সিডনির বিখ্যাত ওয়েস্টমিড হাসপাতালে গত কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে চিকিৎসাবিষয়ক সম্মেলন ‘হাসপাতাল সপ্তাহ’। এবারও আরও বিস্তৃত ও বৃহৎ পরিসরে এই আয়োজন শেষ হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে এই সামগ্রিক আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে বিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতা সেবাসংক্রান্ত বিশেষ অধিবেশনটি। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্বমহিমায় উপস্থিত থাকেন একজন বাংলাদেশি চিকিৎসক রুম্মানা আফরীন।
ওয়েস্টমিড হাসপাতালের পুনর্বাসন চিকিৎসা বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রুম্মানা আফরীন শুধু একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকই নন, মেধা ও কর্মদক্ষতায় অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য খাতে তিনি একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব। স্বাস্থ্যসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে তিনি নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের বর্ষসেরা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত হয়েছিলেন।
সম্প্রতি সিডনিতে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন চিকিৎসক রুম্মানা আফরীন। দীর্ঘ সেই আলাপচারিতায় উঠে এসেছে বিকাশজনিত প্রতিবন্ধীদের সার্বিক পরিচর্যা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব এবং প্রবাসে বসবাসরত অভিবাসী বাংলাদেশি পরিবারের বাস্তব সংকট ও সম্ভাবনার নানা দিক।
১৮ বছর পেরোলেই অদৃশ্য সংকট
আলোচনার শুরুতেই ডা. আফরীন হাত দিলেন সেবার সবচেয়ে বড় শূন্যতার জায়গায়। বলছিলেন, ‘১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের দায়িত্ব থাকে শিশু বিশেষজ্ঞদের হাতে। তারা শারীরিক বৃদ্ধি থেকে শুরু করে প্রতিটি চিকিৎসা নিবিড়ভাবে সমন্বয় করেন। কিন্তু ১৮ বছর পার হতেই এই রোগীরা যেন হঠাৎ এক গভীর শূন্যতায় পড়ে যায়।’ তিনি জানান, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত পারিবারিক চিকিৎসকেরা প্রাথমিক দায়িত্ব নেন। কিন্তু এই বিশেষ রোগীদের জন্য সমন্বিত চিকিৎসা দেওয়ার মতো প্রশিক্ষিত পুনর্বাসন চিকিৎসকের সংখ্যা অস্ট্রেলিয়াতেও অনেক কম।
‘সাধারণ পারিবারিক চিকিৎসকের পক্ষে একা সব দিক সামলানো সম্ভব হয় না। রোগীর হার্ট কেমন আছে, দাঁতের অবস্থা কী, দৃষ্টিশক্তি ঠিক আছে কি না—এগুলো নিয়মিত নজরদারির সমন্বয়ক কেউ থাকে না। অথচ এই মানুষগুলোর হয়তো নিয়মিত এমআরআই বা সিটি স্ক্যান দরকার, রক্ত পরীক্ষা দরকার, মুখের দাঁতের চিকিৎসা দরকার। বিশেষ করে তীব্র অটিজমে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই সংকট ভয়াবহ। বছরের পর বছর তাদের অপেক্ষার তালিকায় থাকতে হয়।’
সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সময় ছোটখাটো সমস্যাতেই রোগীকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যেতে হয়। এতে রোগী ও পরিবার যেমন বিপর্যস্ত হয়, তেমনি রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ও সময় নষ্ট হয়। অথচ নিয়মিত প্রতিরোধমূলক নজরদারি থাকলে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো সম্ভব।
ভাষা ও সংস্কৃতির দেয়াল
অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গে আলোচনা আসতেই ডা. আফরীনের কণ্ঠে ঝরে পড়ল স্পষ্ট তাগিদ। ‘আমাদের কমিউনিটির বড় সংকট দুটি—ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং সঠিক তথ্যের অভাব। অনেকেই জানেন না কোথায় যেতে হবে কিংবা কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে।’
ডা. আফরীন আরও একটি স্পর্শকাতর বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। ‘অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ মনে করেন, এই অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধিতা হয়তো স্রষ্টার ইচ্ছা বা পরীক্ষা, তাই এটা মুখ বুজে সহ্য করেই বেঁচে থাকতে হবে। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসনব্যবস্থায় এই রোগীদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত করা সম্ভব—সেই তথ্য অনেকের কাছে পৌঁছায় না। কীভাবে সরকারের কাছে প্রাপ্য অধিকার চাইতে হয়, তা-ও অনেকে জানেন না।’
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতিবন্ধী বিমা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কাঠামোগত সহায়তা দেয়। অথচ সচেতনতার অভাবে অনেক অভিবাসী পরিবার প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই দূরত্ব ঘোচাতে ডা. আফরীন ভবিষ্যতে কমিউনিটি মেলা বা উৎসবে একটি তথ্যকেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা করছেন। সেখান থেকে সাধারণ অভিবাসী পরিবারগুলোকে সরাসরি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও চিকিৎসা সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিরোধই মূল সমাধান
কথোপকথনের শেষে ডা. আফরীন তুলে ধরেন চিকিৎসা দর্শনের সবচেয়ে মৌলিক সত্যটি। বললেন, ‘অসুখ জটিল হলে চিকিৎসা করানোর চেয়ে রোগ যাতে না বাঁধে, সেই প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাই আসল সমাধান।’
বিকাশজনিত প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রেও সঠিক সমন্বয়, নিয়মিত নজরদারি এবং সচেতনতাই পারে তাদের জীবনকে সহজ ও অর্থবহ করে তুলতে। সিডনির আন্তর্জাতিক চিকিৎসা অঙ্গনে ডা. রুম্মানা আফরীনের এই নেতৃত্ব শুধু অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য খাতেই নয়, প্রবাসে বেড়ে ওঠা প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবারের জন্যও এক উজ্জ্বল নির্ভরতার প্রতীক বলে মন্তব্য করেন অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।