ধরা যাক, একজন মানুষের শরীরে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে। অস্ত্রোপচারও হয়েছে। কিন্তু পরে জানা গেল, রোগটি শরীরের অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, প্রচলিত অনেক কেমোথেরাপি হয়তো তাঁর ক্ষেত্রে আর কাজ করবে না। এমন অবস্থায় ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের আশা হারিয়ে যাওয়ারই কথা। এমন পরিস্থিতিতেই পড়েছিলেন ৩১ বছর বয়সী মলি হোনেস। তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো তাঁর হাতে আর বেশি সময় নেই। তিনি ঠিক করেছিলেন, চিকিৎসার পেছনে না ছুটে বাকি সময়টা নিজের মতো করে কাটাবেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তিনি একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসার সুযোগ পেলেন। সেটি ছিল ক্যানসারের ভ্যাকসিন। মাত্র পাঁচ মাস পর সেপ্টেম্বরে পরীক্ষা করে দেখা গেল, তাঁর শরীরে ক্যানসারের আর কোনো লক্ষণ নেই! এখন পর্যন্ত তিনি ক্যানসারমুক্ত অবস্থায় আছেন।
মলির মতো ক্যানসারের ভ্যাকসিন যে সবার জন্য কাজ করবে, এমনটা নিশ্চিত নয়। তবে তাঁর মতো কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পাওয়া ফলাফল বিজ্ঞানীদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। ক্যানসারের চিকিৎসায় ভ্যাকসিন এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে আলোচিত গবেষণার ক্ষেত্রগুলোর একটি।
আমরা সাধারণত ভ্যাকসিন বা টিকা বলতে এমন কিছু বুঝি যা হাম, পোলিও বা ফ্লুর মতো সংক্রামক রোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে। কিন্তু ক্যানসারের ভ্যাকসিনের ধারণাটা একটু আলাদা। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা প্রতিদিন শরীরকে নানা ধরনের ক্ষতিকর জীবাণু ও অস্বাভাবিক কোষ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ক্যানসারের কোষ অনেক সময় শরীরের এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে। ফলে অস্বাভাবিক কোষগুলো বাড়তে থাকে এবং টিউমার তৈরি করে।
ক্যানসারের টিকার লক্ষ্য ইমিউন সিস্টেমকে ক্যানসার কোষ চিনতে শেখানো। ভ্যাকসিন শরীরকে ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য দেয়। এরপর রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সেই বৈশিষ্ট্য চিনে ক্যানসার কোষকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে। বর্তমানে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্যানসার কোষ দেখা দিলেও ইমিউন সিস্টেম যেন তাকে চিনতে পারে, সেটিও ভ্যাকসিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। অর্থাৎ কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি সরাসরি ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার চেষ্টা করে; আর ক্যানসারের ভ্যাকসিন অনেকটা শরীরের নিজস্ব প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কাজ করে।
এখানেই ক্যানসারের ভ্যাকসিনকে সাধারণ টিকার চেয়ে আলাদা করে দেখার কারণ আছে। কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে অনেক রোগীর টিউমারে একই ধরনের অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। সেসব ক্ষেত্রে একই ধরনের ভ্যাকসিন অনেক রোগীর জন্য ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। মলি হোনেস যে ভ্যাকসিন পেয়েছিলেন, সেটিও এ ধরনের অফ-দ্য-শেলফ ভ্যাকসিন। তাঁর ক্যানসার, ফাইব্রোল্যামেলার কার্সিনোমায় সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। তাই গবেষকেরা এমন ভ্যাকসিন তৈরি করতে পেরেছেন, যা একই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত একাধিক মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কিন্তু বেশির ভাগ ক্যানসার এভাবে কাজ করে না। একজন মানুষের ক্যানসার কোষে যে পরিবর্তন থাকে, অন্যজনের ক্যানসার কোষে তা না-ও থাকতে পারে। এমনকি একই টিউমারের বিভিন্ন কোষেও আলাদা আলাদা পরিবর্তন থাকতে পারে। এ কারণে তৈরি হচ্ছে পারসোনালাইজড ক্যানসার ভ্যাকসিন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে রোগীর ক্যানসার কোষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। কোন কোন পরিবর্তন ক্যানসার কোষকে আলাদা করে তুলেছে, তা খুঁজে বের করে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য তৈরি করা হয় বিশেষ ভ্যাকসিন। অর্থাৎ একজনের জন্য তৈরি ভ্যাকসিন আরেকজনের জন্য একইভাবে কাজ না-ও করতে পারে।
ক্যানসারের ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর পেছনে রয়েছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের গবেষণা। তবে গত দুই দশকে এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে ক্যানসার কোষের জিনগত পরিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান বৃদ্ধি পাওয়া এবং নতুন ধরনের প্রযুক্তির উন্নতির কারণে ব্যক্তিভিত্তিক ভ্যাকসিন তৈরি করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে।
২০২৬ সালে মডার্নার তৈরি ব্যক্তিভিত্তিক ক্যানসার ভ্যাকসিন মেলানোমা বা একধরনের ত্বকের ক্যানসার নিয়ে তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় সফল হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা সাধারণত বড় পরিসরে করা হয় এবং কোনো চিকিৎসা বাজারে আনার আগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই ভ্যাকসিন ফুসফুস, মূত্রথলি, কিডনি, অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যানসার নিয়েও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এর মানে এই নয় যে এখনই সব ধরনের ক্যানসারের জন্য ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। বেশির ভাগ ক্যানসার ভ্যাকসিন এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।
আরেকজন রোগীর নাম আরি নাকাতা। স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার পর আবার জানতে পারেন, তাঁর ক্যানসার পিঠ, হাড়, ফুসফুস ও যকৃতে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি ক্যানসারের ভ্যাকসিনের একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভ্যাকসিন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিনটি শরীরে পৌঁছে দিতে ইলেকট্রোপোরেশন নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে অল্প সময়ের জন্য বৈদ্যুতিক স্পন্দন দিয়ে কোষের পর্দায় ক্ষুদ্র পথ তৈরি করা হয়, যাতে ভ্যাকসিনের উপাদান কোষের ভেতরে সহজে ঢুকতে পারে।
তিনি মাসে একটি করে মোট ছয়টি ভ্যাকসিন নেন। পরে দেখা যায়, তাঁর ক্যানসারের ৫৯টি লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ২৪টি চিকিৎসায় সাড়া দিয়েছে। নাকাতা এখনো অন্যান্য চিকিৎসার পাশাপাশি এই পরীক্ষামূলক চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ক্যানসারের ভ্যাকসিনকে এখনো কোনো জাদুকরী চিকিৎসা বলা যাবে না। গবেষণায় কিছু আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেলেও আরও অনেক পরীক্ষা দরকার। কোন ধরনের ক্যানসার, কোন রোগীর ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে, কোন ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা।
আর ক্যানসারের ভ্যাকসিনকে সাধারণত আলাদা চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছে না। কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি বা অন্য চিকিৎসার সঙ্গে ভ্যাকসিন মিলিয়ে ব্যবহার করলে ফল আরও ভালো হতে পারে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হচ্ছে। মডার্নার নতুন ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো, ক্যানসার কোষ যেন রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার আক্রমণ থেকে লুকিয়ে থাকতে না পারে। পাশাপাশি ভ্যাকসিনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ইমিউন সিস্টেম যেন কোষগুলো ধ্বংস করতে পারে।
ভবিষ্যতে ক্যানসারের চিকিৎসা হয়তো শুধু ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রোগীর নিজের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকেই প্রশিক্ষিত করে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করানো হতে পারে। ব্যক্তিভেদে তৈরি ভ্যাকসিন, এমআরএনএ প্রযুক্তি, ডিএনএ, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উপায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। তবে এটি এখনো পুরোপুরি আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। ক্যানসারের ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা দ্রুত এগোলেও আরও বড় ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার ফল পাওয়া প্রয়োজন।