ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

এআই অনুবাদে ভুলের ঝুঁকি কতটা ভয়ংকর?



এআই অনুবাদে ভুলের ঝুঁকি কতটা ভয়ংকর?
এআই অনুবাদে ভুলের ঝুঁকি কতটা ভয়ংকর?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সুবাদে অনুবাদের কাজ এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব হচ্ছে। গুগল ট্রান্সলেট, ডিপএল, চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও জেমিনির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লেখা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এআইয়ের অনুবাদ এতটাই সাবলীল যে মানুষের লেখা থেকে তা আলাদা করাও কঠিন। কিন্তু আইনি নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মতো ক্ষেত্রে সামান্য একটি ভুলও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অনুবাদের কাজে মানুষের প্রয়োজন কি একদিন পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে?

ফরাসি ভাষায় প্রচলিত একটি প্রবাদ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়। ফরাসিরা প্রচণ্ড বৃষ্টিকে বোঝাতে বলেন, ‘ইল প্ল্যু দে কর্দ’—যার আক্ষরিক অর্থ, ‘দড়ি বৃষ্টি হচ্ছে’। কিন্তু বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে’— এটি একটি প্রচলিত বাগধারা।

ফরাসি জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএনআরএস) স্বয়ংক্রিয় অনুবাদবিষয়ক গবেষণা পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ইভোঁর মতে, এ ধরনের বাগধারা এআই অনুবাদব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। প্রশিক্ষিত কোনও ব্যবস্থা বুঝতে পারে যে, আকাশ থেকে সত্যিই দড়ি পড়ছে না। তাই ইংরেজিতে সে ‘ইটস রেইনিং ক্যাটস অ্যান্ড ডগস’ (বাংলায় ‘মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে’)—এমন একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু একই অর্থ ইন্দোনেশীয় ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে সেটি কতটা যথাযথ অভিব্যক্তি খুঁজে পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

আবহাওয়া নিয়ে একটি বাগধারা ভুল অনুবাদ হলে ক্ষতি সামান্যই। কিন্তু অনুবাদের ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এমন সব বিষয়ে, যেখানে ভুলের মূল্য অনেক বেশি।

এক মাসে এক লাখ কোটি শব্দের অনুবাদ গত এপ্রিলে গুগল জানিয়েছিল, গুগল ট্রান্সলেটের মাধ্যমে প্রতি মাসে এক লাখ কোটি শব্দ অনুবাদ করছেন ব্যবহারকারীরা। এর বাইরে ডিপএল, মাইক্রোসফটের বিভিন্ন সেবা, ক্লড, চ্যাটজিপিটি ও জেমিনির মতো এআই ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অনুবাদ প্রযুক্তিও রয়েছে।

সাধারণ এআই সাবস্ক্রিপশনের বাইরে সরাসরি যন্ত্রনির্ভর অনুবাদ সেবার বাজারমূল্য গত বছর আনুমানিক ১৪০ কোটি ডলার ছিল বলে ধারণা করা হয়।

এত বিপুল ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণের পেছনে রয়েছে অনুবাদের খরচ ও সময় কমানোর সুবিধা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওপেন নলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (ওকেএ) প্রতিষ্ঠাতা জোনাথন জিমারম্যানের মতে, অনেক কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের তৈরি প্রাথমিক অনুবাদই যথেষ্ট। অভ্যন্তরীণ নথি কিংবা পণ্যের বিবরণ অনুবাদের মতো কাজে শেষ কয়েক শতাংশ ভুল দূর করতে খরচ ১০০ গুণ বাড়ানো সব সময় যুক্তিযুক্ত নয়।

তবে বিশ্বকোষের মতো তথ্যভিত্তিক প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ, সেখানে পাঠকের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল তথ্য বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে এবং পরে সাংবাদিক কিংবা অন্য এআই ব্যবস্থাও সেটিকে নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

উইকিপিডিয়ার বিভিন্ন ভাষায় নিবন্ধ অনুবাদ করে ওকেএ এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি লেখা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ অনুবাদ স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও ইংরেজি ভাষায়। জিমারম্যানের মতে, এআই ছাড়া এত বিপুলসংখ্যক নিবন্ধ অনুবাদ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

