ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক অশুভ অবয়ব। তার নিচে ছোট ছোট বাড়িঘর, সরু রাস্তা, গোটা একটি শহর। অতিকায় ডানার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। শহরজুড়ে মহামারি, মানুষের মধ্যে মৃত্যুর আতঙ্ক। দৃশ্যটি দেখে আজকের কোনো ফ্যান্টাসি চলচ্চিত্রের কথা মনে হতে পারে। অথচ এটি তৈরি হয়েছিল ১০০ বছর আগে। তখন সিনেমায় কম্পিউটারের ব্যবহার ছিল না, ছিল না ডিজিটাল ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজি। শুধু ক্যামেরা, আলোছায়া, ছোট ছোট সেট আর অভিনব কিছু কৌশল ব্যবহার করে এমন দৃশ্য তৈরি করেছিলেন জার্মান নির্মাতা এফ ডব্লিউ মুরনাউ।
চলচ্চিত্রটির নাম ‘ফাউস্ট’। ১৯২৬ সালের ১৪ অক্টোবর বার্লিনের উফা-প্যালাস্ট আম জু প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির আনুষ্ঠানিক প্রিমিয়ার হয়। সেই হিসাবে আজ বুধবার ছবিটির ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এর আগে ২৬ আগস্ট হয়েছিল বিশেষ প্রদর্শনী। জার্মান চলচ্চিত্রের তথ্যভান্ডার ফিল্মপোর্টালে সংরক্ষিত নথিতে এ তথ্য পাওয়া গেল। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে নির্মিত ‘ফাউস্ট’ শুধু দৃশ্যের কারসাজির জন্যই আলোচিত নয় । মানুষের লোভ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা আর নৈতিক দ্বন্দ্বের গল্পও রয়েছে এতে। শতবর্ষ পরেও সেই গল্পের আবেদন ফুরায়নি; বরং নানা সময়ে নতুন ব্যাখ্যা পেয়েছে। গ্যেটের যে সাহিত্যকর্ম থেকে ছবিটির কাহিনির উপাদান নেওয়া হয়েছিল, সেই গল্প বাংলাদেশের মঞ্চেও এসেছে।
অশুভ শক্তির সঙ্গে মানুষের চুক্তি‘ফাউস্ট’ কাহিনির ইতিহাস বেশ পুরোনো। এর শিকড় জার্মান লোককথায়। ষোড়শ শতকে ফাউস্ট নামের এক জ্ঞানসাধককে ঘিরে নানা গল্প প্রচলিত ছিল। পরে ইংরেজ নাট্যকার ক্রিস্টোফার মার্লো লেখেন ‘ডক্টর ফস্টাস’। জার্মান সাহিত্যিক ইয়োহান উলফগাং ফন গ্যেটে তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘ফাউস্ট’–এ কাহিনিটিকে নতুন মাত্রা দেন।মুরনাউয়ের ছবিটি অবশ্য কোনো একটি নাটকের হুবহু চলচ্চিত্রায়ণ নয়। লোককথার পাশাপাশি মার্লো ও গ্যেটের রচনার বিভিন্ন উপাদান মিলিয়ে এর চিত্রনাট্য তৈরি করেন হান্স কাইজার।
ছবির শুরুতেই অশুভ শক্তির প্রতিনিধি মেফিস্টো দাবি করে, পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ মানুষকেও সে নৈতিক পথ থেকে সরিয়ে দিতে পারে। সেই দাবি ঘিরেই শুরু হয় এক পরীক্ষা। পরীক্ষার কেন্দ্রে বৃদ্ধ জ্ঞানসাধক ফাউস্ট।
দীর্ঘ জীবন জ্ঞানচর্চায় কাটিয়েছে ফাউস্ট। কিন্তু তার শহরে মহামারি ছড়িয়ে পড়লে অসহায় হয়ে পড়ে ফাউস্ট। চারদিকে মৃত্যু, মানুষের আর্তনাদ। নিজের জ্ঞান ও চিকিৎসার চেষ্টা দিয়েও বিপর্যয় ঠেকাতে পারে না। এমন সময় তার সামনে হাজির হয় মেফিস্টো।
অলৌকিক ক্ষমতার প্রলোভন দেখায় সে। সেই ক্ষমতা পেলে অসুস্থ মানুষকে বাঁচাতে পারবে ফাউস্ট। তবে বিনিময়ে দিতে হবে নিজের আত্মা। মানুষের কল্যাণের আশায় অশুভ শক্তির সঙ্গে চুক্তিতে রাজি হয় ফাউস্ট। কিন্তু সেখানেই শেষ নয়। এরপর একে একে সামনে আসে যৌবন, ক্ষমতা ও ভোগের হাতছানি।মেফিস্টোর সাহায্যে যৌবন ফিরে পায় ফাউস্ট। একসময় তার জীবনে আসে গ্রেচেন নামের এক তরুণী। দুজনের প্রেমের গল্পও শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের সুখের সন্ধানে গিয়ে ফাউস্টকে মুখোমুখি হতে হয় ভয়াবহ বাস্তবতার।
গল্পের এই জায়গাতেই ‘ফাউস্ট’ আর পাঁচটি অতিপ্রাকৃত কাহিনি থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। মানুষের চাওয়ার কি কোনো শেষ আছে? জ্ঞান, ক্ষমতা, যৌবন, ভালোবাসা—সব পেয়েও মানুষ কি সন্তুষ্ট হতে পারে? এমন সব প্রশ্নই উঠে আসে ছবিটিতে।
পর্দায় ফাউস্ট, মেফিস্টো ও গ্রেচেনফাউস্টের চরিত্রে অভিনয় করেন সুইডিশ অভিনেতা গোস্তা একমান। একই ছবিতে তাঁকে দেখা যায় বৃদ্ধ ও তরুণ—দুই বয়সে। বৃদ্ধ ফাউস্টের অসহায়ত্ব, হতাশা কিংবা যৌবন ফিরে পাওয়ার উচ্ছ্বাস—সবই ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনয়ে।
মেফিস্টোর ভূমিকায় ছিলেন জার্মান অভিনেতা এমিল ইয়ানিংস। ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ তাঁর অভিনয়। কখনো বিশাল ডানাওয়ালা অশুভ অবয়ব, কখনো সাধারণ মানুষের বেশে ধূর্ত প্রলোভনদাতা। চরিত্রটিতে ভয়ংকর উপস্থিতির পাশাপাশি কৌতুকেরও জায়গা রেখেছিলেন ইয়ানিংস।গ্রেচেনের চরিত্রে অভিনয় করেন কামিলা হর্ন। এটি ছিল তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র। প্রেমে পড়া এক তরুণী থেকে অসহায়, বিপর্যস্ত নারীতে তাঁর রূপান্তর ছবিটির আবেগঘন অংশগুলোর অন্যতম।
আরও অভিনয় করেন ভিলহেল্ম ডিটারলে, ফ্রিডা রিশার্ড, ইভেত গিলবে ও ভার্নার ফুয়েটেরার। ছবিটির প্রযোজক ছিলেন এরিখ পোমার। চিত্রগ্রহণে কার্ল হফমান, শিল্পনির্দেশনায় রবার্ট হার্লথ ও ভাল্টার রোরিগ।
আকাশে উড়ল কীভাবে‘ফাউস্ট’–এর গল্প যতটা আকর্ষণীয়, তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় দৃশ্যনির্মাণের ইতিহাস। বিশেষ করে মেফিস্টোর বিশাল ডানার নিচে গোটা শহর ঢাকা পড়ার দৃশ্যটি।আরেকটি দৃশ্যে ফাউস্টকে নিয়ে আকাশে উড়ে যায় মেফিস্টো। নিচে দ্রুত বদলে যেতে থাকে পাহাড়, নদী, বন আর জনপদ। দেখে মনে হয়, সত্যিই আকাশপথে পৃথিবীর ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে তারা।
আজকের সিনেমায় এমন দৃশ্য তৈরিতে কম্পিউটার গ্রাফিকস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মুরনাউয়ের হাতে সে সুযোগ ছিল না। তাঁর ভরসা ছিল ক্যামেরার কৌশল, আলোছায়া আর ক্ষুদ্রাকৃতির সেট।
চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট তাঁর ‘ফাউস্ট’–বিষয়ক লেখায় ছবিটির শিল্পনির্দেশক রবার্ট হার্লথের স্মৃতিচারণা তুলে ধরেছেন। হার্লথ জানিয়েছিলেন, আকাশপথে যাত্রার দৃশ্য তৈরির জন্য নলখাগড়া ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে গাছ বানানো হয়েছিল। কাচের তন্তু দিয়ে তৈরি হয়েছিল মেঘ। প্লাস্টারের ওপর ঘাস বসিয়ে বানানো হয়েছিল পাহাড়ি ভূদৃশ্য।
এমনকি মুরনাউ নিজেও ছোট ছোট পাথর ও গাছ তৈরিতে হাত লাগিয়েছিলেন। ক্যামেরার সামনে সাজানো এসব ক্ষুদ্রাকৃতির দৃশ্যই পর্দায় বিশাল ভূখণ্ডের চেহারা পেয়েছিল।
শুধু সেট নয়, একই ফিল্মে একাধিকবার ছবি ধারণের কৌশলও ব্যবহার করা হয়। ফলে একই দৃশ্যে বাস্তবের সঙ্গে অতিপ্রাকৃত অবয়বকে মিলিয়ে দেখানো সম্ভব হয়েছিল। কোথাও মেফিস্টোর ছায়া নেমে এসেছে শহরের ওপর, কোথাও অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ ফুটে উঠেছে আলো।
মুরনাউয়ের ছবিতে আলোছায়ার ব্যবহার ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরিবেশ তৈরি নয়, চরিত্রের ভয়, হতাশা কিংবা অসহায়ত্ব বোঝাতেও আলো ব্যবহার করেছেন তিনি। অনেক সময় সংলাপের প্রয়োজনই হয়নি। দৃশ্যের মধ্য দিয়েই দর্শক বুঝে নিয়েছেন চরিত্রের মনের অবস্থা।
