ঢাকা    মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩
Advance News

সারায়েভো: ইউরোপের জেরুজালেম



সারায়েভো: ইউরোপের জেরুজালেম
সারায়েভো: ইউরোপের জেরুজালেম

ওয়ারশ থেকে পোলিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৫৭৯ পৌনে দুই ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে।

ইউরোপের বহু শহর দেখেছি; কিন্তু আকাশ থেকে সারায়েভোকে প্রথম দেখার অনুভূতিটি আলাদা। আধুনিক নগরায়ণ এখানে প্রকৃতিকে গ্রাস করেনি, বরং পাহাড়, নদী আর মানুষের বসতি মিলে শহরটিকে যেন একটি প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের মধ্যে গড়ে তুলেছে। পাহাড়ের মাঝখানে গভীর এক উপত্যকা। সেই উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলেছে মিলিয়াতস্কা নদী, আর নদীর দুই পাশ থেকে পাহাড়ের ঢালে ঢালে উঠে গেছে ঘরবাড়ি।

আরেকটি দৃশ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ল—পাহাড়ের কোলে কোলে অসংখ্য মসজিদের সরু মিনার। মূলত এক মিনারবিশিষ্ট মসজিদ। অটোমান স্থাপত্যে দুই বা তার বেশি (চার বা ছয়টি) মিনারবিশিষ্ট মসজিদগুলোকে বলা হতো ‘সেলাতিন মসজিদ’ বা রাজকীয় মসজিদ বা সুলতানি মসজিদ।

বলকান অঞ্চলের অটোমান স্থাপত্যের মসজিদগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ সাদৃশ্য আছে। বসনিয়ার মসজিদগুলোতে অটোমান স্থাপত্যের সেই পরিচিত ছাপ—কেন্দ্রীয় গম্বুজ, সরু মিনার, সংযত অলংকরণ—বারবার ফিরে আসে। উপমহাদেশের মসজিদগুলোর স্থাপত্যে বলকানের মতো এ রকম অভিন্নতা দেখা যায় না।

বিমান থেকে দেখা সেই মিনারগুলো যেন দূর থেকেই জানিয়ে দিচ্ছিল—এটি ইউরোপের আর দশটি রাজধানীর মতো শুধু একটি আধুনিক শহর নয়; এর আত্মার গভীরে কয়েক শতাব্দীর মুসলিম-অটোমান ইতিহাসও রয়েছে।

সারায়েভো বিমানবন্দর—

সারায়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ইতিহাসের সাক্ষী বিমানবন্দরটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ১৯৯২–৯৫ সালের সারায়েভো অবরোধ। বিমানবন্দরের রানওয়ে পেরিয়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরে রানওয়ের নিচ দিয়ে খনন করা সারায়েভো টানেল অবরুদ্ধ শহরের সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে। যুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট বিমানবন্দরটি আবার বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে শহরের দিকে রওনা হলাম।

পাহাড়, নদী ও ইতিহাসের শহর—

ট্যাক্সির জানালা দিয়ে সারায়েভোকে আরও কাছ থেকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, কিছু শহরকে বুঝতে হলে তার স্থানীয় রাস্তা দিয়ে যেতে হয়, হাইওয়ে নয়। বিমান থেকে যে পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখেছিলাম, এবার তার সঙ্গে যোগ হলো মানুষের জীবন—রাস্তার পাশে বাড়ি, দোকান, ট্রামলাইন, নদী আর পাহাড়ের গায়ে উঠে যাওয়া বসতি।

সারায়েভো শহরটির আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে অটোমান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়—দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের স্থাপত্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সরু গলি, বাজার, মসজিদ ও মিনার; অন্যদিকে ইউরোপীয় ধাঁচের প্রশস্ত রাস্তা, প্রশাসনিক ভবন ও ক্যাথেড্রাল।

অটোমান গভর্নর ইসা-বেগ ইশাকোভিচের উদ্যোগে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সারায়েভোর নগরজীবনের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করে। মসজিদ, হামাম, সরাই ও বাজারকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে শহরটি।

ইসা বেগভ হামাম হোটেল—

আমার থাকার জায়গা ইসা বেগভ হামাম হোটেল। হোটেলটির নাম দেখেই ভালো লেগেছিল। কারণ, এটি সাধারণ কোনো আধুনিক হোটেল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সারায়েভোর প্রতিষ্ঠাতা ইসা-বেগ ইশাকোভিচের নাম এবং একটি ঐতিহাসিক তুর্কি হামামের স্মৃতি।

হোটেলের ভেতরে ঢুকেই আধুনিক হোটেলের চেয়ে অন্য রকম একটা আবহ বিশেষ করে অটোমান ঐতিহ্যের আমেজ পেলাম—কাঠের মেঝে, হাতে খোদাই করা অটোমান নকশার আসবাব, কার্পেট, ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা। মনে হলো, হোটেলে থাকা নয়, যেন সারায়েভোর ইতিহাসের একটি ছোট অংশের ভেতর রাত কাটাতে এসেছি। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার—নামের সঙ্গে মিল রেখে এখানে ঐতিহাসিক হামামের ঐতিহ্যও ধরে রাখা হয়েছে।

তুর্কি হামাম ম্যাসাজ—

এটি হলো অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের এক অনন্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। রোমান ও বাইজেন্টাইন স্নানাগারের আদলে অনুপ্রাণিত হয়ে অটোমানরা একে এক পরম আরামদায়ক ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধি প্রথায় রূপ দেয়। এটি কেবল শরীর পরিষ্কার করার মাধ্যম নয়, বরং পেশির ক্লান্তি দূর করা, রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো এবং মানসিক প্রশান্তির একটি প্রাচীন থেরাপি।

হোটেলের অতিথি হিসেবে ৪০ ইউরোতে প্রায় দুই ঘণ্টার ম্যাসাজের ব্যবস্থা হলো। ইসলামিক রেওয়াজ অনুসারে হামাম ম্যাসাজে নারী অংশ নারী দ্বারা পুরুষ অংশ পুরুষ দ্বারা পরিচালিত।

তুর্কি হামাম ম্যাসাজ মূলত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। শরীর গরম করা এবং ঘামানোর পর্যায়ে প্রথমে শরীরকে আর্দ্র ও উষ্ণ বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। ঐতিহ্যবাহী সুতি তোয়ালে জড়িয়ে গ্রাহক হামামের কেন্দ্রস্থলে থাকা একটি বিশাল, উত্তপ্ত মার্বেল পাথরের ওপর শুয়ে থাকেন শরীরের লোমকূপগুলো খুলে যায়, পেশি শিথিল হয় এবং ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বা বর্জ্য বেরিয়ে আসে।

এরপর শুরু হলো স্ক্রাবিং। খসখসে বিশেষ দস্তানা—কেশে বা kese—দিয়ে শরীর ভালোভাবে ঘষে মৃত চামড়ার স্তর পরিষ্কার করা হলো। তারপর পানি দিয়ে শরীর ধুয়ে শুরু হলো হামামের সবচেয়ে আনন্দদায়ক অংশ—সাবানের ফেনার ম্যাসাজ।

বিশেষ সুতি কাপড়ের ব্যাগে সাবান ও পানি নিয়ে বাতাসে দোলাতে দোলাতে প্রচুর ফেনা তৈরি করা হয়। সেই তুলতুলে সাদা ফেনায় শরীর ঢেকে দিয়ে শুরু হলো ম্যাসাজ। হাত, পা, পিঠ—ধীরে ধীরে শরীরের ক্লান্ত পেশিগুলো যেন আরাম পেতে শুরু করল।

ম্যাসাজ শেষে শরীরকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ঠান্ডা বা মৃদু উষ্ণ ঘরে বিশ্রাম নিতে হয়। এ সময় ঐতিহ্যবাহী তুর্কি চা পরিবেশন করা হয়।

ম্যাসাজের আগে–পরে প্রবাহিত গরম পানির বাথটাবে (Jacuzzi বা Hot Tub) ইচ্ছেমতো রিল্যাক্স করতে পারেন।

সম্রাটের মসজিদ—

হোটেল থেকে বেরিয়ে হোটেলের পাশেই চোখে পড়ল প্রথম যে ঐতিহাসিক অটোমান স্থাপনা, সেটি হচ্ছে সম্রাটের মসজিদ। এটি সারায়েভোর প্রথম অটোমান লিগ্যাসি। ১৪৫৭ সালে অটোমানরা বসনিয়া জয় করার পর এটিই ছিল সারায়েভোতে নির্মিত প্রথম মসজিদ। মিলিয়াতস্কা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ ইসা-বেগ ইশাকোভিচ ১৪৫০-এর দশকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ—মেহমেদ দ্য কনকারারের নামে উৎসর্গ করা হয়। রাজকীয় কোষাগারের অর্থায়নে তৈরি হওয়ায় একে ‘ইমপেরিয়াল বা এমপেররস মস্ক’ বলা হয়। আসরের নামাজ পড়ে নিলাম এই মসজিদে।

ফারহাদিজা মসজিদ—

এরপর গেলাম ফারহাদিজা মসজিদে। সারায়েভোর পুরোনো শহরের কেন্দ্রের এই মসজিদও অটোমান যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য। এর সঙ্গে যুক্ত ফারহাদ-বেগের ওয়াক্ফ এবং সারায়েভোর ধর্মীয়-সামাজিক ইতিহাসের দীর্ঘ অধ্যায়। যুদ্ধে এই মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মসজিদ ভবনটি ২০০৪ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষিত হয়।

গাজি হুসরেভ বেগ মসজিদ—

এশার আগে আগে পৌঁছালাম সারায়েভোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অটোমান স্থাপনাগুলোর একটির সামনে—গাজি হুসরেভ বেগ মসজিদ। ষোড়শ শতকের এই মসজিদ ১৫৩০–৩১ সালে নির্মিত। গাজি হুসরেভ বেগ ছিলেন বসনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী অটোমান প্রশাসক। তাঁর সমাধিও মসজিদের প্রাঙ্গণে।

এ মসজিদটিকে দেখে মনে হয়েছে মসজিদ নয়, কমিউনিটি সেন্টার। মসজিদের ভিন্ন ভিন্ন পাশে নারী–পুরুষ নামাজ পড়ছে আর মায়েদের সঙ্গে আসা বাচ্চারা খেলছে মসজিদ প্রাঙ্গণে। সাধারণত অটোমান স্থাপত্যের মসজিদের মধ্যে একটি ঝরনা থাকে আর দুপাশে বসার জায়গা থাকে। বসনিয়ার মসজিদে দেখেছি মসজিদ চত্বরে নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসে গল্প করছে, কফি পান করছে, নামাজের সময় যার যার নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে নামাজ পড়ছে।

মসজিদ ব্যবস্থাপনায় পাক ভারত উপমহাদেশের সঙ্গে এই দৃশ্যপটের কোনো মিল নেই। মসজিদের গম্বুজ, মিনার ও প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এখানে ধর্মীয় স্থাপত্য শুধু নামাজের জায়গা তৈরি করেনি—একটি শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকেও সংগঠিত করেছে।

বাশচারশিয়া—সারায়েভোর প্রাণ—

তারপর হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম বাশচারশিয়ায়। সরু পাথরের রাস্তা, ছোট ছোট দোকান, কারুশিল্পের পসরা, কফির দোকান, রেস্তোরাঁ—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন আধুনিক ইউরোপের মাঝখানে একটি জীবন্ত অটোমান বাজার। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে নির্মিত এই প্রাচীন বাজারটিকে এককথায় সারায়েভোর প্রাণ বলা হয়।

‘বাশচারশিয়া’ নামটি এসেছে তুর্কি শব্দ ‘Ba’ (প্রধান বা মাথা) এবং ‘ar’ (বাজার) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘প্রধান বাজার’। ১৪৬২ সালে সারায়েভো শহরের প্রতিষ্ঠাতা ইসা-বেগ ইশাকোভিচ এই বাজারের গোড়াপত্তন করেন। এটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বাণিজ্যের একটি অন্যতম প্রধান মিলনস্থল বা সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

বাশচারশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই কাঠ ও পাথরের তৈরি ঐতিহাসিক ফোয়ারা সেবিল সারায়েভো শহরের প্রধান প্রতীক। ১৭৫৩ সালে নির্মিত এই ছাতা আকৃতির ফোয়ারাটি থেকে পথচারীরা বিনা মূল্যে জল পান করতেন। এর চারপাশে শত শত পায়রা চড়ে বেড়ায় বলে পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

তামজিয়া বা কামারদের গলি হচ্ছে বাশচারশিয়ার অন্যতম প্রাচীন গলি, যেখানে আজও তামা ও পিতলের তৈজসপত্র, ঐতিহ্যবাহী তুর্কি কফি সেট এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরির ঠুকঠাক শব্দ শোনা যায়। শত বছর ধরে এই শিল্পীরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাজের লিগ্যাসি ধরে রেখেছেন।

