বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলেই পরাক্রমশালী রাজবংশগুলোর গল্প এখন শুধুই অতীত। তবে এ রাজপরিবারগুলোর রাজত্ব টিকিয়ে রাখার সময়কাল দেখলে আপনি সত্যি অবাক হবেন। কখনো তারা একটানা ক্ষমতা ধরে রেখেছে, আবার কখনো ক্যাডেট ব্রাঞ্চ (শাখা বংশ) পুনরুদ্ধার কিংবা রক্তধারার সূত্রে বারবার ফিরে এসেছে ক্ষমতায়। প্রভাবশালী হাবসবার্গ পরিবার, ফরাসি ক্যাপেটিয়ান বংশ থেকে শুরু করে জাপানের ইমপেরিয়াল হাউস-ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এসব রাজবংশের শাসনামল নিয়ে আজকের রকমারি। লিখেছেন-আবদুল কাদের
রোমানভ রাজবংশ
‘রোমানভ’ পরিবার; ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী রাজবংশ। ১৬১৩ সালে প্রথম মাইকেল রোমানভের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে এ রাজপরিবারের সূচনা ঘটে। এ রাজপরিবার থেকে প্রায় ১৮ জন শাসক এসেছিলেন, যাঁদের মধ্যে পিটার দ্য গ্রেট, ক্যাথরিন দ্য গ্রেট, প্রথম আলেকজান্ডার এবং দ্বিতীয় নিকোলাসের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকা এ পরিবার তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে রাশিয়া শাসন করে। তবে ১৭৩০ সালে দ্বিতীয় পিটারের মৃত্যুর মাধ্যমে এ রাজপরিবারের মূল পুরুষ ধারার সমাপ্তি ঘটে। আর ১৭৬২ সালে সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ ছিলেন রোমানভ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী শেষ শাসক। তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসন যায় তাঁর ভাগ্নে, হাউস অব হোলস্টাইন-গোটর্পের তৃতীয় পিটারের হাতে। তাঁদের পরবর্তী বংশধররা ‘রোমানভ’ নামটি বজায় রাখায় তাঁরা ‘হাউস অব হোলস্টাইন-গোটর্প-রোমানভ’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এই প্রাচীন রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটায়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে শেষ সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করেন এবং পরবর্তীতে বলশেভিকদের হাতে তিনি, তাঁর স্ত্রী, পাঁচ সন্তানসহ রাজপরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নির্মমভাবে প্রাণ হারান। তবে রাজপরিবারের অনেক সদস্য রাশিয়া ছেড়ে পালাতে সক্ষম হন। ১৯২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হলে রোমানভদের পুনরুত্থানের শেষ আশাটুকুও চিরতরে মিলিয়ে যায়।
ক্যাপেটিয়ান রাজবংশ
৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ, হিউ ক্যাপেটের হাত ধরে তৎকালীন ফ্রান্স ক্যাপেটিয়ান রাজবংশের গোড়াপত্তন হয়। যা ফরাসি রাষ্ট্রের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। প্রথম দিকে এ রাজপরিবারে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত থাকলেও পরবর্তী শতকগুলোয় তাঁদের প্রভাব ইউরোপজুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল। ১৩২৮ সাল পর্যন্ত তাদের বংশের মূল শাখা একচ্ছত্রভাবে এ উত্তরাধিকার (পিতা থেকে পুত্র) বজায় রেখেছিল। তবে ‘দ্য ফেয়ার’ খ্যাত চতুর্থ চার্লস কোনো উত্তরাধিকারী (পুরুষ) ছাড়াই মারা যাওয়ায় সিংহাসন চলে যায় একই বংশের শাখা ‘ভ্যালোইস’-এর হাতে। যদিও পরবর্তীতে বার্বন ও অরলিন্স পরিবার এ বিখ্যাত ক্যাপেটিয়ান শাসন টিকিয়ে রেখেছিলেন। তৎকালীন ফরাসি বিপ্লব এবং নেপোলিয়নের শাসনের ফলে মাঝেমধ্যে এ রাজতন্ত্রের শাসন খানিকটা বাধাগ্রস্ত হলেও তাঁরা মাথা উঁচিয়ে টিকে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে এ রাজপরিবারের চিরতরে সমাপ্তি হয়। যদিও ক্যাপেটিয়ান যুগ ফরাসিদের জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, যার হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল ‘পার্লামেন্ট’, ‘এস্টেটস