রাশিয়ার পর বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী দেশ চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া ইতোমধ্যে পাবনার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। চীন আগ্রহ দেখিয়েছে নতুন কেন্দ্র নির্মাণে। অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতার সমঝোতা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সহজলভ্য বাজার, কম খরচের জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্ক; এসব কারণে তাদের আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর ৯০ শতাংশ অর্থায়নের জন্য রাশিয়া ঋণের ব্যবস্থা করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবসা শুধু নির্মাণকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্র চালু হওয়ার পর দীর্ঘদিন জ্বালানি সরবরাহ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হয়। ফলে রূপপুরের মাধ্যমে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে এ খাতে রাশিয়ার প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
অপরদিকে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে চীন আগ্রহ দেখিয়েছে। বাগেরহাটের মোংলায় প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। গত আগস্টে এক যৌথ সভায় চীন এই প্রস্তাব দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে স্মল মডুলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের প্রথম কোনও প্রকল্প। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মূলত ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। আর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করা হবে বাংলাদেশের কাছে, যা যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে।
স্মল মডুলার রিয়্যাক্টর বা এসএমআর হলো এমন এক ধরনের প্রযুক্তি, যা প্রথাগত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় আকারে ছোট। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সম্প্রতি জানান, বাংলাদেশ এসএমআর প্রযুক্তি খতিয়ে দেখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং একাধিক দেশের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি বলেন, ‘এসএমআর প্রযুক্তি সম্পর্কে আমাদের আরও বিস্তারিত জানতে হবে। এই প্রযুক্তিতে আমাদের আগ্রহ আছে। তবে বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝার পরই আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো।’’
এদিকে গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ ও কোম্পানিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এ সমঝোতাটি সরাসরি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি নয়। সমঝোতা স্মারকে দুই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে পারমাণবিক শক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা দুই দেশই স্বীকার করে। বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানের পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সেফগার্ডস এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের নীতি অনুসরণ করা হবে। সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশেরই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সেফগার্ডস চুক্তি ও অতিরিক্ত প্রটোকল কার্যকর রয়েছে। একইসঙ্গে দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ-সংক্রান্ত চুক্তি (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী দেশ। ১৯৬৮ সালের ১ জুলাই এনপিটি স্বাক্ষরিত হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই দেশের আগ্রহের কারণ হচ্ছে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দিক। আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা আছে, আমরা কম খরচে বিদ্যুৎ চাই। আর আমরা জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা চিন্তা করি না। উদাহরণ হিসেবে আমরা রূপপুরকেই বলতে পারি। ঝুঁকি সত্ত্বেও আমরা এত বড় একটা কেন্দ্র করেছি।’
তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্কও সহজ হয়। আমাদের মতো এশিয়ার দেশগুলোতে এর বাজারও ভালো। ফলে বাজারজাত করার জন্য আমরা সহজলভ্য দেশ।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, ‘বিশ্বের পরাশক্তিরা আমাদের দেশের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। তারা আসলে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা চায় আমরা তাদের নিয়ন্ত্রণে পরমাণু ব্যবহার করি। এখানে যুদ্ধ একটা বড় ইস্যু।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ছোট দেশ হলেও এই তিন পরাশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের প্রতি দেশগুলোর আগ্রহ অনেক।’
এখন পর্যন্ত রাশিয়া রূপপুর প্রকল্প নির্মাণ করছে, চীন নতুন কেন্দ্র নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়েছে। যদিও তিন দেশের অবস্থান এক নয়। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি দেশগুলোর এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কিনা, সেটাই দেখা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
মতামত