বাশচারশিয়ার রয়েছে বিশাল রেস্তোরাঁ পাড়া। রাতের খাবারের জন্যে ঢুকে গেলাম এক রেস্তোরাঁয়। বসনীয় চেভাপি না খেলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সোমুনের (বিশেষ রুটি) ভেতরের তুলতুলে সুস্বাদু কাবাব এবং পেঁয়াজ দিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়। ব্যুরেক অর্থাৎ পাতলা পেস্ট্রি বা মচমচে রুটির ভেতরে মাংস, পনির বা পালংশাকের পুর দেওয়া একধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার আর বসনীয় কফির সঙ্গে ‘রাহাত লোকুম’ (Turkish Delight)–এর স্বাদ নিতে ভুল হয়নি।

বাশচারশিয়ার অটোমান ঐতিহ্য থেকে কিছুটা হাঁটলেই শুরু অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান আমলের ইউরোপীয় স্থাপত্য। এই বৈচিত্র্যের জন্যে সারায়েভোকে বলা হয় ‘ইউরোপের জেরুজালেম’।

রাত হয়ে যাওয়ায় আপাতত হোটেলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। শহরের কেন্দ্রের দিকে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ভবনগুলো, সংসদ ভবন, সরকারি দপ্তর, আধুনিক সারায়েভোর নগরচিত্র আর যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন দেখার ইচ্ছা পরের দিনের জন্য তুলে রাখলাম।

তবে হোটেলে ফেরার আগে হোটেলের কাছেই সারায়েভো সিটি হলের আলো ঝলমলে রূপটি উপভোগ করতে চাইলাম। মিলিয়াতস্কা নদীর ওপারে সিটি হলের ঠিক মুখোমুখি রয়েছে একটি আধুনিক, সোনালি রঙের বড় ত্রিমাত্রিক (3D) অক্ষরের ‘SARAJEVO’ সাইন বা ফলক। এটি মূলত পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় ফটো স্পট। রাতের বেলা এই চমৎকার সাইনটি আলো দিয়ে প্রজ্বলিত করা হয়, যা ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা জমকালো সিটি হলের সঙ্গে দারুণ এক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। ছবি তুলতে ভুলে যাইনি অবশ্য।

একটি দুর্ভাগা সেতু এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ—

পরের দিন সকালে উঠে হোটেলের সামনেই অবস্থিত ল্যাটিন ব্রিজ দেখতে গেলাম। মিলিয়াতস্কা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট, শান্ত এই অটোমান সেতুটিকে দেখে প্রথমে বোঝার উপায় নেই যে এর আশপাশেই সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড একসময় পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

১৯১৪ সালের ২৮ জুন। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড এবং তাঁর স্ত্রী সোফি সারায়েভো সফরে এসেছিলেন। শহর হল পরিদর্শনের পর তাঁদের গাড়িবহর যখন মিলিয়াতস্কা নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন বসনিয়ান সার্ব জাতীয়তাবাদী তরুণ গাভরিলো প্রিন্সিপ তাঁদের ওপর গুলি চালায়। ঘটনাটি ল্যাটিন ব্রিজের উত্তর প্রান্তে নদীর তীরবর্তী রাস্তার মোড়ে ঘটে।

ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ডের পরিণতি ছিল খুব ভয়াবহ। ফলশ্রুতিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর একে একে ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। চার বছরের সেই যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ নিহত ও আহত হয়; ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে যায়, কয়েকটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যায়।

ল্যাটিন ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাসের কথা ভাবলে বিস্ময় জাগে—একটি শহরের একটি ছোট্ট রাস্তা, একটি মুহূর্ত, একজন আততায়ী এবং কয়েকটি গুলি কীভাবে গোটা পৃথিবীকে যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে!

মার্শাল টিটো সড়কে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সি ভবন—

ল্যাটিন ব্রিজ দেখে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সারায়েভোর কেন্দ্রে মার্শাল টিটো সড়কে। সারায়েভোর এই প্রধান সড়কটির নাম যুগোস্লাভিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা জোসিপ ব্রজ টিটোর নামে।

এই সড়কের ১৬ নম্বরে চোখে পড়ল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রেসিডেন্সি ভবন। বাইরে থেকে দেখলে প্রথমেই বোঝা যায়, এটি অটোমান আমলের কোনো স্থাপনা নয়। বিশাল প্রাসাদসদৃশ ভবনের সম্মুখভাগে ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যের স্পষ্ট ছাপ।

কিন্তু ভবনটির ইতিহাস শুধু স্থাপত্যের ইতিহাস নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি বসনিয়ার সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সমাজতান্ত্রিক যুগে এটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্সির আসন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বসনিয়ার যুদ্ধে সারায়েভো যখন অবরুদ্ধ, চারদিক থেকে গোলাবর্ষণের মধ্যে তখনো এই ভবনের ভেতর থেকেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও সামরিক কমান্ডের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

আজ এটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সমষ্টিগত রাষ্ট্রপ্রধানের দপ্তর। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্সি তিন সদস্যের—একজন বসনিয়াক, একজন ক্রোয়াট ও একজন সার্ব সদস্য নিয়ে গঠিত। এই ভবনেই তাঁদের দপ্তর ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

মার্শাল টিটো সড়ক ধরে আরও এগিয়ে এলাম সারায়েভোর আধুনিক প্রশাসনিক এলাকায়। চোখে পড়ল একেবারে ভিন্ন ধরনের স্থাপত্য—বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সংসদ ভবন। ভবনটি শহরের বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্কয়ারে অবস্থিত। ভবনটির জন্ম হয়েছিল যুগোস্লাভিয়ার সমাজতান্ত্রিক সময়কালে।

মার্শাল টিটো সড়ক ধরে হাঁটছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল ছাত্রছাত্রীদের বিশাল এক দল—দলবেঁধে কোথাও যাচ্ছে। তাদের নিরাপদ চলাচলের জন্য পুলিশও সড়কের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। কৌতূহল হলো। আমিও তাদের পিছু পিছু হাঁটা শুরু করলাম।

আধুনিক পোশাকের এই তরুণ-তরুণীদের দলে ছিল নানা রকমের বৈচিত্র্য। কারও মাথায় হিজাব, কারও পরনে মিনিস্কার্ট—কেউ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলছে, কেউ নিজের পছন্দের আধুনিক পোশাকে। অথচ পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে কারও মধ্যে কোনো অস্বস্তি বা দূরত্ব চোখে পড়ল না। দৃশ্যটি সারায়েভোর সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সহাবস্থানের এক স্বাভাবিক, দৈনন্দিন ছবি।

কৌতূহল সামলাতে না পেরে দলের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,

—‘তোমরা সবাই কোথায় যাচ্ছ?’

