কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের কৌশল কি শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওরাকলের জন্য? প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ঋণ পরিশোধের চাপের মধ্যে প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আর এর কেন্দ্রে রয়েছেন ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও অন্যতম প্রধান শেয়ারহোল্ডার ল্যারি এলিসন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ মেক্সিকোতে ওপেনএআইয়ের জন্য নির্মাণাধীন বিশাল ডেটা সেন্টার প্রকল্প ‘প্রজেক্ট জুপিটার’-এর বিদ্যুৎ সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতায় ওরাকল ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ ঘোষণা করে।
চুক্তিতে ব্যবহৃত এই আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কোনও পক্ষ নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা থেকে সাময়িক অব্যাহতি চাইতে পারে।
প্রকল্পটির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবরে ওই দিন ওরাকলের শেয়ারের দাম ৭ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যায়। এতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এলিসনের ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্য প্রায় ৭২০ কোটি ডলার কমে যায়।
একসময় বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের তালিকার শীর্ষে থাকা এলিসন এখন ফোর্বসের তালিকায় অনেক নিচে নেমে গেছেন। একই সঙ্গে ওরাকলের শেয়ারদর সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাজারমূল্যের হিসাবে এই পতনের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, এআই খাতে ভবিষ্যতের বিপুল চাহিদার ওপর ভর করে নেওয়া এলিসনের বড় বিনিয়োগের কৌশল কি এখন তার নিজের জন্যই আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে?
চুক্তি থেকে সহজে বের হওয়ার সুযোগ নেই প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা সামনে রেখে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে বিশাল চুক্তি থেকে সরে আসার পথ খুঁজছে ওরাকল। কিন্তু চুক্তির শর্তের কারণে বিষয়টি এত সহজ নয়।
ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, নিউ মেক্সিকোর ডেটা সেন্টারে নির্ধারিত সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওরাকলের ওপরই রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর অনুমোদন পেতে দেরি হলে তার প্রভাব সরাসরি কোম্পানিটির ওপর পড়তে পারে।
সমস্যাটি কেবল একটি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। গত আগস্ট পর্যন্ত ওরাকলের ত্রৈমাসিক আর্থিক নথি অনুযায়ী, প্রজেক্ট জুপিটারের মতো আরও প্রায় ২৮৮ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব চুক্তির মেয়াদ ১৫ থেকে ১৯ বছর।
এই অংক ওরাকলের বার্ষিক মোট রাজস্বের চার গুণেরও বেশি। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে ডেটা সেন্টার পরিচালনা ও গ্রাহকদের চাহিদা ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানটিকে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেটা সেন্টারগুলো পুরোপুরি হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত এসব চুক্তির সম্পূর্ণ দায় প্রচলিত ঋণের মতো সরাসরি ব্যালান্স শিটে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। ফলে কোম্পানির আর্থিক ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগত দায়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদনই বড় বাধা নিউ মেক্সিকোর প্রজেক্ট জুপিটারের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনায় রয়েছে কাছাকাছি একটি প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত অনুমোদন এবং গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কেন্দ্রীয় অনুমোদন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এসব অনুমোদন সময়মতো না মিললে ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ সরবরাহ বিলম্বিত হতে পারে। আর পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ছাড়া এআই মডেল প্রশিক্ষণ, ক্লাউড কম্পিউটিং ও বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য নির্মিত অবকাঠামো প্রত্যাশিত সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হবে না।
এতে একদিকে নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে, অন্যদিকে গ্রাহকদের সঙ্গে করা চুক্তি পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি ইজারার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিলম্বের আর্থিক প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অবকাঠামো প্রস্তুত না হলেও কিছু ব্যয় ও চুক্তিগত দায় বহাল থাকতে পারে।
ওরাকলের পুরোনো কৌশলেই নতুন ঝুঁকি তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাতে চার দশক ধরে ওরাকল পরিচিত কঠোর চুক্তির জন্য। প্রতিষ্ঠানটির সফটওয়্যার ও সার্ভার লাইসেন্স ব্যবহারের শর্ত নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে। আইটি খাতে প্রচলিত ঠাট্টায় অনেক গ্রাহক নিজেদের ‘ওরাকলের জিম্মি’ বলেও উল্লেখ করেন।
ওরাকলের ব্যবসায়িক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ধারাবাহিক আয় নিশ্চিত করা। কিন্তু এআই অবকাঠামোর বাজারে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে প্রযুক্তির চাহিদা, কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রয়োজন এবং গ্রাহকদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
ওরাকলের অন্যতম প্রধান গ্রাহক ওপেনএআইও তাদের ক্লাউড অবকাঠামোর চাহিদা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এএমডি, মাইক্রোসফট অ্যাজুর ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের মতো বিকল্প প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ফলে ওপেনএআইয়ের চাহিদা পূরণে ওরাকলের ওপর নির্ভরতা কতটা থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ওপেনএআই ভবিষ্যতে ওরাকলের কাছ থেকে নেওয়া সক্ষমতা কমিয়ে দিলে বা প্রত্যাশিত পরিমাণ কম্পিউটিং সেবা না নিলে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ, ওরাকলকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা ও অবকাঠামোর ব্যয় বহন করতে হবে, অথচ সেই সক্ষমতা থেকে প্রত্যাশিত আয় নাও আসতে পারে।
এ অবস্থায় অন্য গ্রাহকদের কাছে অব্যবহৃত সক্ষমতা বিক্রি করতে না পারলে কোম্পানিটির লোকসানের ঝুঁকি বাড়বে। অর্থাৎ, অন্যদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বেড়াজালে আটকে রাখার জন্য পরিচিত ওরাকল নিজেই এখন গ্রাহকের চাহিদা ও অবকাঠামোগত দায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে।
১৮ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও ঋণখেলাপির শঙ্কা ওরাকলের বিশাল এআই অবকাঠামো প্রকল্পগুলো অর্থায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রায় ২০টি ব্যাংক ১৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ঋণ ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায় নিয়ে বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে।
বন্ডবাজারে ওরাকলের ঋণপত্র এবং ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপের (সিডিএস) পরিস্থিতি প্রতিষ্ঠানটির ঋণঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিডিএস হলো এমন একটি আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে ঋণখেলাপির ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা কেনা যায়। সাধারণত এই সুরক্ষার ব্যয় বেড়ে গেলে বাজারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি ওরাকলকে ‘ট্রিপল-বি মাইনাস’ রেটিং দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বিনিয়োগযোগ্য ঋণমানের সর্বনিম্ন ধাপ। এর এক ধাপ নিচে নামলে প্রতিষ্ঠানটির ঋণপত্র জাঙ্ক বা বিনিয়োগ-অনুপযোগী শ্রেণিতে পড়বে।
তবে ঋণঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিতভাবেই ঋণখেলাপি হতে যাচ্ছে। বরং এটি বোঝায়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বাজারের উদ্বেগ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে নতুন অর্থায়ন পাওয়া আরও ব্যয়বহুল হতে পারে।
সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে এলিসন ওরাকলের আর্থিক সংকটের আশঙ্কা শুধু প্রতিষ্ঠানটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে এলিসনের ব্যক্তিগত সম্পদেও। তিনি ওরাকলের প্রায় ৩৮ শতাংশ শেয়ারের মালিক। নিজের ব্যাংকঋণ ও ব্যক্তিগত ঋণের জামানত হিসেবে কোম্পানিটির প্রায় ৪১ কোটি ৩০ লাখ শেয়ার বন্ধক রেখেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেয়ারের দাম কমলে এসব জামানতের বাজারমূল্যও কমে যায়। ফলে ঋণদাতারা অতিরিক্ত জামানত চাইতে পারেন কিংবা ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তবে শেয়ারের দাম কমলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমপরিমাণ নগদ অর্থের ক্ষতি হয় না; এর প্রভাব নির্ভর করে ঋণের শর্ত ও জামানতের ব্যবস্থার ওপর।
এর পাশাপাশি এলিসন তার ছেলের প্রযোজনা সংস্থার প্যারামাউন্ট-ওয়ার্নার ব্রাদার্স চুক্তির জন্য ব্যক্তিগতভাবে ৪৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের নিশ্চয়তা দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই নিশ্চয়তার প্রকৃতি ও কার্যকর হওয়ার শর্তের ওপর নির্ভর করে এটি তার ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অর্থাৎ, ওরাকলের শেয়ারদর আরও কমলে এলিসনের সম্পদের মূল্য হ্রাসের পাশাপাশি তার ঋণের জামানতসংক্রান্ত চাপও বাড়তে পারে। আর একাধিক বড় আর্থিক দায় একসঙ্গে সামনে এলে ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সামনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিন ওরাকলের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মূল্যায়নে আগামী কয়েক সপ্তাহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সময়সূচি অনুযায়ী, ২৩ নভেম্বর নিউ মেক্সিকো রাজ্য সরকার প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে। এরপর ৩ ডিসেম্বর গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত আসার কথা। আর ১৪ ডিসেম্বর ওরাকল তাদের পরবর্তী ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল ও নগদ প্রবাহের তথ্য প্রকাশ করবে।
এই সিদ্ধান্তগুলো প্রকল্পের অগ্রগতি, বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা এবং কোম্পানির আর্থিক অবস্থার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব তারিখে সিদ্ধান্ত এলেই ওরাকলের সব ঝুঁকির সমাধান হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
শেষ পর্যন্ত ওরাকলের এআই বিনিয়োগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো অবকাঠামো চালু করতে পারে কি না, ওপেনএআইসহ বড় গ্রাহকদের চাহিদা ধরে রাখতে পারে কি না এবং বিপুল দীর্ঘমেয়াদি দায় সামাল দেওয়ার মতো আয় ও নগদ প্রবাহ তৈরি করতে পারে কি না, তার ওপর।
চার দশক ধরে কঠোর চুক্তি ও সফটওয়্যার লাইসেন্সের মাধ্যমে ব্যবসায়িক অবস্থান শক্তিশালী করেছে ওরাকল। কিন্তু এআইয়ের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাজারে সেই একই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এলিসনের সামনে তাই প্রশ্ন শুধু তার সম্পদ রক্ষার নয়; বরং এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে তোলা ওরাকলের ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেল কতটা টেকসই, সেটিও এখন বড় পরীক্ষা।
বিডি প্রতিদিন/একেএ
মতামত