তবে তাদের পদ্ধতিতে এআইয়ের তৈরি খসড়াই চূড়ান্ত অনুবাদ নয়। প্রথমে এআই অনুবাদ তৈরি করে, এরপর মানব অনুবাদক প্রতিটি বাক্য যাচাই করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে ১০ হাজার নিবন্ধ অনুবাদ করতে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারত।

অনুবাদে মানুষের ভূমিকা কি কমে যাচ্ছে? জিমারম্যানের মতে, এআই অনুবাদের মান অনেকটাই উন্নত হয়েছে। সে কারণে এখন অনেক ক্ষেত্রে মানব অনুবাদকের সাহায্য ছাড়াই কাজ শেষ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন অনেকে। 

দুই-তিন বছর আগেও ডিপএলের মতো ব্যবস্থায় তৈরি খসড়ার বড় অংশ অনুবাদকদের নতুন করে লিখতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে ভাষা সাবলীল থাকে, তাই বড় ধরনের সম্পাদনার প্রয়োজন পড়ে না।

তাই প্রশ্নটি আর শুধু এআই ভালো অনুবাদ করতে পারে কি না, তা নয়। বরং এআইয়ের অনুবাদ দক্ষ মানুষের যাচাই ছাড়াই তা প্রকাশ করা যায় কি না, প্রশ্ন সেখানে।

অনুবাদকদের অভিজ্ঞতা বলছে, অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে এখনই সেই নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।

আইনি নথিতে একটি ভুলের বড় মূল্য ইংরেজি থেকে ফরাসিতে আদালতসংক্রান্ত নথি অনুবাদে বিশেষজ্ঞ অনুবাদক ও আইনবিশেষজ্ঞ আরিয়েলা বালতির সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতা এআইয়ের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।

এক ব্যক্তি নিজের আইনি নথি এআই দিয়ে অনুবাদ করার পর সেগুলো যাচাই করতে আরিয়েলা বালতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু অনুবাদের শুরুতেই দুটি গুরুতর ভুল ধরা পড়ে।

ফরাসি ভাষার ‘লে দেমঁদর’ শব্দটির অর্থ মামলার বাদী। এআই সেটিকে অনুবাদ করেছিল ‘অনুরোধকারী’ হিসেবে, যা আইনি নথিতে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। আবার ‘মাদাম এক্স, এপুজ ওয়াই’—যার অর্থ ‘ওয়াইয়ের স্ত্রী মিসেস এক্স’—বাক্যাংশটি এআই অনুবাদ করেছিল এমনভাবে, যেন মিসেস এক্স ওয়াইকে বিয়ে করছেন।

অর্থাৎ, এআই একটি বিশেষ্যকে ক্রিয়া হিসেবে ধরে বাক্যটির মূল অর্থই বদলে দিয়েছিল।

আইনি অনুবাদে এ ধরনের ভুলের পরিণতি গুরুতর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে যন্ত্রের মাধ্যমে অনূদিত আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনে ভুলের কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি পেতে বিলম্ব হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

চিকিৎসায় ভুল অনুবাদ জীবনঘাতী হতে পারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুবাদের নির্ভুলতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের মাত্রা, রক্ত পরীক্ষার ফল কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনায় একটি প্রতীক বা এককের ভুলও রোগীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

চিকিৎসাবিষয়ক অনুবাদ বিশেষজ্ঞ ক্যারল বেরেউটার এমন একটি স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে গ্রিক বর্ণ ‘μ’ বা মাইক্রোকে ‘মিলি’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছিল।

মিলি মানে এক হাজার ভাগের এক ভাগ, আর মাইক্রো মানে দশ লাখ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ, কোনো রোগীকে এক মাইক্রোগ্রামের পরিবর্তে এক মিলিগ্রাম দেওয়া হলে তিনি নির্ধারিত মাত্রার এক হাজার গুণ ওষুধ পেতে পারেন।

এ ধরনের ভুল শনাক্ত করাও এখন কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করেন বেরেউটার। আগে গুগল ট্রান্সলেটের মতো ব্যবস্থায় ভুল অনুবাদ প্রায়ই ব্যাকরণগত ত্রুটি কিংবা অস্বাভাবিক বাক্যগঠনের কারণে চোখে পড়ত। কিন্তু আধুনিক এআইয়ের লেখা অনেকটা সাবলীল। ফলে ভুল থাকলেও তা সহজে ধরা পড়ে না।

ফ্রাঁসোয়া ইভোঁ সতর্ক করে বলেন, কোনও অনুবাদে নিজের স্বাক্ষর দিতে হলে সুনামের ঝুঁকি থাকে। আর সেই অনুবাদের ভিত্তিতে চিকিৎসা, চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা বড় কোনও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

প্রসঙ্গ না বুঝলে এআই ভুল করবেই অনুবাদে শুধু শব্দের অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়; বাক্যটি কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়েছে, তা বোঝাও জরুরি।

ইভোঁর মতে, একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকলে মানুষ সাধারণত প্রসঙ্গ দেখে সঠিক অর্থটি বুঝতে পারে। কিন্তু যন্ত্রের ক্ষেত্রে একই নিশ্চয়তা নেই। যেমন, ‘পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করো’ নির্দেশনাটিকে কোনও এআই ব্যবস্থা ভুলভাবে জুতার পালিশসংক্রান্ত নির্দেশনা হিসেবেও ধরে নিতে পারে।

একইভাবে, ফুটবল ম্যাচের প্রসঙ্গ না বুঝলে ‘টেকিং আ কর্নার’ কথাটিকে ভুল অনুবাদ করার আশঙ্কা রয়েছে। ফুটবলে এর অর্থ কর্নার কিক নেওয়া; কিন্তু সাধারণ প্রসঙ্গে শব্দগুলোর অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যা কতটা গুরুতর, তা যাচাই করতে গত বছর উইকিমিডিয়ার অর্থায়নে একটি গবেষণা চালায় ওকেএ। এতে ১০টি ভাষার ১১৯টি নিবন্ধ বিশ্লেষণ করা হয় এবং অনুবাদকেরা এক হাজার ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করেন।

জিমারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশের আগে এআইয়ের তৈরি লেখার ২৭ শতাংশ সংশোধন করতে হয়েছিল। এসব সংশোধনের তিন-চতুর্থাংশ ছিল এআইয়ের তৈরি ভুলের কারণে। আর ৫ থেকে ৬ শতাংশ ভুল মূল লেখার অর্থই বদলে দিয়েছিল।

এআই দিয়ে কি শতভাগ নির্ভুল অনুবাদ সম্ভব? ইভোঁর মতে, বর্তমান এআই ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি বিবেচনায় অনুবাদকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য করে তোলা কঠিন। কারণ, এসব ব্যবস্থা সম্ভাবনার ভিত্তিতে শব্দ ও বাক্য নির্বাচন করে। কোনও অনুবাদ সম্ভাব্যভাবে সঠিক হলেই যে সেটি নিশ্চিতভাবে সঠিক, তা নয়। ভাষার সূক্ষ্মতা, বাগধারা ও প্রসঙ্গের কারণে এই ব্যবধান থেকেই যায়।

তবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে বলে আশা করছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের অনুবাদব্যবস্থায় একাধিক এআই একসঙ্গে কাজ করতে পারে—একটি অনুবাদ তৈরি করবে, দ্বিতীয়টি সেই অনুবাদের ভুল খুঁজবে এবং তৃতীয়টি সংশোধিত সংস্করণ তৈরি করবে।

কিন্তু ইভোঁর মতে, প্রকৃত অগ্রগতি আসবে তখনই, যখন এআই শুধু অনুবাদ করেই থামবে না; বরং কোন জায়গায় সে নিশ্চিত নয়, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে পারবে।

সবশেষে বলা যায়, চিকিৎসা, আইন, গবেষণা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথির ক্ষেত্রে মানুষের যাচাই এখনও অপরিহার্য। ভবিষ্যতে অনুবাদকের ভূমিকা হয়তো খসড়া তৈরি করা থেকে সরে গিয়ে যাচাই, সম্পাদনা ও অর্থের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার দিকে বেশি ঝুঁকবে। 

এআই কতটা সাবলীলভাবে অনুবাদ করতে পারে, তার পাশাপাশি নিজের ভুল ও অনিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে পারে- শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে অনুবাদে মানুষের প্রয়োজন কত দিন থাকবে। সূত্র: বিবিসি

বিডি প্রতিদিন/একেএ

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


এআই অনুবাদে ভুলের ঝুঁকি কতটা ভয়ংকর?

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সুবাদে অনুবাদের কাজ এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও কম খরচে করা সম্ভব হচ্ছে। গুগল ট্রান্সলেট, ডিপএল, চ্যাটজিপিটি, ক্লড ও জেমিনির মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ লেখা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এআইয়ের অনুবাদ এতটাই সাবলীল যে মানুষের লেখা থেকে তা আলাদা করাও কঠিন। কিন্তু আইনি নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির মতো ক্ষেত্রে সামান্য একটি ভুলও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অনুবাদের কাজে মানুষের প্রয়োজন কি একদিন পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে?

ফরাসি ভাষায় প্রচলিত একটি প্রবাদ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়। ফরাসিরা প্রচণ্ড বৃষ্টিকে বোঝাতে বলেন, ‘ইল প্ল্যু দে কর্দ’—যার আক্ষরিক অর্থ, ‘দড়ি বৃষ্টি হচ্ছে’। কিন্তু বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায় ‘মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে’— এটি একটি প্রচলিত বাগধারা।

ফরাসি জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের (সিএনআরএস) স্বয়ংক্রিয় অনুবাদবিষয়ক গবেষণা পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ইভোঁর মতে, এ ধরনের বাগধারা এআই অনুবাদব্যবস্থার জন্য বড় পরীক্ষা। প্রশিক্ষিত কোনও ব্যবস্থা বুঝতে পারে যে, আকাশ থেকে সত্যিই দড়ি পড়ছে না। তাই ইংরেজিতে সে ‘ইটস রেইনিং ক্যাটস অ্যান্ড ডগস’ (বাংলায় ‘মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে’)—এমন একটি প্রচলিত বাক্য ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু একই অর্থ ইন্দোনেশীয় ভাষায় অনুবাদ করতে গেলে সেটি কতটা যথাযথ অভিব্যক্তি খুঁজে পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

আবহাওয়া নিয়ে একটি বাগধারা ভুল অনুবাদ হলে ক্ষতি সামান্যই। কিন্তু অনুবাদের ক্ষেত্রে এআইয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এমন সব বিষয়ে, যেখানে ভুলের মূল্য অনেক বেশি।

এক মাসে এক লাখ কোটি শব্দের অনুবাদ গত এপ্রিলে গুগল জানিয়েছিল, গুগল ট্রান্সলেটের মাধ্যমে প্রতি মাসে এক লাখ কোটি শব্দ অনুবাদ করছেন ব্যবহারকারীরা। এর বাইরে ডিপএল, মাইক্রোসফটের বিভিন্ন সেবা, ক্লড, চ্যাটজিপিটি ও জেমিনির মতো এআই ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অনুবাদ প্রযুক্তিও রয়েছে।

সাধারণ এআই সাবস্ক্রিপশনের বাইরে সরাসরি যন্ত্রনির্ভর অনুবাদ সেবার বাজারমূল্য গত বছর আনুমানিক ১৪০ কোটি ডলার ছিল বলে ধারণা করা হয়।

এত বিপুল ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণের পেছনে রয়েছে অনুবাদের খরচ ও সময় কমানোর সুবিধা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ওপেন নলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (ওকেএ) প্রতিষ্ঠাতা জোনাথন জিমারম্যানের মতে, অনেক কাজের ক্ষেত্রে এআইয়ের তৈরি প্রাথমিক অনুবাদই যথেষ্ট। অভ্যন্তরীণ নথি কিংবা পণ্যের বিবরণ অনুবাদের মতো কাজে শেষ কয়েক শতাংশ ভুল দূর করতে খরচ ১০০ গুণ বাড়ানো সব সময় যুক্তিযুক্ত নয়।

তবে বিশ্বকোষের মতো তথ্যভিত্তিক প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কারণ, সেখানে পাঠকের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভুল তথ্য বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে এবং পরে সাংবাদিক কিংবা অন্য এআই ব্যবস্থাও সেটিকে নির্ভরযোগ্য তথ্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

উইকিপিডিয়ার বিভিন্ন ভাষায় নিবন্ধ অনুবাদ করে ওকেএ এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি লেখা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধিকাংশ অনুবাদ স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও ইংরেজি ভাষায়। জিমারম্যানের মতে, এআই ছাড়া এত বিপুলসংখ্যক নিবন্ধ অনুবাদ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।

তবে তাদের পদ্ধতিতে এআইয়ের তৈরি খসড়াই চূড়ান্ত অনুবাদ নয়। প্রথমে এআই অনুবাদ তৈরি করে, এরপর মানব অনুবাদক প্রতিটি বাক্য যাচাই করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে ১০ হাজার নিবন্ধ অনুবাদ করতে কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারত।

অনুবাদে মানুষের ভূমিকা কি কমে যাচ্ছে? জিমারম্যানের মতে, এআই অনুবাদের মান অনেকটাই উন্নত হয়েছে। সে কারণে এখন অনেক ক্ষেত্রে মানব অনুবাদকের সাহায্য ছাড়াই কাজ শেষ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন অনেকে। 

দুই-তিন বছর আগেও ডিপএলের মতো ব্যবস্থায় তৈরি খসড়ার বড় অংশ অনুবাদকদের নতুন করে লিখতে হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে ভাষা সাবলীল থাকে, তাই বড় ধরনের সম্পাদনার প্রয়োজন পড়ে না।

তাই প্রশ্নটি আর শুধু এআই ভালো অনুবাদ করতে পারে কি না, তা নয়। বরং এআইয়ের অনুবাদ দক্ষ মানুষের যাচাই ছাড়াই তা প্রকাশ করা যায় কি না, প্রশ্ন সেখানে।

অনুবাদকদের অভিজ্ঞতা বলছে, অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে এখনই সেই নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।

আইনি নথিতে একটি ভুলের বড় মূল্য ইংরেজি থেকে ফরাসিতে আদালতসংক্রান্ত নথি অনুবাদে বিশেষজ্ঞ অনুবাদক ও আইনবিশেষজ্ঞ আরিয়েলা বালতির সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতা এআইয়ের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।

এক ব্যক্তি নিজের আইনি নথি এআই দিয়ে অনুবাদ করার পর সেগুলো যাচাই করতে আরিয়েলা বালতির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু অনুবাদের শুরুতেই দুটি গুরুতর ভুল ধরা পড়ে।

ফরাসি ভাষার ‘লে দেমঁদর’ শব্দটির অর্থ মামলার বাদী। এআই সেটিকে অনুবাদ করেছিল ‘অনুরোধকারী’ হিসেবে, যা আইনি নথিতে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। আবার ‘মাদাম এক্স, এপুজ ওয়াই’—যার অর্থ ‘ওয়াইয়ের স্ত্রী মিসেস এক্স’—বাক্যাংশটি এআই অনুবাদ করেছিল এমনভাবে, যেন মিসেস এক্স ওয়াইকে বিয়ে করছেন।

অর্থাৎ, এআই একটি বিশেষ্যকে ক্রিয়া হিসেবে ধরে বাক্যটির মূল অর্থই বদলে দিয়েছিল।

আইনি অনুবাদে এ ধরনের ভুলের পরিণতি গুরুতর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে যন্ত্রের মাধ্যমে অনূদিত আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনে ভুলের কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি পেতে বিলম্ব হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

চিকিৎসায় ভুল অনুবাদ জীবনঘাতী হতে পারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনুবাদের নির্ভুলতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের মাত্রা, রক্ত পরীক্ষার ফল কিংবা চিকিৎসাসংক্রান্ত নির্দেশনায় একটি প্রতীক বা এককের ভুলও রোগীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

চিকিৎসাবিষয়ক অনুবাদ বিশেষজ্ঞ ক্যারল বেরেউটার এমন একটি স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে গ্রিক বর্ণ ‘μ’ বা মাইক্রোকে ‘মিলি’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছিল।

মিলি মানে এক হাজার ভাগের এক ভাগ, আর মাইক্রো মানে দশ লাখ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ, কোনো রোগীকে এক মাইক্রোগ্রামের পরিবর্তে এক মিলিগ্রাম দেওয়া হলে তিনি নির্ধারিত মাত্রার এক হাজার গুণ ওষুধ পেতে পারেন।

এ ধরনের ভুল শনাক্ত করাও এখন কঠিন হয়ে উঠছে বলে মনে করেন বেরেউটার। আগে গুগল ট্রান্সলেটের মতো ব্যবস্থায় ভুল অনুবাদ প্রায়ই ব্যাকরণগত ত্রুটি কিংবা অস্বাভাবিক বাক্যগঠনের কারণে চোখে পড়ত। কিন্তু আধুনিক এআইয়ের লেখা অনেকটা সাবলীল। ফলে ভুল থাকলেও তা সহজে ধরা পড়ে না।

ফ্রাঁসোয়া ইভোঁ সতর্ক করে বলেন, কোনও অনুবাদে নিজের স্বাক্ষর দিতে হলে সুনামের ঝুঁকি থাকে। আর সেই অনুবাদের ভিত্তিতে চিকিৎসা, চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা বড় কোনও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

প্রসঙ্গ না বুঝলে এআই ভুল করবেই অনুবাদে শুধু শব্দের অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়; বাক্যটি কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়েছে, তা বোঝাও জরুরি।

ইভোঁর মতে, একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকলে মানুষ সাধারণত প্রসঙ্গ দেখে সঠিক অর্থটি বুঝতে পারে। কিন্তু যন্ত্রের ক্ষেত্রে একই নিশ্চয়তা নেই। যেমন, ‘পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করো’ নির্দেশনাটিকে কোনও এআই ব্যবস্থা ভুলভাবে জুতার পালিশসংক্রান্ত নির্দেশনা হিসেবেও ধরে নিতে পারে।

একইভাবে, ফুটবল ম্যাচের প্রসঙ্গ না বুঝলে ‘টেকিং আ কর্নার’ কথাটিকে ভুল অনুবাদ করার আশঙ্কা রয়েছে। ফুটবলে এর অর্থ কর্নার কিক নেওয়া; কিন্তু সাধারণ প্রসঙ্গে শব্দগুলোর অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।

এ ধরনের সমস্যা কতটা গুরুতর, তা যাচাই করতে গত বছর উইকিমিডিয়ার অর্থায়নে একটি গবেষণা চালায় ওকেএ। এতে ১০টি ভাষার ১১৯টি নিবন্ধ বিশ্লেষণ করা হয় এবং অনুবাদকেরা এক হাজার ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করেন।

জিমারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশের আগে এআইয়ের তৈরি লেখার ২৭ শতাংশ সংশোধন করতে হয়েছিল। এসব সংশোধনের তিন-চতুর্থাংশ ছিল এআইয়ের তৈরি ভুলের কারণে। আর ৫ থেকে ৬ শতাংশ ভুল মূল লেখার অর্থই বদলে দিয়েছিল।

এআই দিয়ে কি শতভাগ নির্ভুল অনুবাদ সম্ভব? ইভোঁর মতে, বর্তমান এআই ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতি বিবেচনায় অনুবাদকে শতভাগ নির্ভরযোগ্য করে তোলা কঠিন। কারণ, এসব ব্যবস্থা সম্ভাবনার ভিত্তিতে শব্দ ও বাক্য নির্বাচন করে। কোনও অনুবাদ সম্ভাব্যভাবে সঠিক হলেই যে সেটি নিশ্চিতভাবে সঠিক, তা নয়। ভাষার সূক্ষ্মতা, বাগধারা ও প্রসঙ্গের কারণে এই ব্যবধান থেকেই যায়।

তবে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে বলে আশা করছেন তিনি। নতুন প্রজন্মের অনুবাদব্যবস্থায় একাধিক এআই একসঙ্গে কাজ করতে পারে—একটি অনুবাদ তৈরি করবে, দ্বিতীয়টি সেই অনুবাদের ভুল খুঁজবে এবং তৃতীয়টি সংশোধিত সংস্করণ তৈরি করবে।

কিন্তু ইভোঁর মতে, প্রকৃত অগ্রগতি আসবে তখনই, যখন এআই শুধু অনুবাদ করেই থামবে না; বরং কোন জায়গায় সে নিশ্চিত নয়, সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে পারবে।

সবশেষে বলা যায়, চিকিৎসা, আইন, গবেষণা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথির ক্ষেত্রে মানুষের যাচাই এখনও অপরিহার্য। ভবিষ্যতে অনুবাদকের ভূমিকা হয়তো খসড়া তৈরি করা থেকে সরে গিয়ে যাচাই, সম্পাদনা ও অর্থের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার দিকে বেশি ঝুঁকবে। 

এআই কতটা সাবলীলভাবে অনুবাদ করতে পারে, তার পাশাপাশি নিজের ভুল ও অনিশ্চয়তা কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে পারে- শেষ পর্যন্ত সেটিই নির্ধারণ করবে অনুবাদে মানুষের প্রয়োজন কত দিন থাকবে। সূত্র: বিবিসি

বিডি প্রতিদিন/একেএ


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত