রাশিয়া ও ইউক্রেন একটি ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মস্কো এ বিষয়ে নীরব। আর বিষয়টিকে নিজের জন্য ‘নতুন খবর’ আখ্যা দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই অনলাইন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির কথা প্রথম শুনলাম। তবে রাশিয়া প্রস্তুত থাকলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া গেলে, ইউক্রেনও হামলা বন্ধ করতে রাজি।’
এদিকে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির বার্তার মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রাশিয়া। এতে অনেক এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। শীতের তীব্রতা বাড়ার আগেই ইউক্রেনের অবকাঠামোয় হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
গত রোববার ইউক্রেনের দুটি শহরে রাশিয়ার হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে একটি দোকানে হামলায় তিনজন নিহত ও ২০ জন আহত হন। পশ্চিম ইউক্রেনের আরেকটি এলাকায় পৃথক রুশ হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন।
এদিকে রাশিয়া ও রুশ নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে ইউক্রেন। চলতি বছর এসব স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের দূরপাল্লার হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ লক্ষ্যে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত একটি ক্রয় ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। ইউরোপের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির রেকর্ড দাম কমানোর অংশ হিসেবে সম্প্রতি রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নিয়ে ডিজেল আমদানির চুক্তি করেন ট্রাম্প। এরপর থেকে তিনি ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের তাগিদ দিয়ে আসছেন। তবে ট্রাম্পের এই ডিজেল চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে এটিকে পুতিনের জন্য ‘উপহার’ বলেছেন জেলেনস্কি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জ্বালানি যুদ্ধবিরতির আহ্বানকে সমর্থন করলেও ডিজেল চুক্তির বিরোধিতা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিন জন ডেমোক্র্যাট ও চারজন রিপাবলিকান সিনেটর যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসের পাস করা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে রাশিয়ার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল।
পাল্টা জবাব দেবে ইউক্রেন: জেলেনস্কি ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকলে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জেলেনস্কি। গতকাল সোমবার পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে ইউরোপের নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘চলতি শীতে রাশিয়া যদি জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়, তবে ইউক্রেনও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।’ ইউক্রেনের জনগণ আসন্ন শীত পার করে আরও দৃঢ় মনোবল ও লড়াইয়ের সংকল্প নিয়ে বেরিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ট্রাম্পের দাবি মেনে নিয়ে নির্বাচন আয়োজন করতে তিনি প্রস্তুত। সে ক্ষেত্রে পুতিনকে প্রথমে পূর্ণাঙ্গ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে।
তবে সাময়িক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, মস্কো সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি চায়। ট্রাম্পের ঘোষিত রাশিয়া-ইউক্রেন ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। খবর বিবিসি, সিএনএন ও দ্য গার্ডিয়ানের।