জেনারেল’ ও ‘বেইলি’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। ফরাসি ভূখণ্ডে রাজতন্ত্রের পতন ঘটলেও এ রাজবংশের রক্তধারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি; ক্যাপেটিয়ান বার্বন বংশের বংশধররা আজও স্পেন ও লুক্সেমবার্গের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত থেকে তাঁদের সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ ফরাসি ভূখণ্ড থেকে তাঁদের রাজতন্ত্র বা ওই রাজপরিবারের শাসনকাল অতীত হয়ে গেলেও ইউরোপের অন্য প্রান্তে তাঁদের রাজকীয় অস্তিত্ব এখনো সক্রিয়।
জোসন রাজবংশ
১৩৯২ সালে কোরিয়ার সামরিক কমান্ডার ই সং-গাই জোসন রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন। যা ছিল কোরিয়ার রাজপরিবারের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রভাবশালী শাসনকাল। গোরিও রাজবংশের পতনের পর ই সং-গাই রাজধানী হ্যানিয়াংয়ে (বর্তমান সিউল) স্থানান্তর করে এ নতুন যুগের সূচনা করেন। জোসন শাসনামলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক রূপরেখা গঠনে নব্য-কনফুসীয়বাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ই সং-গাই এবং তাঁর উত্তরসূরিরা কনফুসীয় পণ্ডিত ও কর্মকর্তাদের সহায়তায় কোরীয় সমাজকে নৈতিকতা, বিদ্যাচর্চা ও মেধার ভিত্তিতে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। এ সময় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব হ্রাস পায় এবং নব্য-কনফুসীয় দর্শন সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে সর্বাধিক প্রাধান্য পায়।
অন্যদিকে জোসন যুগ ‘নোবি’ শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্য স্মরণীয়। যদিও নোবিদের সুনির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে- এদের কাউকে দাস বলা যাবে নাকি তারা ভূমিদাস; তা নিয়ে মতভেদ আছে। তা সত্ত্বেও জোসন যুগটি ছিল কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত এক ব্যবস্থা। যেখানে রাজপরিবারের পরেই সমাজের সর্বোচ্চ স্থান দখল করে ছিল অভিজাত ‘ইয়াংবান’ সম্প্রদায়। ১৮৯৭ সালে রাজা গোজং ‘কোরিয়ান সাম্রাজ্য’ ঘোষণার মাধ্যমে কোরিয়ায় জোসন রাজ্যের সমাপ্তি টানেন। এরপরও ১৯১০ সাল পর্যন্ত একই ‘ই’ রাজপরিবার ক্ষমতায় ছিল, যতক্ষণ না জাপান কোরিয়া দখল করে সেটিকে জাপানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন বহাল ছিল।
উসমানীয় রাজবংশ
১৯২২ সালে অটোমান সুলতানি ব্যবস্থা বিলুপ্তির মাধ্যমে প্রায়৬০০ বছরের দীর্ঘ রাজকীয় শাসনের অবসান ঘটে ঐতিহাসিকভাবে ১২৯৯ সালে আনাতোলিয়ায় প্রথম উসমান-উসমানীয় রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করেন। তা পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। একে একে তিন মহাদেশ-দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে বিস্তৃত হয়ে এ রাজবংশ বিশ্ব রাজনীতি ও সংস্কৃতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। ১৪৫৩ সালে তরুণ সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ যখন প্রাচীন বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করেন, তখন শুধু একটি নগরীর পতন ঘটেনি, বরং উসমানীয়দের এক নতুন বিশ্ব শক্তিরূপে উত্থান ঘটেছিল। আর এ শহরটি উসমানীয়দের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পায়। সুলেমানের মতো শাসকদের আমলে উসমানীয় রাজবংশ তার ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়; হাঙ্গেরি, বলকান অঞ্চল, মিসর, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৬০০ শতাব্দীতে মামলুকদের পরাজিত করে উসমানীয় শাসকরা ‘খলিফা’ উপাধিও দাবি করেন, যদিও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কালে কালে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। বৈদেশিক যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ভূখণ্ড হারানো এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকট ও চাপের মুখে এ সাম্রাজ্যের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ে তাদের পতন হয় এবং ১৯২২ সালে তাদের সুলতানি বিলুপ্ত হয়।
শলোমনি রাজবংশ
১২৭০ খ্রিস্টাব্দে ইয়েকুনো আমলাক জাগওয়ে রাজবংশকে উৎখাত করে শলোমনি রাজবংশের পত্তন করেন। এই বংশ কয়েক শতাব্দী ধরে বর্তমান ইথিওপিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল এবং বিভিন্ন সময়ে আধুনিক ইরিত্রিয়ার কিছু অংশ জুড়ে সার্বভৌম শাসন পরিচালনা করেছে। বাইবেলে উল্লিখিত বিখ্যাত রাজা শলোমন এবং শেবার রানির সন্তান প্রথম মেনেলিকের উত্তরসূরি হিসেবেই এ রাজবংশের শাসকরা তাঁদের রাজকীয় বৈধতা দাবি করতেন। ইথিওপিয়ার আধুনিক কাঠামোর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠাতা দ্বিতীয় মেনেলিক এবং তাঁর কন্যা সম্রাজ্ঞী জ্যাউদিতু ছিলেন এই রাজপরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
তবে পরবর্তীকালের বিখ্যাত সম্রাট হাইলে সেলাসি মূলত পরিবারের নারীসূত্রে পাওয়া আত্মীয়তার ওপর ভিত্তি করেই নিজের শলোমনি বংশপরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ পরিবারের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন ছিল না; অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে মাঝে মাঝেই কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ত। এ ছাড়া ১৯৩৬ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ইতালীয় সামরিক দখলদারির ফলে রাজত্ব ভেঙে পড়ে এবং সম্রাট হাইলে সেলাসিকে সাময়িকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছিল। পরবর্তীতে হাইলে সেলাসি আধুনিকায়নের পথ বেছে নিলেও রাজনৈতিক ও ভূমি সংস্কারের ক্রমবর্ধমান দাবি সামলাতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়। ১৯৭৪ সালে ‘দার্গ’ নামে পরিচিত সামরিক কমিটি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে, যার মাধ্যমে শলোমনি রাজবংশের ৭০০ বছরেরও বেশি দীর্ঘ শাসনের আকস্মিক অবসান ঘটে।
পাণ্ড্য রাজবংশ
প্রাচীন দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী ও গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক শক্তি ছিল পাণ্ড্য রাজবংশ। তামিল অঞ্চলের এ সাম্রাজ্যের প্রারম্ভিক ইতিহাস পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও গ্রিক ঐতিহাসিকদের বিবরণ এবং ভারতীয় শিলালিপিতে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে তাঁদের অস্তিত্বের জোরালো প্রমাণ মেলে। সেকালে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রেও তাঁদের রাজধানীর উল্লেখ পাওয়া যায়। চোল ও চের রাজবংশের পাশাপাশি এটিও ছিল প্রাচীন তামিল অঞ্চলের অন্যতম প্রধান রাজপরিবার, যা একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রেখে গেছে। পাণ্ড্যদের ক্ষমতা সব সময় এক রকম বা একটানা ছিল না; প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির চাপে বিভিন্ন সময় তাঁরা প্রভাব হারালেও ষষ্ঠ শতাব্দীতে অত্যন্ত শক্তিশালী রূপে পুনরুত্থান ঘটে। পাণ্ড্য শাসকরা তামিল সাহিত্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং মন্দির স্থাপত্যের বিকাশে বড় অবদান রেখেছিলেন; যদিও ঐতিহ্যগত সাহিত্যে উল্লিখিত ‘সংগম’ বা সাহিত্য একাডেমির ইতিহাস পুরোপুরি প্রামাণ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পাণ্ড্য সাম্রাজ্য তাঁদের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়। সে সময় দক্ষিণ ভারতের এক বিশাল অংশ এবং উত্তর শ্রীলঙ্কার কিছু অঞ্চল তাঁদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অভ্যন্তরীণ উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব এবং দিল্লি সালতানাতের আক্রমণের ফলে তাঁদের পতন ত্বরান্বিত হয়। পরবর্তীতে পাণ্ড্যদের ছোট ছোট শাখাগুলো আরও কয়েক শতাব্দী ধরে তাদের সীমিত অঞ্চলে টিকে ছিল, এর মধ্যে তেনকাসি শাখা সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত বজায় ছিল।
চীনের ঝৌ রাজবংশ
প্রাচীন চীনের ইতিহাসে ঝৌ রাজবংশ (১০৪৬-২৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) দীর্ঘকাল স্থায়ী এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা এক রাজবংশ। আনুমানিক ৮ শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এ রাজপরিবার মধ্যযুগীয় চীনকে অনন্য রূপ দিয়েছিল। সাং রাজবংশের পতনের পর ঝৌ রাজারা চীনের শাসনভার গ্রহণ করেন। তাঁরা তাঁদের সাম্রাজ্যকে মূলত দুটি প্রধান পর্বে পরিচালনা করেন- পশ্চিমী ঝৌ এবং পূর্বী ঝৌ। ঝৌ শাসনের প্রথমার্ধে অর্থাৎ পশ্চিমী ঝৌ পর্বে এক বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে আঞ্চলিক রাজন্যবর্গ কেন্দ্রীয় ঝৌ রাজার প্রতি সামরিক ও রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আঞ্চলিক রাজারা স্বাধীন প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৭৭০ অব্দে আক্রমণকারীদের চাপে রাজধানী পূর্ব দিকে লুওয়াংয়ে স্থানান্তরিত করলে সূচনা হয় পূর্বী ঝৌ পর্ব। যা মূলত ‘বসন্ত ও শরৎ পর্ব’ এবং রক্তক্ষয়ী ‘যুদ্ধরত রাজ্যসমূহের পর্ব’ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর খ্রিস্টপূর্ব ২৫৬ অব্দে ঝৌ রাজবংশের চূড়ান্ত পতন ঘটে। পতনকালে রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও ঝৌ শাসকরা সাম্রাজ্যে প্রথাগত ও ধর্মীয় মর্যাদা ধরে রেখেছিলেন। পাশাপাশি ঝৌ শাসকদের এ যুগটি ছিল চীনের শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও চিন্তাধারার সোনালি অধ্যায়।
চোল রাজবংশের প্রতিষ্ঠার সঠিক সময়কাল জানা যায়নি। তবে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের নথিপত্রে চোল শাসকদের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রধান তামিল রাজপরিবারগুলোর অন্যতম এই প্রাচীন চোলরা উরাইয়ুরকে কেন্দ্র করে উর্বর কাবেরী নদী উপত্যকায় শাসন পরিচালনা করতেন। নিজেদের দীর্ঘ ইতিহাসে তাঁরা নিরবচ্ছিন্নভাবে সাম্রাজ্য শাসন করতে পারেননি। কয়েক শতাব্দী অন্ধকারে থাকার পর নবম শতাব্দীতে ‘মধ্যযুগীয় চোল’ হিসেবে তাঁরা পুনরায় আত্মপ্রকাশ করেন এবং শক্তিশালী সামুদ্রিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। প্রথম রাজারাজের শাসনামলে এ সাম্রাজ্য সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়, যিনি দক্ষিণ ভারত এবং শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। এ সম্প্রসারণ নীতি আরও বেগবান হয় প্রথম রাজেন্দ্রর আমলে। তিনি পুরো শ্রীলঙ্কা বিজয় সম্পন্ন করেন, গঙ্গা অববাহিকায় অভিযান পরিচালনা করেন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রীবিজয় রাজ্যের বিরুদ্ধে নৌ-অভিযান চালান। অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং হৈসল ও পাণ্ড্যদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উত্থানের মুখে রাজবংশটির পতন ঘটে। অবশেষে ১২৭৯ সালে এ রাজপরিবারের মূলধারার শাসনের অবসান ঘটে।
জাপানের রাজপরিবার
জাপানের রাজপরিবার বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রাচীনতম রাজতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃত। ঐতিহ্যগত বিশ্বাস অনুসারে, খ্রিস্টপূর্ব ৬৬০ অব্দে সম্রাট জিম্মুর সিংহাসন আরোহণের মাধ্যমে এ ইমপেরিয়াল রাজবংশের সূচনা ঘটেছিল। যদিও জিম্মু এবং তাঁর পরবর্তী প্রথম দিকের অনেক সম্রাটের শাসনের ইতিহাস মূলত পৌরাণিক কাহিনি ও কিংবদন্তিনির্ভর, তবু ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে ৫৩৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কিনমেইয়ের শাসনামল নিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য ধারার সন্ধান পাওয়া যায়। দীর্ঘ এ পথচলায় মোট ১২৬ জন সম্রাটের নাম রাজবংশীয় তালিকায় নথিভুক্ত রয়েছে, যার সর্বশেষ ধারক ছিলেন সম্রাট নারুহিতো। জাপানি সম্রাটরা মূলত ধর্মীয় ও প্রতীকী মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। সে সময় ‘শোগুন’ নামে পরিচিত সামরিক সর্বাধিনায়করা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। এ রাজবংশের সুদীর্ঘ যাত্রা বিতর্কহীন ছিল না। এশিয়াজুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সম্রাট হিরোহিতো জাপানের সিংহাসনে আসীন ছিলেন। তবে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ও যুদ্ধের সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা ঠিক কতখানি ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর ১৯৪৭ সালের যুদ্ধোত্তর সংবিধানে দেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব সরাসরি জনগণের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
হাউস অব হাবসবার্গ
বর্তমান সুইজারল্যান্ডে ১০২০ সালের দিকের ‘হাবসবার্গদুর্গ’-এর নামানুসারে এ রাজবংশের নামকরণ হয় ইউরোপের ইতিহাসে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর রাজপরিবারগুলোর অন্যতম ‘হাবসবার্গ’ রাজবংশ, যা ‘হাউস অব অস্ট্রিয়া’ নামেও পরিচিত। প্রায় ৬ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইউরোপীয় রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ভূরাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এ রাজপরিবার। এ রাজবংশের যাত্রার সূচনা ঘটে একাদশ শতকের শুরুতে। ১০২০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান সুইজারল্যান্ডে নির্মিত ‘হাবসবার্গ দুর্গ’-এর নামানুসারে এ রাজবংশের নামকরণ করা হয়। একাদশ শতকে হাবসবার্গরা কাউন্ট উপাধি অর্জন করেন এবং স্বীয় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। ১২৭৩ সালে এ রাজপরিবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিচিতি লাভ করে, যখন প্রথম রুডলফ জার্মানির রাজা নির্বাচিত হন। এরপর যুদ্ধজয়, উত্তরাধিকারের দাবি ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-কৌশলগত বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে হাবসবার্গরা তাঁদের রাজত্ব বহুদূর বিস্তার করেন। পর্যায়ক্রমে তাঁরা অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বোহেমিয়া, স্পেনসহ ইউরোপের বিশাল অঞ্চল শাসন করেন। ষোড়শ শতকে সম্রাট পঞ্চম চার্লসের শাসনামলে হাবসবার্গ সাম্রাজ্য ক্ষমতার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। যদিও পরবর্তীতে এটি স্পেনীয় এবং অস্ট্রীয়-এ দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। স্পেনীয় শাখা ১৭০০ সাল পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে রাজত্ব করেছিল। অন্যদিকে অস্ট্র্রীয় শাখার মূলধারার সমাপ্তি ঘটে ১৭৪০ সালে ষষ্ঠ চার্লসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তবে তখনো এ বংশের পতন ঘটেনি। তাঁর কন্যা মারিয়া থেরেসা, লোরেনের ফ্রান্সিস স্টিফেনকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের বংশধররা ‘হাউস অব হাবসবার্গ-লোরেন’ নামে পরিচিত হন। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পতন না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা তাদের ঐতিহাসিক ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন।