মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরেই চরম জ্বালানি সংকট। তার ওপরে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের সংঘাত দিনদিন বাড়ছে।
সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে হুতিরা। এতে তেলের বাজারে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। সংঘাতের কারণে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে গতকাল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ঠিক রাখতে বাংলাদেশকে উচ্চদামে ফিনিশিড ওয়েল প্রোডাক্ট আমদানি করতে হতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। এর মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত সৌদি আরমাকো থেকে ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড আসে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন। এর বাইরে আধুধাবির অ্যাডনক থেকেও অপরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ। এ অপরিশোধিত তেল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন, পেট্রোলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরবরাহকারী দেশ খুব বেশি নয়। ফলে সৌদি আরবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা তেল উৎপাদন, রপ্তানি টার্মিনাল, বন্দর বা আঞ্চলিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সময়মতো ক্রুড ওয়েল পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। ফলে সৌদি-হুথি সংঘাত আঞ্চলিক শিপিং রুট, বিমা ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জে চাপ তৈরি করলে বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চলমান পরিস্থিতির কারণে দেশে ক্রুড ওয়েল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে গোটা বিশ্বসহ বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কুয়েত এবং ইউএই-এর মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো হচ্ছে বিশ্বের বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ। যদিও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে সৌদি আরব।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, হরমুজে অস্থিরতার মধ্যেও সৌদি আরবের উৎপাদন নানা মাধ্যমে চলছিল। ২-৩ মিলিয়ন ব্যারেল কম উৎপাদন হলেও সৌদি আরব এ পর্যন্ত ভালো পরিমাণে তেল উৎপাদন করছিল। এখন আরামকো আক্রমণের পর যদি তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তা পুরো বিশ্বে তেল সরবরাহে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেবে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থতিতে বাংলাদেশের খুব একটা করণীয় নেই। পুরো বিশ্বই এখন ভোগান্তির মধ্যে আছে। আমাদের রিফাইনারি চালানোর জন্য যে বিকল্প ক্রুড তা নেই। ইউএই বা সৌদি থেকেই ক্রুড ওয়েল আনতে হবে। এ অবস্থায় বিকল্প ক্রুড ওয়েলও পাওয়া যাবে না।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। হুতিরা চাচ্ছে তেলের সংকট আরও বাড়ুক। এতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল চাপে পড়বে। এটি ইরানের কৌশল। হুতিরা অন্য কারণ দেখালেও মূল কারণ এটি। যেহেতু সৌদির তেল বিশ্বে জ্বালানি তেলের বাজারকে স্থিতিশীল রাখছিল। একে বন্ধ করার জন্য তারা সৌদি আরামকোতে হামলা চালিয়েছে।
এদিকে গতকাল সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৯ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১০৬ ডলার ৫৮ সেন্টে ওঠে। একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুডের দাম ৮০ সেন্ট বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ ডলার ৯৪ সেন্ট হয়েছে।
বিডি প্রতিদিন/এনইউ