শুটিংয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন অভিনেত্রীপর্দায় এসব দৃশ্য যত সহজ মনে হয়, শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা মোটেও তেমন ছিল না; বরং কিছু দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে রীতিমতো বিপাকে পড়েছিলেন অভিনয়শিল্পীরা।চলচ্চিত্রগবেষক লটে আইজনারের সংগ্রহ করা স্মৃতিচারণার বরাতে রজার এবার্ট লিখেছেন, একটি দৃশ্যে দেবদূতকে মেঘের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন ভার্নার ফুয়েটেরার। কৃত্রিম মেঘ তৈরির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বাষ্প ছড়ানো হচ্ছিল। মুরনাউ দৃশ্য ধারণে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে সময়ের কথা ভুলে যান। একপর্যায়ে অভিনেতা এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে তাঁর পক্ষে তলোয়ার ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যায়।
আরেকটি দৃশ্যের অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ। গ্রেচেন চরিত্রের কামিলা হর্নকে আগুনের মধ্যে দাঁড়িয়ে অভিনয় করতে হয়েছিল। চারপাশে আগুনের শিখা, প্রচণ্ড উত্তাপ। দীর্ঘ সময় শুটিং করতে গিয়ে একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি।
মেফিস্টোর বিশাল পোশাক বাতাসে ওড়ানোর দৃশ্য ধারণেও কম কষ্ট হয়নি। এমিল ইয়ানিংসকে শক্তিশালী পাখার সামনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। বাতাসের সঙ্গে ছড়ানো হচ্ছিল কালো কণা, যাতে পোশাকের বিশালতা ও অশুভ উপস্থিতি আরও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
এসব ঘটনার কথা জানলে বোঝা যায়, এক শতাব্দী আগে পর্দায় কয়েক মুহূর্তের বিস্ময় তৈরি করতে কতটা পরিশ্রম করতে হতো।
সবচেয়ে ব্যয়বহুল, তবু ব্যবসায় ব্যর্থ‘ফাউস্ট’ নির্মাণে কোনো কার্পণ্য করেনি জার্মান চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান উফা। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের (বিএফআই) তথ্য অনুযায়ী, সে সময় পর্যন্ত এটিই ছিল প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র।
১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯২৬ সালের মে পর্যন্ত বার্লিনের উফা স্টুডিওতে ছবিটির চিত্রধারণ চলে। প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন এরিখ পোমার, যিনি জার্মান নির্বাক চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজক।
এত আয়োজনের পরও ছবিটি জার্মানির প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে পারেনি। তবে বাণিজ্যিক ব্যর্থতা দিয়ে ‘ফাউস্ট’–এর গুরুত্ব বিচার করা যায় না। সময়ের সঙ্গে ছবিটির দৃশ্যনির্মাণ, ক্যামেরার কাজ ও শিল্পনির্দেশনা নতুনভাবে মূল্যায়িত হয়েছে।বিএফআই ১৯২৬ সালের উল্লেখযোগ্য ১০টি চলচ্চিত্রের তালিকায় ‘ফাউস্ট’–কে রেখেছে । প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে লোককথা, আবেগঘন নাটক আর চলচ্চিত্রের দৃশ্যগত বিস্ময়ের এক অনন্য মিশেল ছবিটি।
১৯২৬ সালের ১৪ অক্টোবর বার্লিনে ছবিটির আনুষ্ঠানিক প্রিমিয়ার হয়েছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে। পরদিন প্রকাশিত জার্মান চলচ্চিত্র সাময়িকী ‘লিশ্টবিল্ড-বুনে’র সমালোচনায় সেই প্রদর্শনীর বিবরণ পাওয়া যায়। প্রদর্শনী শেষে দর্শকের অভিবাদন গ্রহণ করেছিলেন অভিনেত্রী কামিলা হর্ন, চিত্রনাট্যকার হান্স কাইজার ও চিত্রগ্রাহক কার্ল হফমান।
অথচ যাঁর ছবিকে ঘিরে এত আয়োজন, সেই মুরনাউই সেদিন উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তখন হলিউডে নতুন কাজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
বাংলাদেশের মঞ্চেও ‘ফাউস্ট’মুরনাউয়ের ‘ফাউস্ট’ মুক্তির প্রায় এক শতাব্দী পর বাংলাদেশের মঞ্চেও ফিরে এসেছে এই কাহিনি। অবশ্য মুরনাউয়ের চলচ্চিত্রের রিমেক হিসেবে নয়, গ্যেটের সাহিত্যকর্মের নতুন নাট্যরূপ হিসেবে।২০২০ সালের ২ অক্টোবর ঢাকার কাঁটাবনে প্রাচ্যনাটের মহড়াকক্ষে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘ফাউস্ট অথবা অন্য কেউ’ । প্রাচ্যনাটের ‘মহলা মগন’ উঠান নাটকের মেলার শেষ প্রযোজনা ছিল এটি।
