এই বৎসরও বাংলাদেশ মানব পাচার নির্মূলের ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করিতে পারে নাই বলিয়া বৃহস্পতিবার প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে যাহা বলা হইয়াছে উহা উদ্বেগজনক। উক্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়া শনিবার সমকাল জানাইয়াছে, বিগত বৎসরের তুলনায় বাংলাদেশ সামগ্রিকভাবে মানব পাচারবিরোধী কার্যক্রমে বেশি প্রচেষ্টা চালাইলেও উক্ত সূচকে তাহার অবস্থান পূর্বের ন্যায় দ্বিতীয় স্তরেই রহিয়া গিয়াছে। এই বৎসর লইয়া টানা সপ্তমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচারবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ একই অবস্থানে তথা থাকিয়া গেল। অর্থাৎ সাত বৎসর ধরিয়া মানব পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়া চলিয়াছে। উল্লেখ্য, মানব পাচার প্রতিরোধসংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অবস্থান তুলিয়া ধরিয়া যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বৎসর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণকারী দেশসমূহকে প্রথম ধাপে রাখা হয়। আর যেই সকল দেশ নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড সম্পূর্ণ অর্জন করিতে না পারিলেও উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাইয়াছে সেগুলিকে দ্বিতীয় ধাপে রাখিয়া, ন্যূনতম মানদণ্ড অর্জন করিতে ব্যর্থ, আবার উল্লেখযোগ্য চেষ্টাও চালাইতেছে না, এমন দেশগুলিকে রাখা হয় তৃতীয় ধাপে।
দ্বিতীয় ধাপে বাংলাদেশের প্রতিবেশীদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাকে দেখিয়া হয়তো অনেকে একপ্রকার সন্তোষ খুঁজিতে পারেন এই অজুহাতে যে, অন্তত প্রতিবেশীদের তুলনায় আমরা পিছাইয়া নাই। তদুপরি, মার্কিন প্রতিবেদনে মানব পাচার রোধে ‘উল্লেখযোগ্য’ প্রচেষ্টা গ্রহণের স্বীকৃতি থাকায় সরকারও আত্মতুষ্টিতে ভুগিতে পারে। কিন্তু কোনো একটা আন্তর্জাতিক সূচকে অর্ধযুগের অধিক সময় যাবৎ একই অবস্থানে থাকার অর্থ উক্ত ক্ষেত্রে অধঃপতন না ঘটিলেও উন্নতি ঘটে নাই এবং যুক্তরাষ্ট্র যাহাই বলুক মানব পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রেও কোনো অগ্রগতি নাই। এই অবস্থা এমন এক সময়ে চলিতেছে, যখন পাচারকারীরা প্রতিবৎসর কয়েক সহস্র মানুষকে বিভিন্ন উন্নত দেশে উচ্চ বেতনে চাকুরির প্রলোভন দেখাইয়া জিম্মি করে এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যমে হতভাগ্যদের নিকট হইতে বিপুল অর্থ আদায় করিয়া সংশ্লিষ্ট সমগ্র পরিবারকে নিঃস্ব করে। শুধু উহাই নহে, বহু বাংলাদেশি পাচারকারী দেখানো পথে ভূমধ্যসাগর বা বিপৎসংকুল বন-জঙ্গল অতিক্রম করিতে গিয়া মৃত্যুমুখেও পতিত হয়। এই পরিস্থিতি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত রিয়া থাকে, যাহার নেতিবাচক প্রভাব রেমিট্যান্স-নির্ভর জাতীয় অর্থনীতির উপর পড়িতে বাধ্য। এই প্রেক্ষাপটে আমরা মনে করি, মার্কিন প্রতিবেদনে উন্নতি ঘটাইতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার জন্য যেই সকল বিষয়কে দায়ী করা হইয়াছে সেইগুলির পাশাপাশি অন্য কারণও খতাইয়া দেখিয়া প্রতিকারের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদন অনুসারে, সরকার মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ২০২৬ পাস করিলেও কার্যক্ষেত্রে উহার প্রয়োগে দুর্বলতা রহিয়া গিয়াছে। এই কারণে একদিকে যদ্রূপ পূর্বের তুলনায় কমসংখ্যক মানব পাচারকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হইয়াছে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে মানব পাচার দমনে সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করে নাই। ফলস্বরূপ এই ধরনের অপরাধের বিস্তারও ব্যাপক রহিয়া গিয়াছে। এমনকি উক্ত অপরাধের ভুক্তভোগী শনাক্ত করিবার ক্ষেত্রেও সরকার পূর্বাপেক্ষা কম উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ অপর্যাপ্ত রহিয়া গিয়াছে, এমন অভিযোগও আছে উক্ত প্রতিবেদনে। উদাহরণস্বরূপ সেইখানে বিশেষত রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং দেশে ফিরিয়া আসা বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের কথা বলা হইয়াছে। প্রতিবেদনে বিনা পয়সায় অভিবাসনের সুযোগ পাওয়ার যোগ্য শ্রমিকদের নিকট হইতে অতিরিক্ত নিয়োগ ফি নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি অনেক অভিবাসী শ্রমিকের ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়া এবং মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়িবার কথাও বলা হইয়াছে। আমাদের প্রত্যাশা, উক্ত প্রতিবেদনকে আমলে লইয়া সরকার মানব পাচারকারীদের শাস্তি এবং নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ করিবে। সচেতন নাগরিকদেরও এই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার থাকিতে হইবে।
মতামত