সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি। হারানো অর্থ আবার উপার্জন করা সম্ভব, কিন্তু চলে যাওয়া সময় ফিরিয়ে আনা যায় না। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় আমরা অনেক কিছু অর্জনের চেষ্টা করি, অথচ জীবনের প্রকৃত সাফল্য কী সেই প্রশ্নটি অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।
পবিত্র কোরআনের ১০৩ নম্বর সূরা আল-আসর মানুষের জীবন, সময় ও সাফল্য সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর শিক্ষা দেয়। মাত্র তিন আয়াতের এই সূরায় আল্লাহ মানুষের ক্ষতির কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি সেই ক্ষতি থেকে মুক্তির চারটি মূলনীতি তুলে ধরেছেন।
সূরা আসরে কী বলা হয়েছে? আল্লাহ বলেন, وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ অর্থ: ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ —সূরা আল-আসর, আয়াত ১–৩।
এই সূরায় ক্ষতি থেকে মুক্তির জন্য চারটি গুণের কথা বলা হয়েছে।
১. ঈমান: জীবনের ভিত্তি সূরায় প্রথমেই এসেছে ঈমানের কথা। ইসলামে ঈমান শুধু মুখে বিশ্বাসের কথা বলা নয়, বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মুমিনের সিদ্ধান্ত, আচরণ ও মূল্যবোধে ঈমানের প্রভাব থাকার কথা। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করার চেষ্টা ঈমানের বাস্তব প্রকাশ।
২. সৎকাজ: বিশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন ঈমানের পরেই এসেছে সৎকাজের কথা। অর্থাৎ বিশ্বাসের পাশাপাশি কাজেও তার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
নামাজ আদায়, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার, অসহায়কে সাহায্য করা, অন্যের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা এসব সৎকাজের উদাহরণ। শুধু নিজের ইবাদত নয়, মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণও একজন মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।
৩. সত্যের উপদেশ দেওয়া সূরা আসরের তৃতীয় মূলনীতি হলো, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেওয়া। অর্থাৎ নিজে সত্যের পথে চলার পাশাপাশি অন্যকেও ভালো ও সত্যের পথে উৎসাহিত করা। তবে কাউকে সংশোধন করতে গিয়ে অপমান করা বা কঠোর আচরণ করা উচিত নয়। সুন্দর ভাষা, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সত্য তুলে ধরলে তা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সুযোগ বাড়ে।
৪. ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া জীবনে সঠিক পথে থাকা সব সময় সহজ হয় না। কখনো বিপদ আসে, কখনো প্রলোভন সামনে আসে, আবার কখনো ভালো কাজ করতে গিয়ে বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
এ কারণে সূরা আসরে ধৈর্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামে ধৈর্য মানে শুধু কষ্ট সহ্য করা নয়; বরং বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং ভালো কাজের পথে অবিচল থাকার চেষ্টাও এর অন্তর্ভুক্ত।
সূরা আসরের শিক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সূরা আসর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সাফল্য শুধু অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। ঈমান, সৎকাজ, সত্যের প্রতি অঙ্গীকার এবং ধৈর্য এই চারটি গুণ একজন মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারে।
তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে প্রশ্ন করা যায় আমার ঈমান কি আমার কাজে প্রতিফলিত হচ্ছে? আমি কি সৎকাজ করছি? সত্যের পক্ষে থাকছি? কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে সঠিক পথে চলার চেষ্টা করছি?
সূরা আসরের মূল শিক্ষা হলো সময়কে কাজে লাগিয়ে ঈমান, সৎকাজ, সত্য ও ধৈর্যের সমন্বয়ে জীবন গড়ে তোলাই প্রকৃত সাফল্যের পথ।