মনে আছে, সেই নাটকের নির্মাণপ্রক্রিয়াও ছিল কিছুটা আলাদা। একজন নির্দেশকের হাতে পুরো দায়িত্ব না রেখে শিল্পীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছিলেন। ফলে নাট্যরূপ থেকে মঞ্চের উপস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই দলগত ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।গ্যেটের মূল কাহিনির লোভ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক দ্বন্দ্বকে সমকালীন সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা ছিল এই প্রযোজনায়। ফাউস্ট জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত হলেও তাঁর ভেতরে রয়েছে সাফল্য, সম্পদ ও খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা। সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায় মেফিস্টো।
প্রাচ্যনাটের ব্যাখ্যায়, পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের যুগে মেফিস্টো যেন নানা রূপে মানুষের সামনে হাজির হয়। ভোগের আকর্ষণ, ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার মোহ—এসবের কাছে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে পড়ে, সেই প্রশ্নই সামনে এনেছিলেন নাট্যরূপকারেরা।
বাংলাদেশি ‘ফাউস্ট’ নিয়ে ফারুখ ধোন্ডির লেখাবাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ফাউস্ট’ নিয়ে কাজ করেছিলেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নাট্যনির্দেশক মুকুল আহমেদও। তাঁর অনুরোধে গ্যেটের কাহিনির একটি নতুন নাট্যরূপ তৈরি করেন ব্রিটিশ লেখক ও নাট্যকার ফারুখ ধোন্ডি।২০২১ সালের ২ ডিসেম্বর অনলাইন সাময়িকী ‘দ্য ডেইলি আই’–এ প্রকাশিত ‘আ ফাউস্ট ফর বাংলাদেশ’ শিরোনামের লেখায় সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ধোন্ডি।ফারুখ ধোন্ডি জানান, এর আগে মুকুল আহমেদের সঙ্গে ‘দেবদাস’–এর একটি নাট্যরূপে কাজ করেছিলেন। পরে মুকুল তাঁকে গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে লেখার প্রস্তাব দেন।কাজটি সহজ ছিল না। বহু পুরোনো ইউরোপীয় কাহিনির সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার যোগসূত্র তৈরি করতে হতো। সেই ভাবনা থেকেই নাট্যরূপে দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী যাত্রার উপাদান, গান ও কথক ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন তাঁরা।ধোন্ডির লেখায় উঠে এসেছে, আধুনিক সমাজে জ্ঞান, ক্ষমতা ও সম্পদের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। গ্যেটের ফাউস্ট যে প্রলোভনের মুখোমুখি হয়েছিলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার রূপ কী হতে পারে, সেই প্রশ্ন নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি।
কাহিনির সমাপ্তিতেও পরিবর্তন এনেছিলেন ধোন্ডি। তাঁর সংস্করণে ফাউস্টের শেষ গন্তব্য হয়ে ওঠে আমেরিকা। আধুনিক মানুষের উন্নত জীবন ও সাফল্যের আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা ছিল এতে।
তবে ধোন্ডির লেখাটি মূলত নাট্যরূপ তৈরির অভিজ্ঞতা নিয়ে। বাংলাদেশে প্রযোজনাটির নির্দিষ্ট মঞ্চায়নের তথ্য এ লেখা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।মুরনাউয়ের চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এসব নাট্যপ্রযোজনার সরাসরি নির্মাণগত সম্পর্ক নেই। কিন্তু একই কাহিনি যে ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসতে পারে, বাংলাদেশের উদ্যোগগুলো তারই উদাহরণ।
‘নসফেরাতু’ থেকে ‘ফাউস্ট’‘ফাউস্ট’ নির্মাণের আগেই চলচ্চিত্রজগতে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছিলেন মুরনাউ। ১৯২২ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর ‘নসফেরাতু’ হরর চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি।ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসের অননুমোদিত রূপান্তর হিসেবে নির্মিত ছবিটিতে ভ্যাম্পায়ারের ভয়ংকর উপস্থিতি, আলোছায়া আর অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরিতে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি।‘নসফেরাতু’তে ভয় তৈরির জন্য যেভাবে আলোছায়া ব্যবহার করেছিলেন মুরনাউ, চার বছর পর ‘ফাউস্ট’–এ সেই কৌশল আরও বিস্তৃত করেন। এখানে শুধু অতিপ্রাকৃত শক্তির উপস্থিতি নয়, মানুষের আকাঙ্ক্ষা, প্রেম, ভয় আর নৈতিক দ্বন্দ্বকেও দৃশ্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন তিনি।
মুরনাউয়ের চলচ্চিত্রে আলোছায়া ছিল গল্প বলার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কখনো অন্ধকারে মিলিয়ে যায় চরিত্রের মুখ, কখনো সামান্য আলোর মধ্যেই ফুটে ওঠে ভয় কিংবা অসহায়ত্ব। আবার বিশাল সেটের মধ্যে মানুষকে এত ছোট দেখানো হয় যে তার একাকিত্বই দর্শকের চোখে পড়ে।‘ফাউস্ট’–এর পর হলিউডে গিয়ে মুরনাউ নির্মাণ করেন ‘সানরাইজ: আ সং অব টু হিউম্যানস’ (১৯২৭)। ছবিটি প্রথম অস্কার আয়োজনে অনন্য, শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের পুরস্কারসহ তিনটি পুরস্কার পায়। তবে মুরনাউয়ের জীবন দীর্ঘ হয়নি। ১৯৩১ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি।
এক শতাব্দী পরও বিস্ময়‘ফাউস্ট’–এর শতবর্ষ উপলক্ষে ছবিটি আবার দর্শকের সামনে আনার উদ্যোগ নিয়েছে জার্মানির ফ্রিডরিখ উইলহেল্ম মুরনাউ ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণা অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর ভিসবাডেনের মুরনাউ ফিল্মথিয়েটারে ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনী হবে। সঙ্গে থাকবে সরাসরি সংগীত পরিবেশনা। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে প্রেক্ষাগৃহে ছবির সঙ্গে সরাসরি সংগীত পরিবেশনের প্রচলন ছিল। শতবর্ষের এই আয়োজনে সেই অভিজ্ঞতাই ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।ছবিটির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কাজও হয়েছে। মুরনাউ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে লুসিয়ানো বেরিয়াতুয়ার তত্ত্বাবধানে ছবিটি পুনরুদ্ধার করা হয়। ২০১৩ সালে এর ডিজিটাল সংস্করণ তৈরির কাজ সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটি। জার্মান ফিল্মপোর্টালের নথিতে ছবিটির ১০৭ মিনিটের ডিজিটাল সংস্করণের তথ্য রয়েছে।ফলে এক শতাব্দী আগে নির্মিত চলচ্চিত্রটি নতুন প্রজন্মের দর্শকেরও দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিনোদন–দুনিয়া এখন ওটিটির যুগে। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে প্রায় যেকোনো কাল্পনিক দৃশ্য তৈরি করা সম্ভব। অথচ ‘ফাউস্ট’ মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও নির্মাতাকে সৃজনশীল করে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: জার্মান ফিল্মপোর্টাল, ফ্রিডরিখ উইলহেল্ম মুরনাউ ফাউন্ডেশন, ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট, রজার এবার্টের চলচ্চিত্র সমালোচনা, প্রাচ্যনাটের ওয়েবসাইট এবং ফারুখ ধোন্ডির ‘আ ফাউস্ট ফর বাংলাদেশ’ (দ্য ডেইলি আই, ২ ডিসেম্বর ২০২১)।