরে। যার প্রমাণ দিয়েছে মানুষ ভোটের মাধ্যমে।

দেশে ফিরে আসার পর থেকে আজ অবধি ব্যক্তিজীবনের পরিমিত চালচলন তারেক জিয়াকে আমজনতার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত করতে পেরেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জনগণের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনেকটাই কাছের মানুষ বলে মনে হয়। কারণ, তিনি নিজের নিরাপত্তার আগে ভাবেন জনগণের ভোগান্তির কথা। আর সে কারণে সাধারণ মানুষের মতোই রাস্তায় চলাচল করেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কল্পনাতীত। নিজের টাকায় গাড়ির জ্বালানি খরচ থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আপ্যায়ন ব্যয় সংকুচিত করেছেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন সাধারণ মানুষের মতো হওয়ার কথা নয়। তবে তারেক জিয়া সেটা করেছেন। তার ছবির ব্যবহার কিংবা নামের আগে ‘মাননীয়’ শব্দের অযাচিত প্রয়োগ করতে নিষেধ করে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।

ব্যক্তি তারেক জিয়া এখন অবধি দেশের কাজের পাশাপাশি পরিবার ও সন্তানকে প্রাধান্য দিয়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন একজন স্বামী ও পিতা হিসেবে। এর পাশাপাশি যে কাজটি তিনি করেন, তা হলো প্রায়ই বাবা-মা ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন। সব মিলিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া সময়ের সঙ্গে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, এটা সত্যিকার অর্থেই সাধুবাদের যোগ্য। হয়তো নির্বাসিত জীবনে তিনি জীবনের সঠিক মূল্যবোধ দিয়ে নিজেকে আত্মস্থ করতে পেরেছেন। তাঁর এই মূল্যবোধ দেখে মনে হতেই পারে, নিশ্চয়ই কোনো জাদুবলে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে এত সহজে সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তি তারেক জিয়ার সাধারণ জীবনবোধ দেশ পরিচালনায় বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে কি না। কারণ, একজন প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে সারা দেশের দায়ভার। সাধারণ মানুষের জীবনের চাওয়া-পাওয়ার দিকে লক্ষ রেখে তাঁকে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আর সে ধারাবাহিকতায় দেশ মূল্যায়ন করবে তারেক জিয়ার সেই কথাকে, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’।

জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে। ১৭ বছর পর আবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার হাত ধরে। যদিও পারিবারিকভাবে তারেক জিয়া তাঁর বাবা-মা দুজনকেই দেশ চালাতে দেখেছেন, কিন্তু নিজের প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে দেশ পরিচালনায় তিনি অনেকটাই নবীন। আর বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে খুব মসৃণভাবে, তা কিন্তু নয়। তাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। দেশের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা তথৈবচ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ নানা সমস্যা দেশজুড়ে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সরকারকে সংকটে ফেলতে চাইছে বিরোধী দল।

দেশের প্রতিটি খাত সঠিক পথে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া ও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার মতো মানসিকতা থাকতে হবে বিএনপির মন্ত্রিপরিষদ ও সংসদ সদস্যদের। পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের সার্বিক ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত বিএনপি সরকার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। নিজেদের ৩১ দফার অন্যতম দফা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তারা। তবে এসব বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক থেকে প্রতিনিয়ত ঋণ নেওয়াটা দেশের জন্য সুখকর বিষয় নয়। আর্থিক খাতের সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো ব্যাংকের অর্থসংকট। এ ক্ষেত্রে যদি পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে না পারে, তবে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে কতটা পারবে, তা সরকারকে ভাবতে হবে।

এর পাশাপাশি যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দেশের পুলিশিং ব্যবস্থা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে বিগত সরকারের প্রতি তাদের অনুগত আচরণের কারণে। আওয়ামী লীগ সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি সরকারে পরিণত করার পেছনে দেশের প্রশাসন ও পুলিশ অনেক বেশি ভূমিকা পালন করেছে। তারা এ কাজ করেছে নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করে সম্পদের পাহাড় গড়তে। তাই তারেক জিয়ার যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখা উচিত, তা হলো রাজনৈতিক অবস্থানে থাকা সরকার যেন কোনোভাবেই প্রশাসন ও পুলিশের মাধ্যমে প্রভাবিত না হয়। রাজনৈতিক পরিচয়ে লোক নিয়োগ কিংবা চাকরিতে পদোন্নতি দেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করা উচিত। কারণ, বর্তমান বাংলাদেশে সবাই এখন বিএনপির নেতা, কর্মী বা সমর্থক। যেমনটা ছিল আওয়ামী লীগের সময়। দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের আজ্ঞাবহ অনেক ব্যক্তিই রাতারাতি চরিত্র বদল করে বিএনপি সরকারের ছায়াতলে ইতিমধ্যে নিজেদের অবস্থান নিয়েছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি সব সময়ই দুর্নীতিবাজ, এ কথাটা অকাট্য সত্য। আর এ ধরনের ব্যক্তিরা রাজনৈতিক চরিত্র বদল করেন নিজের স্বার্থে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, দেশটা অনিরাপদ ও দুর্নীতিতে পরিবেষ্টিত। তাই দেশের মানুষের সর্বোচ্চ ম্যান্ডেট নিয়ে আসা বিএনপি সরকারের সবার আগে যে কাজটি করা দরকার ছিল, তা এখন অবধি হয়নি। তা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন। পুলিশের নৈতিক অবক্ষয় আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকে কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা অবান্তর। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়াকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরও বেশি সচেতন হতে হবে। তাঁর শাসন পরিচালনা দেখে মনে হয়, তিনি অনেকটাই জিয়াউর রহমানের চিন্তাধারাকে অনুসরণ করছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে, সময়ের পরিবর্তন হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময়ে ঘুষ-দুর্নীতি শব্দগুলো মানুষ শোনেনি। কিন্তু বর্তমানে ঘুষ ছাড়া মানুষ কোনো কাজ করতে পারে না। দেশটাকে ভালো করতে হলে মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারার পরিবর্তন প্রয়োজন। আর সেই কাজটি যদি তারেক জিয়া তাঁর সরকার ও দল থেকে শুরু করতে পারতেন, তাহলে হয়তো অনেক কিছু সহজ হয়ে যেত।

বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি সরকারের সাত-আট মাস পার হওয়ার আগেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু তারা জনগণের কথা বলে না। তারা দেশকে এগিয়ে নিতে চায় ১৯৭১ সালকে অস্বীকার করে। যা খুবই হাস্যকর। স্বাধীনতাবিরোধীরা আজ দেশের বিরোধী দল, এটা বাংলাদেশের জন্য সুখকর বিষয় নয়। তাদের সঙ্গে এনসিপি যোগ দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে উপেক্ষা করতে চায় নতুন বন্দোবস্তের নামে। এদের হাত থেকে সংবিধান রক্ষার গুরুদায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার সরকারের।

বিরোধী দল মনে করে, কথায় কথায় আন্দোলন হয়। আন্দোলনের বিষয়টি খুব সহজ নয়। দেশের জনগণ কখন, কেন পথে নামে, তা অতীত থেকে বুঝতে হবে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই। দেশের মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও হাম নিয়ে যে সংকটে আছে, তা সরকারকে দ্রুত সামাল দিতে হবে। বিগত সরকারের দোহাই দিয়ে পরিস্থিতি বেশিদিন সামাল দিতে পারবে না বিএনপি সরকার। এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। জনতার কাতারে প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি মন্ত্রীদেরও আসতে হবে। তা না হলে একক ব্যক্তি-কেন্দ্রিক সরকার আবারও মানুষ দেখতে পাবে আগামীতে, যা দেশের জনগণ আর দেখতে চায় না।

এমনিতেই বাংলাদেশের রাজনীতির বড় দুটি দলই পরিবার-কেন্দ্রিক। তাই তারেক জিয়া যদি আগামীর বাংলাদেশকে নতুনভাবে সাজাতে চান, তাহলে দলে নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য কাজ করতে হবে। সুযোগ দিতে হবে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের।

সারা বিশ্ব এখন জেন-জি প্রজন্মের চিন্তাচেতনার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে বেশ বেগ পাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও এর বাইরে নয়। বরং শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণে জেন-জিদের ভূমিকা এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এই জেন-জিদের ভাবনার বাংলাদেশকে তারা বিপথে পরিচালিত করেছে বলে আজ তাদের নতুন দল এনসিপি গঠন করে জোট করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে। একজন শেখ হাসিনা মানেই বাংলাদেশ নয়। তারা মনে করে, মুক্তিযুদ্ধ মানেই আওয়ামী লীগ। এ ভুল ধারণাটি যে অমূলক, তা বোঝাতে হবে তারেক জিয়ার সরকারকে। তা না হলে আগামীর বাংলাদেশ ভুলে যাবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ইতিহাসকে।

বিএনপি বরাবরই ক্ষমতায় আসে দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে। তারেক জিয়ার নিজের পরিকল্পনার প্রতিফলন কতটা কষ্টসাধ্য হবে, তা বোঝা যায় চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটসহ রাজনৈতিক বিরোধিতার নানা পরিস্থিতিতে। তিনি যেদিন নিজের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছিলেন, তা বাস্তব রূপ দেওয়ার সুযোগ হয়েছে ইউনূস সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এখন জুলাই সনদ কিংবা আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে ভাবে না। তারা চায় প্রাত্যহিক জীবনের নিশ্চয়তা এবং মৌলিক অধিকার ও চাহিদার পূরণ। জনগণের মনের ভাবনা ধারণ করতে পারলে বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক জিয়ার অর্ধেক স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত-আট মাস পার করেছে। এর মধ্যে তারেক জিয়া কতটা তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন, তা বিচার করার সময় এখনো আসেনি। তবে তারেক জিয়া নিজেকে যতটা সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, ততটা মন্ত্রিপরিষদে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তারা প্রথাগতভাবেই কাজ করছে। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো মন্ত্রিপরিষদ ও উপদেষ্টাদের অবস্থান। বিএনপি সরকারের মন্ত্রিপরিষদ আরও শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজন ছিল। আর উপদেষ্টারা পদাধিকারের কারণে মন্ত্রীদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে থাকেন। যার প্রমাণ অতীত থেকে নেওয়া দরকার বিএনপি সরকারের। কারণ, লোকচক্ষুর অন্তরালে মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় পরিচয়ে তদবির, বদলি ও এলাকায় নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকেন। আসলে তারেক জিয়া দীর্ঘ ১৭ বছর দেশের বাইরে থেকে দল ও দেশকে দেখেছেন। সে কারণে সরকার পরিচালনায় তাঁকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে।

এর পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক রাখবেন, তার প্রমাণ এখনো সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি। যদিও নানা ধরনের আদেশ পালন করছে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে বিমান ক্রয় করে। হয়তো তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবেন বলে আশা করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া সফর ঘিরে বেশ আলোচনা হয়েছে। ওই সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তারেক জিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রকাশ করেছেন ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ গানটির মাধ্যমে।

মালয়েশিয়া সফরে তারেক জিয়ার চিন্তাভাবনা অত্যন্ত সুচিন্তিত ছিল। আর তারই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের অধিবেশনে তারেক জিয়া বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। রোহিঙ্গা সমস্যার আন্তর্জাতিক সমাধান করা তারেক জিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, রোহিঙ্গাদের সামাল দেওয়া বর্তমান বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বৈরিতা কমিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নত করতে হবে। সারা বিশ্বে এখন ইরাক যুদ্ধের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে তারেক জিয়াকে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তা না হলে সরকারের পক্ষে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও বাণিজ্য বৃদ্ধি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশে প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষা, বিচার, আইনশৃঙ্খলা ও বেকারত্বের সমস্যা সীমাহীন পর্যায়ে চলে গেছে। বিগত সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছিল, কিন্তু মানব উন্নয়ন হয়নি বলে মানুষের মানবিকতা হারিয়ে গেছে। তাই তারেক জিয়ার সরকারকে ইট-পাথরের ঝকঝকে দেশ তৈরি করার চেয়ে মানবসম্পদকে শতভাগ সফল করতে হবে। আর এ কাজটি হলেই তারেক জিয়ার ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ দৃশ্যমান হবে নতুন বাংলাদেশে।

একটি কথা বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, স্বপ্ন ও পরিকল্পনা সবাই করে, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা ততটা সহজ নয়।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত