ঢাকা    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: নবীজির জীবন থেকে ৪ শিক্ষা



মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: নবীজির জীবন থেকে ৪ শিক্ষা
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: নবীজির জীবন থেকে ৪ শিক্ষা

আধুনিক করপোরেট ও প্রশাসনিক বিজ্ঞানে ‘মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ একটি অত্যন্ত চর্চিত বিষয়। হাজার বছর আগ মহানবী (সা.) সভ্যতা বস্তুতাত্ত্বিক অবকাঠামো গড়ে তোলার চেয়ে মানবোন্নয়ন, চরিত্র গঠন এবং মানুষের আত্মিক ও মানসিক বিকাশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

কোরআনে মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন।” (সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৭–৮)

আধুনিক ব্যবস্থাপনাবিজ্ঞানে মানবসম্পদ বলতে একটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেধা অন্বেষণ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করাকে বোঝায়।

তবে নবীজির জীবন ও নীতিতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার যে রূপরেখা পাওয়া যায়, তা শুধু যান্ত্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ন্যায়বিচার, সহানুভূতি ও মানব মর্যাদার এক চিরন্তন ভিত্তি। (মাসউদ সাবরি, ইদারাতুল মাওয়ারিদিল বাশারিয়্যা ফিস-সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা: দিরাসাতুন তাসিলিয়্যা, ১/ ১৫–২৫, দারুল ফিকর, কায়রো, ২০২৪)

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ও প্রধান শর্ত হলো প্রতিটি মানুষের কাজের প্রকৃতি, মানসিক গঠন ও দক্ষতার ভিন্নতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা। সমসাময়িক প্রশাসনিক নীতিতে সব কর্মীর সক্ষমতা এক সমান হতে পারে না। কোরআনে বৈচিত্র্যের এই স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মটি তুলে ধরে বলা হয়েছে, “তারা সবাই সমান নয়।” (সুরা আল ইমরান, আয়াত: ১১৩)

আরও বলা হয়েছে, “আর তোমার প্রতিপালক যদি চাইতেন তবে সব মানুষকে এক উম্মত বানিয়ে দিতেন, কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।” (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৮)

নবীজির প্রশাসনিক পরিচালনায় ব্যক্তিবৈচিত্র্যের এই সত্যকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হতো। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো আজানের সূচনা পর্ব।

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ (রা.) স্বপ্নে আজানের শব্দাবলি শেখার পর নবীজির কাছে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। কিন্তু নবীজি তাঁকে আজান দেওয়ার নির্বাহী পদে বসাননি; বরং তিনি নির্দেশ দেন আবদুল্লাহ যেন শব্দগুলো বিলালকে শিখিয়ে দেন, কারণ বিলালের কণ্ঠস্বর ছিল অধিক সুমধুর ও উচ্চতর। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯)

এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে আইডিয়া বা ভাবনার জন্মদাতা হওয়াই বাস্তবায়নের একমাত্র যোগ্যতা নয়; বরং বাস্তবায়নের জন্য যার শারীরিক ও কারিগরি দক্ষতা সবচেয়ে বেশি, তাকেই সেই পদে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

একইভাবে সাহাবি আবু জর গিফারিকে তিনি প্রশাসনিক শাসনকার্য বা পরিচালনার দায়িত্ব দেননি, যদিও তাঁতে তিনি খুবই ভালোবাসতেন।

তিনি আবু জরকে জড়িয়ে ধরে প্রজ্ঞার সঙ্গে বলেন, “হে আবু জর, আমি তোমাকে দুর্বল দেখছি এবং আমি তোমার জন্য তা-ই পছন্দ করি যা নিজের জন্য করি। তুমি কখনো দুজন লোকের ওপরও নেতৃত্ব দিয়ো না এবং এতিমের মালের অভিভাবক হয়ো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)

এই সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায় যে নেতৃত্ব বা পদ প্রদান শুধু আবেগ বা সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়; বরং প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে হওয়া আবশ্যিক। আবার কাউকে কোনো পদের অযোগ্য মনে হলে তাকে সুন্দর ভাষায় যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেওয়াও একজন দক্ষ ম্যানেজারের প্রধান গুণ।

২. মেধা অন্বেষণে দলনেতার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ

দক্ষ ও সফল মানবসম্পদ গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হলো কর্মীদের কাছাকাছি থাকা এবং অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে পর্যবেক্ষণ করা।

মহানবী (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটাতেন, তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন। জোহরের কিংবা ফজরের নামাজের পর তিনি সাহাবিদের মুখোমুখি বসতেন এবং তাঁদের জাহেলি আমলের স্মৃতি বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গল্প শুনে হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানাতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০)

এই নিবিড় যোগাযোগের ফলেই তিনি প্রতিটি সাহাবির মানসিকতা ও স্বতন্ত্র মেধা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।

