জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে ইমাম হাসান তাইমকে গুলি করে হত্যার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন পুলিশেরই তিন সদস্য। এই ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার যুক্তিতর্কের সময় এই তথ্য উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ সোমবার যুক্তিতর্ক শুরু হয়।
প্রথমে প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষ) পক্ষ থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। পরবর্তী যুক্তি উপস্থাপনের জন্য ২৫ অক্টোবর পরবর্তী দিন রাখা হয়েছে।
পরে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তাইম হত্যার প্রমাণ হিসেবে পুলিশের তৎকালীন উপকমিশনার ইকবাল হোসাইনের সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের একটা ভিডিও আছে, ‘গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না’। এই ভিডিওটা সোমবার আদালতে প্রদর্শন করা হয়েছে। তাকে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন তিনজন। তারা হচ্ছেন– যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন এবং সাবেক এসআই-নিরস্ত্র সাজ্জাদ উজ জামান। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী রাহাত, দোকানদার লিটন এই দুজনকেই পরীক্ষা করা হয়েছে এবং অপর সাক্ষী শাহরিয়ার– তিনি মৃত্যুবরণ করায় তার জবানবন্দিটা আমরা বিবেচনায় নিতে বলেছি। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের উপপরিদর্শক মো. ময়নাল হোসেন ভূঁইয়ার ছেলে ইমাম হাসান তাইম।
এ মামলায় ১১ আসামি হলেন– ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন, সাবেক এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান ও মো. শাহদাত আলী। এর মধ্যে আবুল হাসান ও শাহাদাত গ্রেপ্তার রয়েছেন।
‘মর্গে গিয়ে দেখি ছেলে ইসমাইলের লাশ পড়ে আছে’ এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ মোহাম্মদ ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তার।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন তিনি। জবানবন্দিতে তাসলিমা আক্তার বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে বিকেল ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হন তার ছেলে ইসমাইল। মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেন। এরপর ইসমাইলকে কয়েকবার ফোন দিয়ে ফোন না ধরায়, তার বন্ধু কালু ফোন ধরে। কালু জানায়, ইসমাইল গুলি খেয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি জবানবন্দিতে বলেন, কমিশনার আমিন, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবের হাতে অস্ত্র ছিল। তার সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। তাসলিমা বলেন, ‘মর্গে গিয়ে দেখি, তার মাথায় গুলি লেগেছে।’ ছেলেকে হত্যার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিশনার আমিন, কমিশনার রাজিব, রাসেল, কমিশনার আমিনের পিএস বিপ্লবসহ অনেকে দায়ী বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। তাসলিমা বলেন, তার মেয়ে রনি ইউটিউবে ছেলের হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখিয়েছেন। ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেন তিনি।
মোহাম্মদপুরের এ হত্যার ঘটনায় শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এ মামলায় চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী।