একটি কিডনির বিনিময়ে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের খুকশিয়া গ্রামের দিনমজুর মন্টু মিয়াকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন দালালেরা। সংসারের অভাব ও ধারদেনার চাপে তিনি কিডনি বিক্রিতে রাজি হন। দালালেরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে পাসপোর্ট করান। এ বছরের জানুয়ারির শুরুর দিকে তাঁকে ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়। পরে নেপালে নিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। বাকি সাড়ে ৯ লাখ টাকা না দিয়েই তাঁকে দেশে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় মন্টু আদালতে মামলার আবেদন করেন। পরে এ বছরের ১৩ জুন আদালতের নির্দেশে জয়পুরহাটের কালাই থানা-পুলিশ ওই মামলা নেয়। মামলায় কালাইয়ের পাইকপাড়া গ্রামের আবদুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, বহুতি গ্রামের আবদুস সাত্তারসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়। পরে গত ১২ আগস্ট সাত্তারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে ২০১১ সালের একটি মামলা ও ২০১৩ সালের আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সাত্তার।
গ্রেপ্তারের আগে সাত্তারের সঙ্গে গত ২৯ জুলাই মুঠোফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সে সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেছিলেন, একসময় তিনি কিডনির দালালি করতেন। এখন দালালি করেন না। একটি চক্র মামলাবাণিজ্য করতে তাঁকে ফাঁসিয়েছে।
তবে ভুক্তভোগী মন্টু মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধেই মামলা করেছেন। অযথা কাউকে আসামি করা হয়নি।
কালাইয়ে কিডনি বেচাকেনার ঘটনা নিয়ে গত ১৫ বছরে এমন ১৭টি মামলার নথি প্রথম আলো পেয়েছে। এসব মামলা কেউ চুক্তি অনুযায়ী টাকা না পেয়ে; আবার কেউ প্রতারিত হয়ে করেছেন। মামলার পর আসামিরা কেউ কেউ গ্রেপ্তারও হন; কিন্তু তাঁরা জামিন পেয়েই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এদিকে এ পর্যন্ত একটি মামলারও বিচার শেষ হয়নি। ফলে কিডনি বেচাকেনা থেমে নেই।
জানতে চাইলে জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার (এসপি) শাহনাজ বেগম গতকাল শুক্রবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের পর মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোগ ও প্রতারণা আইনে একটি মামলা হয়েছে। কিডনি বেচাকেনার চক্রের দালাল ও প্রতারকদের গ্রেপ্তারে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
অন্য মামলাগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে এসপি বলেন, আমি নতুন। পুরোনো মামলার নথি দেখে পরে বলা যাবে।
এদিকে কালাইয়ের কিডনি বেচাকেনা নিয়ে ২০১১ সালে প্রথম বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে। ২০১১ সালের ৩০ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘২০০ অভাবীর কিডনি বিক্রি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালায়। বছর দুয়েক কিডনি বেচাকেনার কথা তেমন আলোচনায়ও ছিল না। এরপর আবার শুরু।
সম্প্রতি কালাইয়ের উদয়পুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও পাইকপাড়া গ্রাম ঘুরে ২৭ জনের কিডনি বিক্রির কথা জানা গেছে। এর মধ্যে নয়াপাড়া গ্রামের খয়বর আলী, তাজু, হেলাল, আলীম, জাহিদুল, সোবহান, গোফ্ফার, অহিদুল, শহিদুল, খাজা, রাসেদ মিয়া—এই ১১ জন ও দুই নারী কিডনি বিক্রি করেছেন। তাঁদের মধ্যে খয়বর, এক নারী ও রাসেদ দুই বছর আগে কিডনি বিক্রি করেন। অন্যরা কেউ তিন বছর বা এরও আগে কিডনি বিক্রি করেন।
পাইকপাড়া গ্রামের মেহেদী, মাসুদ, মান্নান, আমির, ইমদাদুল, সাইদুল, রেজাউল এবং সাত নারীসহ মোট ১৪ জন কিডনি বিক্রি করেছেন। নারীদের মধ্যে পাঁচজন দেড় থেকে দুই বছর আগে কিডনি বিক্রি করেছেন।
এদিকে কালাইয়ের ভেরেন্ডি গ্রামের একই পরিবারের বাবা, দুই ছেলে ও এক ছেলের স্ত্রী ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে কিডনি বিক্রি করেছেন বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
২০২২ সালের ১৪ মে এসআই ফারুক হোসেন মামলা করেন। এ মামলার তদন্ত শেষে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ২১ জুলাই ভুক্তভোগী রাজু মিয়া মামলা করেন। এ মামলার তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল ভুক্তভোগী গাফ্ফার মিয়া মামলা করেন। এ মামলার তদন্ত শেষে ওই বছরের ২১ জুলাই সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর কালাইয়ের নয়াপাড়া গ্রামের রাসেদ মিয়া প্রতারণার অভিযোগে আদালতে মামলার আবেদন করেন। তিন দিন পর ১৪ ডিসেম্বর তিনি ওই আবেদন প্রত্যাহার করেন। তিনি বলেন, ‘একজনের কাছে কিডনি বিক্রির ৪০ হাজার টাকা পেতাম, টাকা দিচ্ছিলেন না। তাই মামলা করেছিলাম। টাকা দেওয়ায় মামলা তুলে নিয়েছি।’
সর্বশেষ ১৩ জুন হওয়া মন্টুর মামলার অভিযোগপত্র এখনো আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।
২০১১ সালের ২৯ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৩ জুন পর্যন্ত কিডনি বেচাকেনার অভিযোগে হওয়া ১৭টি মামলার নথি প্রথম আলোর কাছে রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মামলার বাদী পুলিশ এবং ছয়টি মামলার বাদী ভুক্তভোগী ও প্রতারিতরা। এসব মামলার আসামি দেড় শতাধিক। তাঁদের কয়েকজন এখনো কারাগারে, অনেকে জামিনে, আবার অনেকে পলাতক। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলার বাদী পুলিশ। অন্য চারটি ভুক্তভোগীরা করেছেন। ২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৬টি মামলা হয়েছে। এই ছয় মামলারই বাদী পুলিশ। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৫টি মামলা হয়েছে। এই পাঁচ মামলার তিনটির বাদী পুলিশ; আর ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর খালেদা আক্তার নামের এক নারী এবং ২০১৬ সালের ৯ জুলাই হাসিনা বেগম নামের আরেক নারী একটি করে দুটি মামলা করেছেন। আর কালাই থানার তৎকালীন এসআই নৃপেন্দ্রনাথ ঘোষ ২০১১ সালের ২৯ আগস্ট প্রথম কিডনি বেচাকেনা চক্রের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন।
প্রথম মামলার বাদী নৃপেন্দ্রনাথ এখন রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে আছেন। মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে গত ৩০ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই মামলার বর্তমান অবস্থা আমি জানি না।’
২০১৪ সালে কালাইয়ের থল গ্রামের গৃহবধূ কামরুন নাহার কিডনি বিক্রি করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। তাঁকে একটি কিডনির বিনিময়ে সাত লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। দালালেরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে পরীক্ষা করান। কিডনি নেওয়ার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়। এ সময় চুক্তির টাকা দাবি করেন তিনি। টাকা না পেয়ে তিনি কিডনি দিতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে তাঁকে ঢাকায় আটকে রাখা হয়। পরে তাঁর পরিবার দালালদের দুই লাখ টাকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নেয়।
দালালদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি সাতজনের নামে আদালতে মামলার জন্য আবেদন করেন কামরুন নাহার। আদালতের নির্দেশে মামলাটি নেয় কালাই থানা। কালাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বুলবুল ইসলাম তদন্ত শেষে ওই বছরের ৯ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। মামলাটি এখন জেলা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।
জানতে চাইলে কামরুন নাহার গত ১৭ সেপ্টেম্বর মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’
মামলার বর্ণনা ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে কিডনির দালাল চক্রটি ভারত ও নেপালে নিয়ে কিডনি বিক্রেতার একটি কিডনি অপসারণ করত। এখন তারা পাকিস্তানও নিয়ে যাচ্ছে।
জয়পুরহাটের একজন বাসিন্দা ঢাকায় চাকরি করেন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি ডোনারকে (কিডনি বিক্রেতা) সঙ্গে নিয়ে সম্প্রতি পাকিস্তানে গিয়ে একটি কিডনি সংযোজন করেন। এতে তাঁর ২২ লাখ টাকা খরচ হয়। কালাইয়ের ওই কিডনি বিক্রেতা ঢাকায় রিকশা চালান। রোগীর ভাই বলেন, কিডনি না পেলে ভাইকে বাঁচনো যেত না। টাকা যাক, ভাই তো বেঁচে আছেন।
দালালেরা এলাকার অভাবী ও ঋণগ্রস্ত মানুষ লক্ষ্য করে তাঁদের কাছে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে কিডনি বিক্রির পরামর্শ দেন। তাঁরা কিডনি বিক্রিতে রাজি হলে তাঁদের ঢাকায় আনা হয়। ধাপে ধাপে সব প্রক্রিয়া শেষে তাঁদের বিদেশে নিয়ে অস্ত্রোপচার করে একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। দেশে ফেরার পর বেশির ভাগ কিডনি বিক্রেতা ঢাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন কাজ করেন। এমন দুজনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তবে তাঁরা তাঁদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
কালাইয়ের আইনজীবী নাফিৎজ্জামান তালুকদার ওরফে ডলার প্রথম আলোকে বলেন, দালালেরা দরিদ্র পরিবারের অভাবকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের কিডনি বিক্রিতে প্রভাবিত করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে এ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কয়েকজন কিডনি বিক্রেতা ও দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাঁরা কিডনি দেন, তাঁরা হঠাৎ রিকশা চালানো, পোশাককারখানায় চাকরি ও বাসায় কাজের কথা বলে ঢাকায় চলে যান। পরে কিডনি বিক্রি করেন। চার-পাঁচ মাস পর তাঁরা গ্রামে আসেন। সামাজিক ও আইনি জটিলতার ভয়ে তাঁরা আবার ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যান। এমনই দুজন আপন ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তাঁরা পাইকপাড়া গ্রামের মেহেদী ও মাসুদ। তাঁরা কিডনি বিক্রি করে এখন ঢাকায় থাকেন।
মামলার নথি, পুলিশ ও কয়েকজন দালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পথঘাট চেনার পর কিডনি বিক্রেতারাই পরে কিডনির বিক্রির দালাল বনে যান। তাঁরা এলাকায় এসে অন্যজনকে কিডনি বিক্রিতে প্রলুব্ধ করেন। তবে সামাজিক লাঞ্ছনা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় কিডনি বিক্রেতারা গ্রামে এসে থাকেন না।
এমন একজন জয়পুরহাট সদর উপজেলার কয়তাহার গ্রামের লুৎফর রহমান। তাঁকে ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সে সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে লুৎফর বলেছিলেন, তিনিও একসময় কিডনি বিক্রি করেছিলেন। পরে দালালদের মাধ্যমে অন্যদের কিডনি বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েন।
প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক ১২ জন কিডনি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা বলেন, তাঁরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ এক দিন দালালেরা এসে তাঁদের বলেন, একটি কিডনি দিলে শরীরের ক্ষতি হবে না। আবার তাঁর একটি কিডনিতে একজন মানুষও বাঁচবে। মোটা অঙ্কের টাকা পেলে তাঁদের ঋণও শোধ হবে। এমন কথায় তাঁরা উদ্বুদ্ধ হয়ে কিডনি বিক্রি করেন। তবে কিডনি বিক্রির পরও তাঁদের অভাব থেকেই গেছে।
এ বিষয়ে কথা হয় কিডনি বিক্রেতা কালাইয়ের পাইকপাড়ার মতিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি গত ১৭ আগস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিডনি বিক্রি করে চার লাখ টাকা পেয়েছিলাম। তবুও অভাব দূর হয়নি।’
মামলাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শাহনুর রহমান শাহীনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এ সময় তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ পর্যন্ত কোনো মামলার রায় হয়নি। আদালতে সব মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলমান।
মতামত