তিনি সাহাবিদের অর্জিত দক্ষতা ও পারদর্শিতা মূল্যায়ন করে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে হুকুম-আহকাম ও বিচারে সবচেয়ে দক্ষ আলী, হালাল-হারামের জ্ঞানে সেরা মুআজ ইবনে জাবল, ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার শাস্ত্রে সবচেয়ে পারদর্শী জায়েদ ইবনে সাবিত, কোরআন পাঠে সেরা উবাই ইবনে কাব এবং এই উম্মতের পরম আমানতদার হলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৯১)

এই ব্যবস্থাপনায় চিহ্নিত এই মেধা অন্বেষণই পরবর্তী সময়ে ইসলামি রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে অটুট রেখেছিল।

৩. উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত ব্যক্তি

প্রশাসনিক পরিভাষায় বহুল ব্যবহৃত একটি নীতি হলো ‘সঠিক স্থানে সঠিক ব্যক্তি নিয়োগ’। কোরআনে নিয়োগের জন্য দুটি প্রধান মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যোগ্যতা বা দক্ষতা এবং আমানতদারি। নবী শোআইবের কন্যার জবানিতে বলা হয়েছে, “হে আমার পিতা, আপনি তাঁকে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬) 

ইউসুফ (আ.) যখন মিসরের রাষ্ট্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব চান, তখন তিনিও তাঁর দুটি মৌলিক যোগ্যতা তুলে ধরেছিলেন, “আমাকে ভূমির ধনভাণ্ডারের ওপর দায়িত্ব দিন; আমি তো উত্তম রক্ষক ও অভিজ্ঞ।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫)

মহানবী (সা.) সাহাবিদের যাঁর যাঁর বিশেষজ্ঞতা অনুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তিনি কোরআন শেখার জন্য সুনির্দিষ্ট চারজন সাহাবির নাম উল্লেখ করে নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তোমরা চারজন থেকে কোরআন গ্রহণ করো: আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, সালিম, মুআজ এবং উবাই ইবনে কাব।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৫৮)

সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তরুণ হওয়া সত্ত্বেও যোগ্যতার বিচারে তিনি ওসামা ইবনে জায়েদকে বিশাল বাহিনীর সেনাপতি পদে মনোনীত করেছিলেন। আবার রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংরক্ষণে হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) এবং হিব্রু ও সুরিয়ানি ভাষা শেখার জন্য জায়েদ ইবনে সাবিতকে নির্বাচন করেছিলেন।

৪. কাজের গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো কর্মীদের ক্রমাগত প্রশিক্ষণ ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ। আধুনিক আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ডের যে মূলকথা, তা নবীজির হাদিসে চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ–তাআলা পছন্দ করেন যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা নিখুঁত ও নিপুণভাবে (ইতকান) সম্পাদন করে।” (সিলসিলাতু আহাদিসিস সাহিহা: হাদিস: ১১১৩) 

মহানবী (সা.) শুধু মৌখিক নীতিবাক্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতেন। নামাজ, ওজু ও হজের বিস্তারিত আচার-অনুষ্ঠান তিনি সাহাবিদের সশরীরে শিখিয়েছেন। নিঃস্ব মানুষকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শী ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ ফুটে ওঠে আনসারী এক সাহাবির ঘটনায়।

এক দরিদ্র সাহাবি সাহায্যের জন্য এলে মহানবী (সা.) তাঁর ঘরে থাকা একটি কম্বল ও পানির পাত্র নিলামে বিক্রি করে দুই দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) সংগ্রহ করেন। এক দিরহাম দিয়ে পরিবারকে খাবার কিনে দিতে বলেন এবং অপর দিরহাম দিয়ে একটি কুড়াল কিনে আনতে নির্দেশ দেন।

এরপর তিনি নিজ হাতে কুড়ালে কাঠের হাতল লাগিয়ে দিয়ে বলেন, “যাও, বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো এবং ১৫ দিন আমার সামনে আসবে না।” ১৫ দিন পর ওই সাহাবি ১০ দিরহাম উপার্জন করে ফেরত আসেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৪১)

এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে কীভাবে একজন বেকার মানুষকে তাৎক্ষণিক অনুদান না দিয়ে প্রশিক্ষণ ও কৌশলের মাধ্যমে একজন উৎপাদনশীল উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা যায়।

নবীজির জীবন ও নীতি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো যদি যান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে সুন্নতের এই মানবিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতিগুলো বাস্তবায়ন করে, তবে কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজের গতিই বাড়বে না, বরং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে পরম ন্যায়বিচার, সততা ও সুশাসন।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা: নবীজির জীবন থেকে ৪ শিক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আধুনিক করপোরেট ও প্রশাসনিক বিজ্ঞানে ‘মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ একটি অত্যন্ত চর্চিত বিষয়। হাজার বছর আগ মহানবী (সা.) সভ্যতা বস্তুতাত্ত্বিক অবকাঠামো গড়ে তোলার চেয়ে মানবোন্নয়ন, চরিত্র গঠন এবং মানুষের আত্মিক ও মানসিক বিকাশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।

কোরআনে মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন।” (সুরা ইনফিতার, আয়াত: ৭–৮)

আধুনিক ব্যবস্থাপনাবিজ্ঞানে মানবসম্পদ বলতে একটি প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, মেধা অন্বেষণ, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করাকে বোঝায়।

তবে নবীজির জীবন ও নীতিতে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার যে রূপরেখা পাওয়া যায়, তা শুধু যান্ত্রিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা ন্যায়বিচার, সহানুভূতি ও মানব মর্যাদার এক চিরন্তন ভিত্তি। (মাসউদ সাবরি, ইদারাতুল মাওয়ারিদিল বাশারিয়্যা ফিস-সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা: দিরাসাতুন তাসিলিয়্যা, ১/ ১৫–২৫, দারুল ফিকর, কায়রো, ২০২৪)

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক ও প্রধান শর্ত হলো প্রতিটি মানুষের কাজের প্রকৃতি, মানসিক গঠন ও দক্ষতার ভিন্নতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা। সমসাময়িক প্রশাসনিক নীতিতে সব কর্মীর সক্ষমতা এক সমান হতে পারে না। কোরআনে বৈচিত্র্যের এই স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মটি তুলে ধরে বলা হয়েছে, “তারা সবাই সমান নয়।” (সুরা আল ইমরান, আয়াত: ১১৩)

আরও বলা হয়েছে, “আর তোমার প্রতিপালক যদি চাইতেন তবে সব মানুষকে এক উম্মত বানিয়ে দিতেন, কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।” (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৮)

নবীজির প্রশাসনিক পরিচালনায় ব্যক্তিবৈচিত্র্যের এই সত্যকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হতো। এর একটি দৃষ্টান্ত হলো আজানের সূচনা পর্ব।

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ (রা.) স্বপ্নে আজানের শব্দাবলি শেখার পর নবীজির কাছে উপস্থিত হয়ে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। কিন্তু নবীজি তাঁকে আজান দেওয়ার নির্বাহী পদে বসাননি; বরং তিনি নির্দেশ দেন আবদুল্লাহ যেন শব্দগুলো বিলালকে শিখিয়ে দেন, কারণ বিলালের কণ্ঠস্বর ছিল অধিক সুমধুর ও উচ্চতর। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৯)

এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে আইডিয়া বা ভাবনার জন্মদাতা হওয়াই বাস্তবায়নের একমাত্র যোগ্যতা নয়; বরং বাস্তবায়নের জন্য যার শারীরিক ও কারিগরি দক্ষতা সবচেয়ে বেশি, তাকেই সেই পদে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।

একইভাবে সাহাবি আবু জর গিফারিকে তিনি প্রশাসনিক শাসনকার্য বা পরিচালনার দায়িত্ব দেননি, যদিও তাঁতে তিনি খুবই ভালোবাসতেন।

তিনি আবু জরকে জড়িয়ে ধরে প্রজ্ঞার সঙ্গে বলেন, “হে আবু জর, আমি তোমাকে দুর্বল দেখছি এবং আমি তোমার জন্য তা-ই পছন্দ করি যা নিজের জন্য করি। তুমি কখনো দুজন লোকের ওপরও নেতৃত্ব দিয়ো না এবং এতিমের মালের অভিভাবক হয়ো না।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৫)

এই সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায় যে নেতৃত্ব বা পদ প্রদান শুধু আবেগ বা সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত নয়; বরং প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে হওয়া আবশ্যিক। আবার কাউকে কোনো পদের অযোগ্য মনে হলে তাকে সুন্দর ভাষায় যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দেওয়াও একজন দক্ষ ম্যানেজারের প্রধান গুণ।

২. মেধা অন্বেষণে দলনেতার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ

দক্ষ ও সফল মানবসম্পদ গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হলো কর্মীদের কাছাকাছি থাকা এবং অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে পর্যবেক্ষণ করা।

মহানবী (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটাতেন, তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শুনতেন। জোহরের কিংবা ফজরের নামাজের পর তিনি সাহাবিদের মুখোমুখি বসতেন এবং তাঁদের জাহেলি আমলের স্মৃতি বা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গল্প শুনে হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানাতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০)

এই নিবিড় যোগাযোগের ফলেই তিনি প্রতিটি সাহাবির মানসিকতা ও স্বতন্ত্র মেধা শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।

তিনি সাহাবিদের অর্জিত দক্ষতা ও পারদর্শিতা মূল্যায়ন করে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, “আমার উম্মতের মধ্যে হুকুম-আহকাম ও বিচারে সবচেয়ে দক্ষ আলী, হালাল-হারামের জ্ঞানে সেরা মুআজ ইবনে জাবল, ফারায়েজ বা উত্তরাধিকার শাস্ত্রে সবচেয়ে পারদর্শী জায়েদ ইবনে সাবিত, কোরআন পাঠে সেরা উবাই ইবনে কাব এবং এই উম্মতের পরম আমানতদার হলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৯১)

এই ব্যবস্থাপনায় চিহ্নিত এই মেধা অন্বেষণই পরবর্তী সময়ে ইসলামি রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে অটুট রেখেছিল।

৩. উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত ব্যক্তি

প্রশাসনিক পরিভাষায় বহুল ব্যবহৃত একটি নীতি হলো ‘সঠিক স্থানে সঠিক ব্যক্তি নিয়োগ’। কোরআনে নিয়োগের জন্য দুটি প্রধান মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, যোগ্যতা বা দক্ষতা এবং আমানতদারি। নবী শোআইবের কন্যার জবানিতে বলা হয়েছে, “হে আমার পিতা, আপনি তাঁকে মজুর নিযুক্ত করুন, কারণ আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।” (সুরা কাসাস, আয়াত: ২৬) 

ইউসুফ (আ.) যখন মিসরের রাষ্ট্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব চান, তখন তিনিও তাঁর দুটি মৌলিক যোগ্যতা তুলে ধরেছিলেন, “আমাকে ভূমির ধনভাণ্ডারের ওপর দায়িত্ব দিন; আমি তো উত্তম রক্ষক ও অভিজ্ঞ।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৫)

মহানবী (সা.) সাহাবিদের যাঁর যাঁর বিশেষজ্ঞতা অনুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ করতেন। তিনি কোরআন শেখার জন্য সুনির্দিষ্ট চারজন সাহাবির নাম উল্লেখ করে নির্দেশ দিয়েছিলেন, “তোমরা চারজন থেকে কোরআন গ্রহণ করো: আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, সালিম, মুআজ এবং উবাই ইবনে কাব।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৫৮)

সামরিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তরুণ হওয়া সত্ত্বেও যোগ্যতার বিচারে তিনি ওসামা ইবনে জায়েদকে বিশাল বাহিনীর সেনাপতি পদে মনোনীত করেছিলেন। আবার রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংরক্ষণে হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) এবং হিব্রু ও সুরিয়ানি ভাষা শেখার জন্য জায়েদ ইবনে সাবিতকে নির্বাচন করেছিলেন।

৪. কাজের গুণগত মান বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো কর্মীদের ক্রমাগত প্রশিক্ষণ ও কাজের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ। আধুনিক আন্তর্জাতিক কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ডের যে মূলকথা, তা নবীজির হাদিসে চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ–তাআলা পছন্দ করেন যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, সে যেন তা নিখুঁত ও নিপুণভাবে (ইতকান) সম্পাদন করে।” (সিলসিলাতু আহাদিসিস সাহিহা: হাদিস: ১১১৩) 

মহানবী (সা.) শুধু মৌখিক নীতিবাক্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিতেন। নামাজ, ওজু ও হজের বিস্তারিত আচার-অনুষ্ঠান তিনি সাহাবিদের সশরীরে শিখিয়েছেন। নিঃস্ব মানুষকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শী ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ ফুটে ওঠে আনসারী এক সাহাবির ঘটনায়।

এক দরিদ্র সাহাবি সাহায্যের জন্য এলে মহানবী (সা.) তাঁর ঘরে থাকা একটি কম্বল ও পানির পাত্র নিলামে বিক্রি করে দুই দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) সংগ্রহ করেন। এক দিরহাম দিয়ে পরিবারকে খাবার কিনে দিতে বলেন এবং অপর দিরহাম দিয়ে একটি কুড়াল কিনে আনতে নির্দেশ দেন।

এরপর তিনি নিজ হাতে কুড়ালে কাঠের হাতল লাগিয়ে দিয়ে বলেন, “যাও, বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করো এবং ১৫ দিন আমার সামনে আসবে না।” ১৫ দিন পর ওই সাহাবি ১০ দিরহাম উপার্জন করে ফেরত আসেন। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১৬৪১)

এই দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে কীভাবে একজন বেকার মানুষকে তাৎক্ষণিক অনুদান না দিয়ে প্রশিক্ষণ ও কৌশলের মাধ্যমে একজন উৎপাদনশীল উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা যায়।

নবীজির জীবন ও নীতি বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ও বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো যদি যান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হয়ে সুন্নতের এই মানবিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতিগুলো বাস্তবায়ন করে, তবে কর্মক্ষেত্রে শুধু কাজের গতিই বাড়বে না, বরং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে পরম ন্যায়বিচার, সততা ও সুশাসন।


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত