ভিটামিন ডি নিয়ে একটা ভুল ধারণা হলো, অনেকে মনে করেন, সূর্যের আলোয় ভিটামিন ডি থাকে। ইদানীং এ ভুল ধারণার সঙ্গে তথাকথিত গবেষণার নামে আয়ুর্বেদবিদ এবং পুষ্টিবিদদের কেউ কেউ আরেকটা ভুল ধারণার প্রবর্তন করছেন। সেটি হলো, পানি কয়েক ঘণ্টা সূর্যের আলোয় রেখে দিলে তাতে সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি এসে মেশে। সেই পানি পানে দেহের ভিটামিন ডির চাহিদা পূরণও নাকি সম্ভব! আসলে ভিটামিন ডি নিয়ে এ দুটি ধারণার কোনোটাই সত্য নয়।
কারণ, সূর্যের আলোয় ভিটামিন ডি থাকে না। তাহলে সেটি কীভাবে সূর্যের আলো থেকে পানিতে আসবে? তা ছাড়া পানিতেও এমন কিছু নেই, যা সূর্যালোকের সঙ্গে বিক্রিয়ায় ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। কিন্তু যাঁরা পানিকে সূর্যের আলোয় রেখে ভিটামিন ডি পাচ্ছেন বলে গবেষণার নামে বিভ্রান্তি প্রচার করছেন, তাঁরা সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসা এই পানির একটা ইংরেজি বাহারি নাম দিয়েছেন। তাঁরা এটাকে বলছেন ‘সোলারাইজড ওয়াটার’, যার বাংলা পরিভাষা হতে পারে, সূর্যস্নাত পানি। মানে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসা পানি, যা সূর্যের আলো থেকে গুণগত উৎকর্ষ লাভ করেছে। এটাই নাকি সোলারাইজড ওয়াটার। কথা হচ্ছে, সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসা পানি আর যে গুণই লাভ করুক না কেন, তাতে কিন্তু ভিটামিন ডি যোগ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সূর্যের আলোয় ভিটামিন ডি না থাকলেও ভিটামিন ডি তৈরিতে সূর্যরশ্মির ভূমিকা আছে। আর এ কারণে এমন ভুল ধারণার উৎপত্তি।
ত্বকের উপরিভাগের স্তরের (এপিডার্মিস, যার পুরুত্ব ০.০৮-০.৬ মিমি) ভেতরে থাকে সেভেন ডিহাইড্রোকোলেস্টেরল। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বি (UVB) এ সেভেন ডিহাইড্রোকোলেস্টেরলকে ভিটামিন ডির পূর্বকণা কোলিক্যালসিফেরলে রূপান্তর করে। এটি ভিটামিন ডি৩ (ডি থ্রি) নামেও পরিচিত। এ ভিটামিন ডি৩ একটি বিশেষ প্রোটিনের সাহায্যে ত্বক থেকে রক্তের মাধ্যমে লিভারে গিয়ে পৌঁছায়। আরও কিছু প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর এটা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীরের কাজে লাগে। এ প্রক্রিয়ায় কিডনির বিশেষ ভূমিকা আছে। আলট্রাভায়োলেট রশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্যেরও একটা হিসাব আছে। তা ছাড়া ত্বকের রং নির্ধারণকারী রঞ্জক পদার্থ মেলানিনের সম্পর্ক আছে।
ত্বকে বেশি মেলানিনের উপস্থিতি ত্বকের রং গাঢ় বা বাদামি করে। মেলানিন অতিবেগুনি রশ্মিকে ত্বকে প্রবেশে বাধা দেয়। তাই যাঁদের ত্বক বাদামি, তাঁদের ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হতে সময় বেশি লাগে। তাই ভিটামিন ডি পেতে নির্দিষ্ট সময় ধরে ত্বককে রোদের সংস্পর্শে আনতে হবে।
পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি পেতে ত্বকের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশকে সূর্যরশ্মির সংস্পর্শে রাখতে হবে। সেটাও একটা বিবেচ্য বিষয়। ত্বক ও সূর্যালোকের এই বিক্রিয়া থেকে যে শুধু আমরা ভিটামিন ডি পাই, তা কিন্তু নয়। বিভিন্ন খাবারে এই ভিটামিন আছে। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম, গরুর কলিজা, পনির, মাশরুম ইত্যাদিতে ভিটামিন ডি আছে। তা ছাড়া ইদানীং অনেক দুধের মধ্যে ভিটামিন ডি যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে এটা বাধ্যতামূলক। আরও অনেক খাবারে আলাদা করে ভিটামিন ডি যোগ করা থাকে।
যাঁরা বলেন, বোতলভর্তি পানি রোদে রেখে দিলে তাতে রোদ থেকে ভিটামিন ডি পানিতে মিশবে, তাঁদের অবগতির জন্য বলি, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বি বা ইউভি বি কাচ বা প্লাস্টিকের ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। তার মানে, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বি কাচের কিংবা প্লাস্টিকের বোতলে রাখা পানির নাগাল পায় না।
কিছু আয়ুর্বেদ এবং পুষ্টিবিদের কেউ কেউ এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বের কথা প্রচার করছেন বটে, তবে তাঁরা কখনো রোদে রাখা পানির বোতলে ভিটামিনের পরিমাণ পরিমাপ করে দেখেছেন বলে জানা যায়নি। আর এটাই যদি সত্যি হতো, তাহলে নদী বা পুকুরের পানিতে তো ভরপুর ভিটামিন ডি থাকার কথা। সর্বোপরি আবারও বলছি, রোদ কিংবা পানিতে এমন কিছু নেই, যা থেকে কোনোভাবে ভিটামিন ডি তৈরি হতে পারে।
ঘরের ভেতর ইউভি বি পাওয়ার জন্য বিশেষ ল্যাম্প রয়েছে। চিকিৎসার জন্য সেটা ব্যবহৃত হয়।
সুতরাং তাত্ত্বিকভাবে গবেষণার নামে এ রকম অদ্ভুত তথ্য প্রচারের পেছনে অজ্ঞতা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এ কথা বলে সত্য বদলে ফেলা যাবে না।