নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বক্তাবলী ইউনিয়নে ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে গুলি-টেঁটাবিদ্ধসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে আকবরনগর এলাকায় সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে হাজী সামেদ আলীর ছেলে হৃদয় গুলিবিদ্ধ এবং আলাউদ্দিন শেখের ছেলে রাজু শেখ টেঁটাবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আহত কয়েকজনকে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধে একদিকে রয়েছেন বক্তাবলী ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হালিম আজাদ, বিএনপি নেতা খবির উদ্দিন ও মোক্তার। অন্যদিকে রয়েছেন সম্প্রতি এলাকায় ফিরে আসা বক্তাবলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক হাজী সামেদ আলী, কাজী সিপাই ও হাসান আলী। তারা সম্প্রতি বিএনপির একটি পক্ষের গোপন সমর্থন পাচ্ছেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, বক্তাবলীর ধলেশ্বরী নদীর পশ্চিম তীরের ইটভাটাগুলোতে মাটি সরবরাহ, শ্রমিক সরবরাহসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। এসব খাত থেকে কমিশন আদায় ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। শনিবার সেই বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষের পর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফতুল্লা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে বক্তাবলীর ইটভাটাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর হাতে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইটভাটাকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে স্থানীয় প্রভাবশালী পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিএনপি নেতা হালিম আজাদ ইটভাটাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেন। সম্প্রতি হাজী সামেদ আলী এলাকায় ফিরে এসে এসব ইটভাটার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে বিরোধ তৈরি হয়।
স্থানীয়রা জানান, শনিবার সকালে বক্তাবলী ইউনিয়নের আকবরনগর এলাকায় গিয়ে শোডাউন করেন হালিম আজাদ। সেখানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় হামলা-পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকজন আহত হন। সংঘর্ষের সময় হৃদয় গুলিবিদ্ধ ও রাজু টেঁটাবিদ্ধ হন।
গুলিবিদ্ধ হৃদয়ের অভিযোগ, তিনি বাসা থেকে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় হালিম আজাদের নেতৃত্বে একদল লোক তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় হালিম আজাদ পিস্তল দিয়ে তাঁকে গুলি করেন। হালিম আজাদ তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এলাকার সব ইটভাটা দখলের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, তাঁর বাবা হাজী সামেদ আলী এলাকায় জনপ্রিয় মানুষ। তিনি হালিম আজাদের চাঁদাবাজি-দখলবাজির প্রতিবাদ করায় হালিম আজাদ তাঁর ওপর হামলা চালায়।
বিএনপি নেতা হালিম আজাদ জানান, শনিবার সকালে আকবনগরের পাশের গ্রাম চরবক্তাবলী এলাকায় ইউনিয়ন কৃষক দলের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা করা হয়। সভা শেষে তারা মিছিল করে আসার সময় সামেদ আলীর লোকজন হামলা চালায়। তিনি বলেন, ‘সামেদ আলী ও তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গুলি করে একাধিক হত্যা মামলা ছাড়াও ২০-৩০টি করে মামলা রয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাদের কিছু বলে না।’ সামেদ আলী এলাকার প্রতিপক্ষ বিএনপির সহায়তা পাচ্ছে এমন গুঞ্জন প্রসঙ্গে হালিম আজাদ বলেন, ‘কার সহায়তা পাচ্ছে জানি না, কিন্তু পুলিশ সামেদ আলীর ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় না, এটাই আমরা দেখছি।’
শনিবার সংঘর্ষের ঘটনার পর বিকেলে বিএনপির নেতাকর্মীরা সামেদ আলীর বাড়িঘরে ভাঙচুর চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সামেদ আলী বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যানের লগে আগে ছিলাম। কিন্তু কোনো পদ-পদবি ছিল না। আগস্টের পর আমার ব্যবসা-বাণিজ্য সব দখল করছে বিএনপির লোকজন। আমার স্ত্রীছাড়া বাড়িতে কেউ থাকে না। আমাগো সরাইয়া দিয়া সবকিছুর দখল নিতে চায় হালিম ও তাঁর লোকজন।’
শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকেও উভয় পক্ষের লোকজন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যও মোতায়েন রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক-সার্কেল) শামীম হোসেন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে এলাকায় অভিযান চলছে। বেশ কিছু বল্লম উদ্ধার করা হয়েছে।
মতামত