হেসে জানাল, পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই পরীক্ষা-পরবর্তী আনন্দে সবাই দলবেঁধে যাচ্ছে সারায়েভোর ইয়ুথ থিয়েটারে।

বুঝলাম এই বিশাল ছাত্রমিছিল আসলে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়—এ ছিল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তরুণদের একসঙ্গে আনন্দ করতে বেরিয়ে পড়া। তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমিও যেন কিছুক্ষণের জন্য সারায়েভোর তরুণ প্রজন্মের সেই আনন্দযাত্রার একজন নীরব সঙ্গী হয়ে গেলাম।

সারায়েভো—যুদ্ধের ক্ষত—

সারায়েভোর সৌন্দর্য যতটা মুগ্ধ করে, তার ইতিহাস ততটাই ভারী। পাহাড়ঘেরা এই সুন্দর শহরটি নব্বইয়ের দশকে পরিণত হয়েছিল আধুনিক ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াবহ অবরোধের একটি মঞ্চে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল—প্রায় চার বছর সারায়েভোর মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় জীবন কাটিয়েছেন। পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেওয়া বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারের গুলির মধ্যে শহরের সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন পানি, খাবার ও নিরাপত্তার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও মানুষ শহর ছেড়ে পুরোপুরি চলে যায়নি। স্কুল চলেছে, মানুষ কাজ করেছে, সংগীত বাজিয়েছে, বিয়ে হয়েছে, শিশুরা জন্ম নিয়েছে।

আজ শহরের রাস্তায় হাঁটলে সেই যুদ্ধের অনেক চিহ্ন আর চোখে পড়ে না। নতুন ভবন উঠেছে, পুরোনো ভবন সংস্কার হয়েছে, দোকানপাট খুলেছে, মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। কিন্তু কিছু দেয়ালে এখনো গুলির চিহ্ন, কিছু ভবনের গায়ে যুদ্ধের ক্ষত—যেন শহরটি তার অতীতকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে চায়নি।

যুদ্ধ স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখার জন্য সময়ের স্বল্পতার মধ্যেও উঁকি দিলাম কিছু স্থাপনায়। চাইল্ড হুড যুদ্ধ মিউজিয়াম, গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মিউজিয়াম যার অন্যতম। শুনেছি, সারায়েভোর যুদ্ধের ইতিহাসকে সবচেয়ে সরাসরি অনুভব করতে হলে শহরের বাইরে বিমানবন্দরের কাছে টানেল অব সালভেশন বা হোপ দেখতে যেতে হয়। আমার অবশ্য সেই সুযোগ হয়নি।

শহরের বিভিন্ন যুদ্ধস্মৃতি ও জাদুঘরে গিয়ে মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্পগুলোর মধ্যে শিশুদের গল্পগুলো সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। যে বয়সে একটি শিশুর খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে সারায়েভোর শিশুরা জানত কোথায় নিরাপদে লুকাতে হয়, কখন বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক, কোথায় পানি পাওয়া যাবে।

একটি শহরের ওপর যুদ্ধ নেমে এলে শুধু ভবন ধ্বংস হয় না—শৈশবও বদলে যায়।

সারায়েভো রোজেস—

প্রাতিষ্ঠানিক জাদুঘরের চেয়ে আমার মনে বেশি দাগ কেটেছে উন্মুক্ত পথের ‘সারায়েভো রোজেস’। কোনো বাস্তব গোলাপবাগান বা গোলাপ নয়, বরং এটি সারায়েভোর পিচঢালা রাজপথ এবং ফুটপাতে খোদাই করা যুদ্ধের এক একটি জীবন্ত ক্ষত চিহ্ন।

সার্বিয়ান বাহিনীর মর্টার শেল অ্যাসফল্ট বা কংক্রিটের রাস্তার ওপর এসে পড়ত এবং বিস্ফোরণের তীব্রতায় চারপাশের কংক্রিট ফেটে গিয়ে একটি বৃত্তাকার ও ছড়ানো নকশা তৈরি হতো যা দেখতে অনেকটা পাপড়ি ছিঁড়ে যাওয়া রক্তাক্ত গোলাপের মতো মনে হতো। যুদ্ধ শেষ হলে সারায়েভোর নাগরিকেরা যেসব স্থানে একটি মাত্র মর্টার শেলের আঘাতে কমপক্ষে তিনজন বা তার বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলেন, সেই নির্দিষ্ট স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে লাল রেজিন দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়। রক্তের প্রতীক হিসেবে লাল রঙের এই স্মারকগুলোকেই বলা হয় ‘সারায়েভো রোজেস’। বাশচারশিয়া বাজার, মারিকালে বাজার এলাকায় এই লাল স্মৃতিচিহ্নগুলো চোখে পড়ে।

জাদুঘরের ভেতরে যুদ্ধের ইতিহাস পড়া যায়। কিন্তু রাস্তার ওপর একটি লাল সারায়েভো রোজেসের সামনে দাঁড়ালে সেই ইতিহাস হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়।

যুদ্ধের শহর থেকে জীবনের শহর—

আমার দেখা এই সারায়েভোর সৌন্দর্য শুধু পাহাড়, নদী বা স্থাপত্যে নয়, এর সৌন্দর্য তার ইতিহাসের গভীরতার পাশাপাশি মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার গল্পে।

আজ এটি যুদ্ধের শহর নয়, এটি ফিরে আসা জীবনের শহর, ইতিহাসের শহর, স্মৃতির শহর। বাশচারশিয়ার দোকানে মানুষ কেনাকাটা করছে, কফির দোকানে তরুণেরা বসে আড্ডা দিচ্ছে, মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে, শোনা যায় গির্জার ঘণ্টা, ট্রাম চলছে, মিলিয়াতস্কা নদীর তীরে মানুষ হাঁটছে।

অটোমান মসজিদের মিনার, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় ভবনের গম্বুজ, ল্যাটিন ব্রিজের নীরবতা, প্রেসিডেন্সি ভবনের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, বাশচারশিয়ার কফির কাপ, সারায়েভো রোজেস এর লাল ক্ষত—সবকিছু মিলিয়ে সারায়েভো যেন ইউরোপের ইতিহাসের একটি জীবন্ত পৃষ্ঠা।

শোয়েব সাঈদ, কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি বহুজাতিক করপোরেটে ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


সারায়েভো: ইউরোপের জেরুজালেম

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ওয়ারশ থেকে পোলিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৫৭৯ পৌনে দুই ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে।

ইউরোপের বহু শহর দেখেছি; কিন্তু আকাশ থেকে সারায়েভোকে প্রথম দেখার অনুভূতিটি আলাদা। আধুনিক নগরায়ণ এখানে প্রকৃতিকে গ্রাস করেনি, বরং পাহাড়, নদী আর মানুষের বসতি মিলে শহরটিকে যেন একটি প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের মধ্যে গড়ে তুলেছে। পাহাড়ের মাঝখানে গভীর এক উপত্যকা। সেই উপত্যকার বুক চিরে বয়ে চলেছে মিলিয়াতস্কা নদী, আর নদীর দুই পাশ থেকে পাহাড়ের ঢালে ঢালে উঠে গেছে ঘরবাড়ি।

আরেকটি দৃশ্য বিশেষভাবে চোখে পড়ল—পাহাড়ের কোলে কোলে অসংখ্য মসজিদের সরু মিনার। মূলত এক মিনারবিশিষ্ট মসজিদ। অটোমান স্থাপত্যে দুই বা তার বেশি (চার বা ছয়টি) মিনারবিশিষ্ট মসজিদগুলোকে বলা হতো ‘সেলাতিন মসজিদ’ বা রাজকীয় মসজিদ বা সুলতানি মসজিদ।

বলকান অঞ্চলের অটোমান স্থাপত্যের মসজিদগুলোর মধ্যে একটি বিশেষ সাদৃশ্য আছে। বসনিয়ার মসজিদগুলোতে অটোমান স্থাপত্যের সেই পরিচিত ছাপ—কেন্দ্রীয় গম্বুজ, সরু মিনার, সংযত অলংকরণ—বারবার ফিরে আসে। উপমহাদেশের মসজিদগুলোর স্থাপত্যে বলকানের মতো এ রকম অভিন্নতা দেখা যায় না।

বিমান থেকে দেখা সেই মিনারগুলো যেন দূর থেকেই জানিয়ে দিচ্ছিল—এটি ইউরোপের আর দশটি রাজধানীর মতো শুধু একটি আধুনিক শহর নয়; এর আত্মার গভীরে কয়েক শতাব্দীর মুসলিম-অটোমান ইতিহাসও রয়েছে।

সারায়েভো বিমানবন্দর—

সারায়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। ইতিহাসের সাক্ষী বিমানবন্দরটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় ১৯৯২–৯৫ সালের সারায়েভো অবরোধ। বিমানবন্দরের রানওয়ে পেরিয়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরে রানওয়ের নিচ দিয়ে খনন করা সারায়েভো টানেল অবরুদ্ধ শহরের সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে ওঠে। যুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট বিমানবন্দরটি আবার বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।

বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সিতে শহরের দিকে রওনা হলাম।

পাহাড়, নদী ও ইতিহাসের শহর—

ট্যাক্সির জানালা দিয়ে সারায়েভোকে আরও কাছ থেকে দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, কিছু শহরকে বুঝতে হলে তার স্থানীয় রাস্তা দিয়ে যেতে হয়, হাইওয়ে নয়। বিমান থেকে যে পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখেছিলাম, এবার তার সঙ্গে যোগ হলো মানুষের জীবন—রাস্তার পাশে বাড়ি, দোকান, ট্রামলাইন, নদী আর পাহাড়ের গায়ে উঠে যাওয়া বসতি।

সারায়েভো শহরটির আধুনিক নগরজীবনের সঙ্গে অটোমান ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়—দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের স্থাপত্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সরু গলি, বাজার, মসজিদ ও মিনার; অন্যদিকে ইউরোপীয় ধাঁচের প্রশস্ত রাস্তা, প্রশাসনিক ভবন ও ক্যাথেড্রাল।

অটোমান গভর্নর ইসা-বেগ ইশাকোভিচের উদ্যোগে পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সারায়েভোর নগরজীবনের ভিত্তি গড়ে উঠতে শুরু করে। মসজিদ, হামাম, সরাই ও বাজারকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে শহরটি।

ইসা বেগভ হামাম হোটেল—

আমার থাকার জায়গা ইসা বেগভ হামাম হোটেল। হোটেলটির নাম দেখেই ভালো লেগেছিল। কারণ, এটি সাধারণ কোনো আধুনিক হোটেল নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সারায়েভোর প্রতিষ্ঠাতা ইসা-বেগ ইশাকোভিচের নাম এবং একটি ঐতিহাসিক তুর্কি হামামের স্মৃতি।

হোটেলের ভেতরে ঢুকেই আধুনিক হোটেলের চেয়ে অন্য রকম একটা আবহ বিশেষ করে অটোমান ঐতিহ্যের আমেজ পেলাম—কাঠের মেঝে, হাতে খোদাই করা অটোমান নকশার আসবাব, কার্পেট, ঐতিহ্যবাহী সাজসজ্জা। মনে হলো, হোটেলে থাকা নয়, যেন সারায়েভোর ইতিহাসের একটি ছোট অংশের ভেতর রাত কাটাতে এসেছি। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার—নামের সঙ্গে মিল রেখে এখানে ঐতিহাসিক হামামের ঐতিহ্যও ধরে রাখা হয়েছে।

তুর্কি হামাম ম্যাসাজ—

এটি হলো অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের এক অনন্য ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। রোমান ও বাইজেন্টাইন স্নানাগারের আদলে অনুপ্রাণিত হয়ে অটোমানরা একে এক পরম আরামদায়ক ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধি প্রথায় রূপ দেয়। এটি কেবল শরীর পরিষ্কার করার মাধ্যম নয়, বরং পেশির ক্লান্তি দূর করা, রক্ত সঞ্চালন বাড়ানো এবং মানসিক প্রশান্তির একটি প্রাচীন থেরাপি।

হোটেলের অতিথি হিসেবে ৪০ ইউরোতে প্রায় দুই ঘণ্টার ম্যাসাজের ব্যবস্থা হলো। ইসলামিক রেওয়াজ অনুসারে হামাম ম্যাসাজে নারী অংশ নারী দ্বারা পুরুষ অংশ পুরুষ দ্বারা পরিচালিত।

তুর্কি হামাম ম্যাসাজ মূলত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। শরীর গরম করা এবং ঘামানোর পর্যায়ে প্রথমে শরীরকে আর্দ্র ও উষ্ণ বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। ঐতিহ্যবাহী সুতি তোয়ালে জড়িয়ে গ্রাহক হামামের কেন্দ্রস্থলে থাকা একটি বিশাল, উত্তপ্ত মার্বেল পাথরের ওপর শুয়ে থাকেন শরীরের লোমকূপগুলো খুলে যায়, পেশি শিথিল হয় এবং ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে টক্সিন বা বর্জ্য বেরিয়ে আসে।

এরপর শুরু হলো স্ক্রাবিং। খসখসে বিশেষ দস্তানা—কেশে বা kese—দিয়ে শরীর ভালোভাবে ঘষে মৃত চামড়ার স্তর পরিষ্কার করা হলো। তারপর পানি দিয়ে শরীর ধুয়ে শুরু হলো হামামের সবচেয়ে আনন্দদায়ক অংশ—সাবানের ফেনার ম্যাসাজ।

বিশেষ সুতি কাপড়ের ব্যাগে সাবান ও পানি নিয়ে বাতাসে দোলাতে দোলাতে প্রচুর ফেনা তৈরি করা হয়। সেই তুলতুলে সাদা ফেনায় শরীর ঢেকে দিয়ে শুরু হলো ম্যাসাজ। হাত, পা, পিঠ—ধীরে ধীরে শরীরের ক্লান্ত পেশিগুলো যেন আরাম পেতে শুরু করল।

ম্যাসাজ শেষে শরীরকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি ঠান্ডা বা মৃদু উষ্ণ ঘরে বিশ্রাম নিতে হয়। এ সময় ঐতিহ্যবাহী তুর্কি চা পরিবেশন করা হয়।

ম্যাসাজের আগে–পরে প্রবাহিত গরম পানির বাথটাবে (Jacuzzi বা Hot Tub) ইচ্ছেমতো রিল্যাক্স করতে পারেন।

সম্রাটের মসজিদ—

হোটেল থেকে বেরিয়ে হোটেলের পাশেই চোখে পড়ল প্রথম যে ঐতিহাসিক অটোমান স্থাপনা, সেটি হচ্ছে সম্রাটের মসজিদ। এটি সারায়েভোর প্রথম অটোমান লিগ্যাসি। ১৪৫৭ সালে অটোমানরা বসনিয়া জয় করার পর এটিই ছিল সারায়েভোতে নির্মিত প্রথম মসজিদ। মিলিয়াতস্কা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদ ইসা-বেগ ইশাকোভিচ ১৪৫০-এর দশকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ—মেহমেদ দ্য কনকারারের নামে উৎসর্গ করা হয়। রাজকীয় কোষাগারের অর্থায়নে তৈরি হওয়ায় একে ‘ইমপেরিয়াল বা এমপেররস মস্ক’ বলা হয়। আসরের নামাজ পড়ে নিলাম এই মসজিদে।

ফারহাদিজা মসজিদ—

এরপর গেলাম ফারহাদিজা মসজিদে। সারায়েভোর পুরোনো শহরের কেন্দ্রের এই মসজিদও অটোমান যুগের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য। এর সঙ্গে যুক্ত ফারহাদ-বেগের ওয়াক্ফ এবং সারায়েভোর ধর্মীয়-সামাজিক ইতিহাসের দীর্ঘ অধ্যায়। যুদ্ধে এই মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মসজিদ ভবনটি ২০০৪ সালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষিত হয়।

গাজি হুসরেভ বেগ মসজিদ—

এশার আগে আগে পৌঁছালাম সারায়েভোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অটোমান স্থাপনাগুলোর একটির সামনে—গাজি হুসরেভ বেগ মসজিদ। ষোড়শ শতকের এই মসজিদ ১৫৩০–৩১ সালে নির্মিত। গাজি হুসরেভ বেগ ছিলেন বসনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী অটোমান প্রশাসক। তাঁর সমাধিও মসজিদের প্রাঙ্গণে।

এ মসজিদটিকে দেখে মনে হয়েছে মসজিদ নয়, কমিউনিটি সেন্টার। মসজিদের ভিন্ন ভিন্ন পাশে নারী–পুরুষ নামাজ পড়ছে আর মায়েদের সঙ্গে আসা বাচ্চারা খেলছে মসজিদ প্রাঙ্গণে। সাধারণত অটোমান স্থাপত্যের মসজিদের মধ্যে একটি ঝরনা থাকে আর দুপাশে বসার জায়গা থাকে। বসনিয়ার মসজিদে দেখেছি মসজিদ চত্বরে নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসে গল্প করছে, কফি পান করছে, নামাজের সময় যার যার নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে নামাজ পড়ছে।

মসজিদ ব্যবস্থাপনায় পাক ভারত উপমহাদেশের সঙ্গে এই দৃশ্যপটের কোনো মিল নেই। মসজিদের গম্বুজ, মিনার ও প্রাঙ্গণের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, এখানে ধর্মীয় স্থাপত্য শুধু নামাজের জায়গা তৈরি করেনি—একটি শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকেও সংগঠিত করেছে।

বাশচারশিয়া—সারায়েভোর প্রাণ—

তারপর হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম বাশচারশিয়ায়। সরু পাথরের রাস্তা, ছোট ছোট দোকান, কারুশিল্পের পসরা, কফির দোকান, রেস্তোরাঁ—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন আধুনিক ইউরোপের মাঝখানে একটি জীবন্ত অটোমান বাজার। উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে নির্মিত এই প্রাচীন বাজারটিকে এককথায় সারায়েভোর প্রাণ বলা হয়।

‘বাশচারশিয়া’ নামটি এসেছে তুর্কি শব্দ ‘Ba’ (প্রধান বা মাথা) এবং ‘ar’ (বাজার) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘প্রধান বাজার’। ১৪৬২ সালে সারায়েভো শহরের প্রতিষ্ঠাতা ইসা-বেগ ইশাকোভিচ এই বাজারের গোড়াপত্তন করেন। এটি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বাণিজ্যের একটি অন্যতম প্রধান মিলনস্থল বা সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

বাশচারশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই কাঠ ও পাথরের তৈরি ঐতিহাসিক ফোয়ারা সেবিল সারায়েভো শহরের প্রধান প্রতীক। ১৭৫৩ সালে নির্মিত এই ছাতা আকৃতির ফোয়ারাটি থেকে পথচারীরা বিনা মূল্যে জল পান করতেন। এর চারপাশে শত শত পায়রা চড়ে বেড়ায় বলে পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

তামজিয়া বা কামারদের গলি হচ্ছে বাশচারশিয়ার অন্যতম প্রাচীন গলি, যেখানে আজও তামা ও পিতলের তৈজসপত্র, ঐতিহ্যবাহী তুর্কি কফি সেট এবং বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরির ঠুকঠাক শব্দ শোনা যায়। শত বছর ধরে এই শিল্পীরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের কাজের লিগ্যাসি ধরে রেখেছেন।

বাশচারশিয়ার রয়েছে বিশাল রেস্তোরাঁ পাড়া। রাতের খাবারের জন্যে ঢুকে গেলাম এক রেস্তোরাঁয়। বসনীয় চেভাপি না খেলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সোমুনের (বিশেষ রুটি) ভেতরের তুলতুলে সুস্বাদু কাবাব এবং পেঁয়াজ দিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়। ব্যুরেক অর্থাৎ পাতলা পেস্ট্রি বা মচমচে রুটির ভেতরে মাংস, পনির বা পালংশাকের পুর দেওয়া একধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার আর বসনীয় কফির সঙ্গে ‘রাহাত লোকুম’ (Turkish Delight)–এর স্বাদ নিতে ভুল হয়নি।

বাশচারশিয়ার অটোমান ঐতিহ্য থেকে কিছুটা হাঁটলেই শুরু অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান আমলের ইউরোপীয় স্থাপত্য। এই বৈচিত্র্যের জন্যে সারায়েভোকে বলা হয় ‘ইউরোপের জেরুজালেম’।

রাত হয়ে যাওয়ায় আপাতত হোটেলে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। শহরের কেন্দ্রের দিকে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ভবনগুলো, সংসদ ভবন, সরকারি দপ্তর, আধুনিক সারায়েভোর নগরচিত্র আর যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন দেখার ইচ্ছা পরের দিনের জন্য তুলে রাখলাম।

তবে হোটেলে ফেরার আগে হোটেলের কাছেই সারায়েভো সিটি হলের আলো ঝলমলে রূপটি উপভোগ করতে চাইলাম। মিলিয়াতস্কা নদীর ওপারে সিটি হলের ঠিক মুখোমুখি রয়েছে একটি আধুনিক, সোনালি রঙের বড় ত্রিমাত্রিক (3D) অক্ষরের ‘SARAJEVO’ সাইন বা ফলক। এটি মূলত পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় ফটো স্পট। রাতের বেলা এই চমৎকার সাইনটি আলো দিয়ে প্রজ্বলিত করা হয়, যা ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকা জমকালো সিটি হলের সঙ্গে দারুণ এক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। ছবি তুলতে ভুলে যাইনি অবশ্য।

একটি দুর্ভাগা সেতু এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ—

পরের দিন সকালে উঠে হোটেলের সামনেই অবস্থিত ল্যাটিন ব্রিজ দেখতে গেলাম। মিলিয়াতস্কা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট, শান্ত এই অটোমান সেতুটিকে দেখে প্রথমে বোঝার উপায় নেই যে এর আশপাশেই সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড একসময় পৃথিবীর ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

১৯১৪ সালের ২৮ জুন। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রানৎস ফার্ডিনান্ড এবং তাঁর স্ত্রী সোফি সারায়েভো সফরে এসেছিলেন। শহর হল পরিদর্শনের পর তাঁদের গাড়িবহর যখন মিলিয়াতস্কা নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন বসনিয়ান সার্ব জাতীয়তাবাদী তরুণ গাভরিলো প্রিন্সিপ তাঁদের ওপর গুলি চালায়। ঘটনাটি ল্যাটিন ব্রিজের উত্তর প্রান্তে নদীর তীরবর্তী রাস্তার মোড়ে ঘটে।

ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ডের পরিণতি ছিল খুব ভয়াবহ। ফলশ্রুতিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর একে একে ইউরোপের বৃহৎ শক্তিগুলো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। চার বছরের সেই যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ নিহত ও আহত হয়; ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে যায়, কয়েকটি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যায়।

ল্যাটিন ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে সেই ইতিহাসের কথা ভাবলে বিস্ময় জাগে—একটি শহরের একটি ছোট্ট রাস্তা, একটি মুহূর্ত, একজন আততায়ী এবং কয়েকটি গুলি কীভাবে গোটা পৃথিবীকে যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে!

মার্শাল টিটো সড়কে বসনিয়ার প্রেসিডেন্সি ভবন—

ল্যাটিন ব্রিজ দেখে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম সারায়েভোর কেন্দ্রে মার্শাল টিটো সড়কে। সারায়েভোর এই প্রধান সড়কটির নাম যুগোস্লাভিয়ার দীর্ঘদিনের নেতা জোসিপ ব্রজ টিটোর নামে।

এই সড়কের ১৬ নম্বরে চোখে পড়ল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার প্রেসিডেন্সি ভবন। বাইরে থেকে দেখলে প্রথমেই বোঝা যায়, এটি অটোমান আমলের কোনো স্থাপনা নয়। বিশাল প্রাসাদসদৃশ ভবনের সম্মুখভাগে ইউরোপীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যের স্পষ্ট ছাপ।

কিন্তু ভবনটির ইতিহাস শুধু স্থাপত্যের ইতিহাস নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি বসনিয়ার সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। সমাজতান্ত্রিক যুগে এটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্সির আসন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। বসনিয়ার যুদ্ধে সারায়েভো যখন অবরুদ্ধ, চারদিক থেকে গোলাবর্ষণের মধ্যে তখনো এই ভবনের ভেতর থেকেই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও সামরিক কমান্ডের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

আজ এটি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সমষ্টিগত রাষ্ট্রপ্রধানের দপ্তর। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্সি তিন সদস্যের—একজন বসনিয়াক, একজন ক্রোয়াট ও একজন সার্ব সদস্য নিয়ে গঠিত। এই ভবনেই তাঁদের দপ্তর ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

মার্শাল টিটো সড়ক ধরে আরও এগিয়ে এলাম সারায়েভোর আধুনিক প্রশাসনিক এলাকায়। চোখে পড়ল একেবারে ভিন্ন ধরনের স্থাপত্য—বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সংসদ ভবন। ভবনটি শহরের বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্কয়ারে অবস্থিত। ভবনটির জন্ম হয়েছিল যুগোস্লাভিয়ার সমাজতান্ত্রিক সময়কালে।

মার্শাল টিটো সড়ক ধরে হাঁটছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল ছাত্রছাত্রীদের বিশাল এক দল—দলবেঁধে কোথাও যাচ্ছে। তাদের নিরাপদ চলাচলের জন্য পুলিশও সড়কের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে। কৌতূহল হলো। আমিও তাদের পিছু পিছু হাঁটা শুরু করলাম।

আধুনিক পোশাকের এই তরুণ-তরুণীদের দলে ছিল নানা রকমের বৈচিত্র্য। কারও মাথায় হিজাব, কারও পরনে মিনিস্কার্ট—কেউ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলছে, কেউ নিজের পছন্দের আধুনিক পোশাকে। অথচ পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে কারও মধ্যে কোনো অস্বস্তি বা দূরত্ব চোখে পড়ল না। দৃশ্যটি সারায়েভোর সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সহাবস্থানের এক স্বাভাবিক, দৈনন্দিন ছবি।

কৌতূহল সামলাতে না পেরে দলের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,

—‘তোমরা সবাই কোথায় যাচ্ছ?’

হেসে জানাল, পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই পরীক্ষা-পরবর্তী আনন্দে সবাই দলবেঁধে যাচ্ছে সারায়েভোর ইয়ুথ থিয়েটারে।

বুঝলাম এই বিশাল ছাত্রমিছিল আসলে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়—এ ছিল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তরুণদের একসঙ্গে আনন্দ করতে বেরিয়ে পড়া। তাদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে আমিও যেন কিছুক্ষণের জন্য সারায়েভোর তরুণ প্রজন্মের সেই আনন্দযাত্রার একজন নীরব সঙ্গী হয়ে গেলাম।

সারায়েভো—যুদ্ধের ক্ষত—

সারায়েভোর সৌন্দর্য যতটা মুগ্ধ করে, তার ইতিহাস ততটাই ভারী। পাহাড়ঘেরা এই সুন্দর শহরটি নব্বইয়ের দশকে পরিণত হয়েছিল আধুনিক ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়াবহ অবরোধের একটি মঞ্চে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল—প্রায় চার বছর সারায়েভোর মানুষ অবরুদ্ধ অবস্থায় জীবন কাটিয়েছেন। পাহাড়ের ওপর অবস্থান নেওয়া বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারের গুলির মধ্যে শহরের সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন পানি, খাবার ও নিরাপত্তার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যেও মানুষ শহর ছেড়ে পুরোপুরি চলে যায়নি। স্কুল চলেছে, মানুষ কাজ করেছে, সংগীত বাজিয়েছে, বিয়ে হয়েছে, শিশুরা জন্ম নিয়েছে।

আজ শহরের রাস্তায় হাঁটলে সেই যুদ্ধের অনেক চিহ্ন আর চোখে পড়ে না। নতুন ভবন উঠেছে, পুরোনো ভবন সংস্কার হয়েছে, দোকানপাট খুলেছে, মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে। কিন্তু কিছু দেয়ালে এখনো গুলির চিহ্ন, কিছু ভবনের গায়ে যুদ্ধের ক্ষত—যেন শহরটি তার অতীতকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে চায়নি।

যুদ্ধ স্মৃতিচিহ্নগুলো দেখার জন্য সময়ের স্বল্পতার মধ্যেও উঁকি দিলাম কিছু স্থাপনায়। চাইল্ড হুড যুদ্ধ মিউজিয়াম, গণহত্যা এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ মিউজিয়াম যার অন্যতম। শুনেছি, সারায়েভোর যুদ্ধের ইতিহাসকে সবচেয়ে সরাসরি অনুভব করতে হলে শহরের বাইরে বিমানবন্দরের কাছে টানেল অব সালভেশন বা হোপ দেখতে যেতে হয়। আমার অবশ্য সেই সুযোগ হয়নি।

শহরের বিভিন্ন যুদ্ধস্মৃতি ও জাদুঘরে গিয়ে মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্পগুলোর মধ্যে শিশুদের গল্পগুলো সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়। যে বয়সে একটি শিশুর খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে সারায়েভোর শিশুরা জানত কোথায় নিরাপদে লুকাতে হয়, কখন বাইরে যাওয়া বিপজ্জনক, কোথায় পানি পাওয়া যাবে।

একটি শহরের ওপর যুদ্ধ নেমে এলে শুধু ভবন ধ্বংস হয় না—শৈশবও বদলে যায়।

সারায়েভো রোজেস—

প্রাতিষ্ঠানিক জাদুঘরের চেয়ে আমার মনে বেশি দাগ কেটেছে উন্মুক্ত পথের ‘সারায়েভো রোজেস’। কোনো বাস্তব গোলাপবাগান বা গোলাপ নয়, বরং এটি সারায়েভোর পিচঢালা রাজপথ এবং ফুটপাতে খোদাই করা যুদ্ধের এক একটি জীবন্ত ক্ষত চিহ্ন।

সার্বিয়ান বাহিনীর মর্টার শেল অ্যাসফল্ট বা কংক্রিটের রাস্তার ওপর এসে পড়ত এবং বিস্ফোরণের তীব্রতায় চারপাশের কংক্রিট ফেটে গিয়ে একটি বৃত্তাকার ও ছড়ানো নকশা তৈরি হতো যা দেখতে অনেকটা পাপড়ি ছিঁড়ে যাওয়া রক্তাক্ত গোলাপের মতো মনে হতো। যুদ্ধ শেষ হলে সারায়েভোর নাগরিকেরা যেসব স্থানে একটি মাত্র মর্টার শেলের আঘাতে কমপক্ষে তিনজন বা তার বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলেন, সেই নির্দিষ্ট স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে লাল রেজিন দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়। রক্তের প্রতীক হিসেবে লাল রঙের এই স্মারকগুলোকেই বলা হয় ‘সারায়েভো রোজেস’। বাশচারশিয়া বাজার, মারিকালে বাজার এলাকায় এই লাল স্মৃতিচিহ্নগুলো চোখে পড়ে।

জাদুঘরের ভেতরে যুদ্ধের ইতিহাস পড়া যায়। কিন্তু রাস্তার ওপর একটি লাল সারায়েভো রোজেসের সামনে দাঁড়ালে সেই ইতিহাস হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়।

যুদ্ধের শহর থেকে জীবনের শহর—

আমার দেখা এই সারায়েভোর সৌন্দর্য শুধু পাহাড়, নদী বা স্থাপত্যে নয়, এর সৌন্দর্য তার ইতিহাসের গভীরতার পাশাপাশি মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতার গল্পে।

আজ এটি যুদ্ধের শহর নয়, এটি ফিরে আসা জীবনের শহর, ইতিহাসের শহর, স্মৃতির শহর। বাশচারশিয়ার দোকানে মানুষ কেনাকাটা করছে, কফির দোকানে তরুণেরা বসে আড্ডা দিচ্ছে, মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে, শোনা যায় গির্জার ঘণ্টা, ট্রাম চলছে, মিলিয়াতস্কা নদীর তীরে মানুষ হাঁটছে।

অটোমান মসজিদের মিনার, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় ভবনের গম্বুজ, ল্যাটিন ব্রিজের নীরবতা, প্রেসিডেন্সি ভবনের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস, বাশচারশিয়ার কফির কাপ, সারায়েভো রোজেস এর লাল ক্ষত—সবকিছু মিলিয়ে সারায়েভো যেন ইউরোপের ইতিহাসের একটি জীবন্ত পৃষ্ঠা।

শোয়েব সাঈদ, কানাডার মন্ট্রিয়লে একটি বহুজাতিক করপোরেটে ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত