কিপ থর্ন ২০১৭ সালে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণে অবদানের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি একবার বলেছিলেন, কৈশোরে একটি বই তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং সেই বই–ই মূলত তাঁকে পদার্থবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতি উৎসাহী করে তোলে। বইটির নাম ওয়ান, টু, থ্রি... ইনফিনিটি। এই বইয়ের লেখক জর্জ গ্যামো। গ্যামো নিজেও ছিলেন বিখ্যাত পদার্থবিদ।
একটি বই, একটি লেখা কিংবা একটি বক্তব্য যেকোনো সময় একজন কিশোর বা তরুণকে উদ্দীপ্ত করতে পারে। একে অনেক সময় ‘লাইট বাল্ব মোমেন্ট’ বলা হয়। কে কখন কোন লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হবে, তা আগে থেকে বলা কঠিন। তাই একটি সমাজে সব সময় ভালো বই, ম্যাগাজিন, তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট থাকা জরুরি; যেন ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, গবেষক ও উদ্ভাবক তৈরির অনুকূল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কার্ল সেগান কিংবা আইজাক আসিমভের মতো জনপ্রিয় লেখকদের লেখা আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু মানুষকে নাড়া দিয়েছে, বিস্মিত করেছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে।
বাংলা ভাষায় আবদুল্লাহ আল-মুতী, মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ অনেক লেখকের বিজ্ঞানভিত্তিক লেখা অসংখ্য কিশোর-তরুণকে আলোড়িত করেছে।
বাংলাদেশে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র এখনো অনেক সম্ভাবনাময় হলেও আমরা তুলনামূলক পিছিয়ে আছি। বিশেষ করে উচ্চতর পর্যায়ে বিজ্ঞান গবেষণা দুর্বল হওয়ায় নিচের দিকেও বিজ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞানভাবনা, বিজ্ঞান মেলা ও প্রতিযোগিতার পরিসর সীমিত। জনসংখ্যার বিবেচনায় বিজ্ঞানবিষয়ক বই প্রকাশের সংখ্যাও কম। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পড়ে মূলত চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার উদ্দেশ্যে। বিজ্ঞানী, গবেষক বা উদ্ভাবক হওয়ার স্বপ্ন এখনো তুলনামূলক কমই দেখা যায়।
এমন এক প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানচিন্তা ১০ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এক দশক পূর্তিতে বিজ্ঞানচিন্তাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। আমি ব্যক্তিগতভাবে একে একটি বড় সাফল্য মনে করি। বিজ্ঞানচিন্তাকে প্রতি মাসে প্রকাশ করার জন্য যে দল নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, তারা যে কতটা ত্যাগ ও শ্রম দিচ্ছে, তা অনুধাবন করা কঠিন নয়। বিজ্ঞানচিন্তায় প্রকাশিত লেখার মান অত্যন্ত উঁচু। যাঁরা এ ম্যাগাজিনে লেখেন, তাঁদের অনেকে শুধু বিজ্ঞান লেখকই নন; বরং তাঁরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা করছেন, শিক্ষকতা করছেন এবং বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত আছেন।
বিজ্ঞানচিন্তা বাংলাদেশের বহু কিশোর-তরুণের স্বপ্নকে নাড়া দিচ্ছে। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার, উদ্ভাবন ও সায়েন্স ফিকশন গল্প পড়ে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ জেগে উঠছে। ভবিষ্যতেও আরও অনেকের স্বপ্ন জাগবে, অনেকেই গবেষক ও বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।
আমি স্বপ্ন দেখি, বিজ্ঞানচিন্তা ভবিষ্যতে বাংলা ভাষায় মানসম্পন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র বা ডকুফিল্ম তৈরির উদ্যোগ নেবে। বিবিসি যেমন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে, বিজ্ঞানচিন্তাও তেমন উদ্যোগ নিতে পারে। প্রথম আলোকে ধন্যবাদ, বিজ্ঞানচিন্তার মতো একটি মানসম্পন্ন মাসিক বিজ্ঞান ম্যাগাজিন আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। বিজ্ঞানচিন্তা প্রকাশিত হোক বহু বছর ধরে—এই কামনা করি।