দেশে দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৪ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এতে সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শ্রমমান, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা ও সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতার গুরুত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকি মোকাবিলায় দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাণিজ্য সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং শ্রম, শিল্প, অর্থ, আইন ও বিচার, পরিবেশ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং প্রবাসীকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। এ ছাড়া বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এসএমই ফাউন্ডেশন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গুরুত্ব
গত ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা সরকারি আদেশ অনুযায়ী, নির্দেশিকা প্রণয়নে ব্যবসা ও মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের নির্দেশক নীতি, বহুজাতিক উদ্যোগের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) নির্দেশিকা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মৌলিক শ্রমমান বিবেচনায় নেওয়া হবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) করপোরেট টেকসই উন্নয়নসংক্রান্ত যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের বিধিমালা এবং পরিবেশ, সামাজিক বিষয় ও সুশাসনসংক্রান্ত (ইএসজি) নীতিমালাও গুরুত্ব পাবে।
এসব নীতিমালার লক্ষ্য হলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন, শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া এবং পরিবেশের ক্ষতিকর প্রভাব শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা। একই সঙ্গে সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করা। তবে নির্দেশিকাটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা বাধ্যতামূলক হবে, বাস্তবায়ন কীভাবে তদারক করা হবে এবং নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে এর চূড়ান্ত বিধান ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ার ওপর।
রপ্তানিতে বাড়ছে কমপ্লায়েন্সের গুরুত্ব
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। এ ছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, বস্ত্রসহ অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাতও আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এসব খাতে শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, পরিবেশগত প্রভাব ও সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে ক্রেতাদের প্রত্যাশা বাড়ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতারা সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের ঝুঁকি মূল্যায়নে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে সরবরাহকারীদের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, পরিবেশের ওপর ব্যবসার প্রভাব এবং করপোরেট জবাবদিহি সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য দিতে হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্দেশিকা রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রত্যাশা বুঝতে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষা, পরিবেশগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা বাড়িয়ে রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত তথ্য সংরক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিবেদন তৈরির প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন ব্যয় ও কারিগরি সক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বাস্তবায়নে সমন্বয়ই চ্যালেঞ্জ
কমিটিতে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করছে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), আইএলও, জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (আঙ্কটাড)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-২ শাখার যুগ্মসচিব কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্দেশিকা প্রণয়নের পাশাপাশি কমিটি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম তদারক এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগও রয়েছে। জাতীয় কাঠামো কার্যকর করতে বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নীতিমালার সামঞ্জস্য নিরূপণ, সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক নীতিমালাকে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানদণ্ডে রূপান্তর এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নই হবে এ উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ।
মতামত