শেয়ারবাজারে যাঁরা বিনিয়োগ করেন, তাঁরা একটি বিষয় খুব ভালো জানেন, সবচেয়ে বেশি মুনাফা আসে সেই খাত থেকে, যা এখনো কম মূল্যায়িত, অথচ ভবিষ্যতে যার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতির এই সূত্রই আমি প্রায়ই আমার কারিগরি শিক্ষার্থীদের একটু অন্যভাবে বোঝাই। বলি, তোমরাই এখন এমন এক সম্পদ, যার মূল্য ভবিষ্যতে অনেক বাড়বে, অথচ বর্তমানের বাজার এখনো সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা আজ ঠিক এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এটি এখনো অনেকটাই অবমূল্যায়িত, কিন্তু এর সম্ভাবনা অসাধারণ। এখানে বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে বহুগুণে ফিরে আসতে পারে। তাই প্রশ্নটি এখন আর কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কত দ্রুত এবং কতটা পরিকল্পিতভাবে এই বিনিয়োগ বাড়াতে পারব।
প্রথম পাঠ, বিনিয়োগের প্রতিদানের হিসাব—
বিনিয়োগের ভাষায় একটি শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগের প্রতিদান। একজন বিদেশগামী শ্রমিক যখন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত সনদ ছাড়া বিদেশে যান, তখন তিনি সাধারণত স্বল্প দক্ষ বা আধা দক্ষ শ্রমিকের কাতারেই থাকেন। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশগামী বাংলাদেশিদের প্রায় ৪৩ শতাংশ স্বল্প দক্ষ এবং ৩৪ শতাংশ আধা দক্ষ। অর্থাৎ প্রতি দশজনের মধ্যে প্রায় সাতজন এমন দক্ষতা নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন, যা আরও উন্নত প্রশিক্ষণ ও সনদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বেশি মূল্য পেতে পারত।
এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের সুযোগ। একজন শ্রমিককে দক্ষ করে তুলতে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার তুলনায় দক্ষতা অর্জনের পর তার আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক বেশি। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রবাসী আয় গ্রহণকারী দেশ। বার্ষিক রেমিট্যান্সও ৩০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এই বিশাল অর্থের বড় একটি অংশ আসে আমাদের শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও পরিশ্রম থেকে।এখন যদি একই মানুষকে আরও উন্নত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদ দিয়ে বিদেশে পাঠানো যায়, তাহলে মানুষের সংখ্যা না বাড়িয়েও আয়ের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। একই শ্রম, কিন্তু তার মূল্য কয়েক গুণ বেশি। বিনিয়োগের ভাষায় এর চেয়ে কার্যকর প্রতিদানের উদাহরণ আর কী হতে পারে?
দ্বিতীয় পাঠ, ফাঁকা আসন মানেই ফাঁকা সুযোগ—
একজন উদ্যোক্তা যখন কোনো কারখানায় বিনিয়োগের কথা ভাবেন, তখন তিনি প্রথমে দেখেন অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কারিগরি শিক্ষার জন্য ইতিমধ্যে একটি বিস্তৃত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন স্তরে প্রায় ১২ হাজার ৯৩২টি প্রতিষ্ঠানে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদিত ৩ হাজার ৪৪০টি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২১টিতে গত পাঁচ বছরে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি।
বিনিয়োগের চোখে এই তথ্যকে শুধু সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে বড় একটি সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ, নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে যে বিপুল অর্থ, সময় ও শ্রম প্রয়োজন, তার বড় অংশ ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই অবকাঠামোকে কার্যকর করে তোলা। প্রয়োজন আধুনিক ও কর্মমুখী পাঠ্যক্রম, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আস্থা তৈরি করা। একটি প্রস্তুত অবকাঠামোকে কার্যকর করে তোলা অনেক সময় নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে দ্রুত ও সাশ্রয়ী। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষায় এখন সেই সুযোগই সবচেয়ে বেশি।
তৃতীয় পাঠ, বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা—
জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বৈত প্রশিক্ষণব্যবস্থা শুধু একটি শিক্ষাপদ্ধতি নয়, এটি একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কৌশল। এসব ব্যবস্থায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার সরাসরি অংশীদার করা হয়। শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সুযোগও পান। এর ফলে শিক্ষার্থী যখন শিক্ষা শেষ করেন, তখন তিনি শুধু একটি সনদের অধিকারী থাকেন না, বরং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরির সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। সরকার একা সব দায়িত্ব নেবে, এমন ধারণার পরিবর্তে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতকে যৌথভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দায়িত্ব নিতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় এই যৌথ বিনিয়োগ যত বাড়বে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দূরত্ব তত কমবে।
চতুর্থ পাঠ, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের নতুন বাজার—
প্রযুক্তির প্রতিটি বড় পরিবর্তন নতুন বাজার সৃষ্টি করে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবও তার ব্যতিক্রম নয়। অটোমেশন, রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং স্মার্ট উৎপাদন ব্যবস্থা ইতিমধ্যে শিল্প ও সেবা খাতের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। টেক্সটাইল, নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, আতিথেয়তা এবং বিভিন্ন সেবা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কারিগরি জনবলের ঘাটতিও তৈরি হচ্ছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। আমাদের পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি সময়ের সঙ্গে পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করে, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী দক্ষতা তৈরি করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। আজ যে প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল দক্ষতা, অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করছে, তারা আসলে ভবিষ্যতের কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দিনের অর্থনীতিতে দক্ষতাই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
পঞ্চম পাঠ, সমতাভিত্তিক বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল—
একটি দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন উন্নয়নের সুযোগ শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক থাকে না। কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের পলিটেকনিক, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং কমিউনিটিভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের তরুণ, নারী এবং কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে দক্ষতার সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব হবে বহুমাত্রিক। একজন তরুণ যখন নিজের এলাকায় প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে ওঠেন, তখন শুধু তাঁর নিজের জীবন বদলায় না। তাঁর পরিবারে আয় বাড়ে, স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ তৈরি হয় এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। কেউ দেশে কাজ করবেন, কেউ উদ্যোক্তা হবেন, কেউ বিদেশে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবেন। অর্থাৎ একটি দক্ষ মানুষকে তৈরি করার বিনিয়োগের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।
শেষ কথা—
আমার শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বলি, সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ সেই বিনিয়োগ, যেখানে সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদি, চাহিদা বাস্তব এবং প্রতিদানের সুযোগ বিস্তৃত। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা আজ এমনই একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের অবকাঠামো আছে, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে চাহিদা আছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত বিনিয়োগ, আধুনিক পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
রাষ্ট্র যদি এই খাতে সাহসী ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অংশীদার হয় এবং পরিবার যদি কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ মনে না করে, তাহলে এর সুফল আসবে বহুমাত্রিকভাবে। রেমিট্যান্স বাড়বে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা, তৈরি হবে আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ একটি প্রজন্ম। কারিগরি শিক্ষা এখন আর শুধু একটি বিকল্প শিক্ষাধারা নয়। এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ক্ষেত্র। আজকের একটি দক্ষ তরুণ আগামী দিনের একটি পরিবার, একটি শিল্প এবং একটি অর্থনীতিকে বদলে দিতে পারে। তাই কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে শুধু শিক্ষায় বিনিয়োগ নয়। এর অর্থ ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিনিয়োগ।
লেখক: মো. মামুন হাসান, ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা।