ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
Advance News

মা ইলিশ পাহারায় যে ‘বাহিনী’ দরকার



মা ইলিশ পাহারায় যে ‘বাহিনী’ দরকার
মা ইলিশ পাহারায় যে ‘বাহিনী’ দরকার

রাত তখন গভীর। মেঘনার কোনো দুর্গম চরের পাশে প্রশাসনের স্পিডবোট টহল দিয়ে ফিরে গেছে। ইঞ্জিনের শব্দ মিলিয়ে যেতেই অন্ধকারে নামতে শুরু করে ডিঙি নৌকা, পানিতে ফেলা হয় কারেন্ট জাল। ভোর হওয়ার আগেই মা ইলিশ উঠে যায় নৌকায়, পৌঁছে যায় গোপন আড়তে।

এই দৃশ্য নতুন নয়। ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রশ্ন হলো, প্রশাসন যখন থাকে না, তখন নদী পাহারা দেবে কে? উত্তর স্পষ্ট: নদীর পাড়ের মানুষ, অর্থাৎ জেলে ও সচেতন জনতা নিজেরাই।

এই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ আহরিত হয়েছিল।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৫ লাখ টনে। এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা সাফল্য এখন উল্টো পথে হাঁটছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে নির্বিচারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন।

সরকারি নজরদারির সীমাবদ্ধতা বুঝতে কয়েকটি সংখ্যাই যথেষ্ট। গত বছরের নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ-অধ্যুষিত ৩৭টি জেলার ১৬৫টি উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০টি জেলে পরিবারকে খাদ্যসহায়তার আওতায় আনা হয়েছিল।

এত বিস্তীর্ণ এলাকায় এত মানুষ, তার সঙ্গে অসংখ্য শাখানদী, খাল ও চর। অল্প কয়েকটি স্পিডবোট দিয়ে ২২ দিন দিনরাত এসব এলাকা পাহারা দেওয়া কার্যত অসম্ভব। মৎস্য অধিদপ্তরের জনবল ও নৌযান সীমিত।

নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী টহল দেয় ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ঘাটে, প্রতিটি রাতে উপস্থিত থাকা তাদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

পটুয়াখালী ও বরগুনায় কঠোর অভিযান চলার মধ্যেও রাতের অন্ধকারে জেলেদের ইলিশ ধরার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদে নিষেধাজ্ঞার সময়ও মা ইলিশ ধরা ও কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।

জব্দ করা জালের পরিমাণও সমস্যার গভীরতা তুলে ধরে। চাঁদপুরে এক রাতের অভিযানেই নৌ পুলিশ ৩৫ জন জেলেকে আটক করেছে এবং ৫০ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করেছে। পটুয়াখালীতে এক দিনেই ২৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ৯৩টি অভিযান চালিয়েছে।

এসব ঘটনা প্রশাসনের তৎপরতার প্রমাণ। একই সঙ্গে এগুলো বুঝিয়ে দেয়, অভিযানে যত জাল ধরা পড়ে, তার বাইরে আরও কত জাল নদীতে থেকে যায়। শিবচরে পদ্মা নদীতে অভিযানের সময় অবৈধ কারেন্ট জালে আটকা পড়ে মারা যাওয়া একটি ডলফিনও উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ জাল শুধু ইলিশ নয়, পুরো নদীর প্রাণবৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করছে।

জনগণের পাহারা যে কার্যকর হতে পারে, তার প্রমাণ আমাদের দেশেই আছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ডফিশের যৌথ ইকোফিশ প্রকল্পের আওতায় ইলিশ অভয়াশ্রম-সংলগ্ন ১৩৬টি জেলে গ্রামে সহব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছিল।

সেখানে ৫৭৫টি ইলিশ সংরক্ষণ দল গঠন করা হয় এবং পদ্মা-মেঘনার ছয়টি অভয়াশ্রমে সহব্যবস্থাপনা কমিটি গড়ে ওঠে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় ৪০০ জন কমিউনিটি ফিশগার্ড নদী পাহারায় যুক্ত ছিলেন।

প্রকল্পের শেষ চার বছর, অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত, টানা ইলিশের বাম্পার উৎপাদন হয়েছিল। জেলেরা যখন নিজেদের সম্পদের মালিকানা অনুভব করেন, তখন তাঁরাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে কার্যকর পাহারাদার।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এই কাঠামো ধরে রাখা যায়নি।

‘অবৈধ জাল বন্ধ করো, মৎস্য সম্পদ রক্ষা করো’ স্লোগান নিয়ে আমরা যে নাগরিক উদ্যোগ শুরু করেছিলাম, সেখান থেকেও একই শিক্ষা পেয়েছি।

ঘাটের মানুষ জানেন, কোন নৌকা রাতে নদীতে নামে, কোন আড়তে মাছ যায়, কোন দোকানে কারেন্ট জাল বিক্রি হয়। এই তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছানোর নিরাপদ পথ তৈরি করা গেলে নজরদারির চেহারাই বদলে যাবে।

এ বছরও বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে মা ইলিশ সংরক্ষণে নাগরিক উদ্যোগের অংশীজন সভায় বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জেলে প্রতিনিধিরা একই কথা বলেছেন: সরকারি অভিযানের পাশাপাশি জনগণের পাহারা ছাড়া মা ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়।

তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, প্রতিটি জেলে গ্রাম ও মাছঘাটে জেলেদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী ‘ইলিশ পাহারা দল’ গঠন করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার রাতগুলোতে এই দলের সদস্যরা পালা করে নদী ও ঘাটে নজর রাখবেন।

বিশেষ করে দুর্গম চর ও শাখানদীগুলোতে নজরদারি জোরদার করতে হবে, যেখানে প্রশাসনের নৌযান সহজে পৌঁছাতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, জনগণের এই পাহারার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি যোগাযোগ থাকতে হবে। একটি হটলাইন বা নির্দিষ্ট মুঠোফোন নম্বরে খবর পেলেই নৌ পুলিশ বা কোস্টগার্ড দ্রুত সাড়া দেবে। তথ্যদাতার পরিচয়ও কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে। জনতা নজরদারি করবে, আর আইন প্রয়োগ করবে রাষ্ট্র।

তৃতীয়ত, পাহারায় অংশ নেওয়া জেলেদের প্রণোদনা দিতে হবে। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই তাঁদের খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

পাশাপাশি পাহারা দলের সদস্যদের সম্মানী ও স্বীকৃতি দিতে হবে এবং পরবর্তী সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। যে জেলে নিজের পেটের খাবার জোগাড় করতে না পেরেও নদী পাহারা দেবেন, রাষ্ট্রকে তাঁর পাশে দাঁড়াতেই হবে।

চতুর্থত, নজরদারি শুধু নদীতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মাছের আড়ত, বরফকল, সড়কপথে মাছ পরিবহন এবং অবৈধ জাল বিক্রির দোকানেও স্থানীয় মানুষের নজরদারি থাকতে হবে।

পঞ্চমত, ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। মা ইলিশ ধরা যাতে সামাজিকভাবেও নিন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়, সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ষষ্ঠত, নিষেধাজ্ঞা শেষে ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কোথায় কতটি অভিযান হয়েছে, কতটি অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং কোন এলাকায় জনগণের পাহারা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা জানাতে হবে। এতে ভালো উদ্যোগগুলোর উদাহরণ অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে, পাশাপাশি নজরদারির দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, জেলেদের নিজেদের বুঝতে হবে, আজ যে মা ইলিশটি তিনি রক্ষা করছেন, কাল সেটিই অসংখ্য ইলিশ হয়ে তাঁর জালে ফিরবে। নিষেধাজ্ঞা জেলেদের শত্রু নয়; বরং এটি তাঁদের ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য একটি বিনিয়োগ।

এই উপলব্ধি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আস্থা, অংশগ্রহণ ও ন্যায্য সহায়তার মধ্য দিয়েই তা গড়ে তুলতে হয়।

ইলিশ কোনো একক সংস্থার সম্পদ নয়; এটি আমাদের সবার। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ এবং জেলে-জনতার পাহারা যখন একসঙ্গে কাজ করবে, তখনই রাতের অন্ধকারে নদীতে নামানো অবৈধ জাল ঠেকানো সম্ভব হবে। এবারের ২২ দিন হোক সেই জাগরণের সূচনা।

মীর মোহাম্মদ আলী সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

* ই-মেইল: [email protected]

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

Advance News

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


মা ইলিশ পাহারায় যে ‘বাহিনী’ দরকার

প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রাত তখন গভীর। মেঘনার কোনো দুর্গম চরের পাশে প্রশাসনের স্পিডবোট টহল দিয়ে ফিরে গেছে। ইঞ্জিনের শব্দ মিলিয়ে যেতেই অন্ধকারে নামতে শুরু করে ডিঙি নৌকা, পানিতে ফেলা হয় কারেন্ট জাল। ভোর হওয়ার আগেই মা ইলিশ উঠে যায় নৌকায়, পৌঁছে যায় গোপন আড়তে।

এই দৃশ্য নতুন নয়। ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া মা ইলিশ রক্ষার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রশ্ন হলো, প্রশাসন যখন থাকে না, তখন নদী পাহারা দেবে কে? উত্তর স্পষ্ট: নদীর পাড়ের মানুষ, অর্থাৎ জেলে ও সচেতন জনতা নিজেরাই।

এই প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ইলিশ আহরিত হয়েছিল।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৫ লাখ টনে। এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা সাফল্য এখন উল্টো পথে হাঁটছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে নির্বিচারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন।

সরকারি নজরদারির সীমাবদ্ধতা বুঝতে কয়েকটি সংখ্যাই যথেষ্ট। গত বছরের নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ-অধ্যুষিত ৩৭টি জেলার ১৬৫টি উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০টি জেলে পরিবারকে খাদ্যসহায়তার আওতায় আনা হয়েছিল।

এত বিস্তীর্ণ এলাকায় এত মানুষ, তার সঙ্গে অসংখ্য শাখানদী, খাল ও চর। অল্প কয়েকটি স্পিডবোট দিয়ে ২২ দিন দিনরাত এসব এলাকা পাহারা দেওয়া কার্যত অসম্ভব। মৎস্য অধিদপ্তরের জনবল ও নৌযান সীমিত।

নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী টহল দেয় ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি ঘাটে, প্রতিটি রাতে উপস্থিত থাকা তাদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

পটুয়াখালী ও বরগুনায় কঠোর অভিযান চলার মধ্যেও রাতের অন্ধকারে জেলেদের ইলিশ ধরার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদে নিষেধাজ্ঞার সময়ও মা ইলিশ ধরা ও কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।

জব্দ করা জালের পরিমাণও সমস্যার গভীরতা তুলে ধরে। চাঁদপুরে এক রাতের অভিযানেই নৌ পুলিশ ৩৫ জন জেলেকে আটক করেছে এবং ৫০ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করেছে। পটুয়াখালীতে এক দিনেই ২৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ৯৩টি অভিযান চালিয়েছে।

এসব ঘটনা প্রশাসনের তৎপরতার প্রমাণ। একই সঙ্গে এগুলো বুঝিয়ে দেয়, অভিযানে যত জাল ধরা পড়ে, তার বাইরে আরও কত জাল নদীতে থেকে যায়। শিবচরে পদ্মা নদীতে অভিযানের সময় অবৈধ কারেন্ট জালে আটকা পড়ে মারা যাওয়া একটি ডলফিনও উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ জাল শুধু ইলিশ নয়, পুরো নদীর প্রাণবৈচিত্র্যকেই ধ্বংস করছে।

জনগণের পাহারা যে কার্যকর হতে পারে, তার প্রমাণ আমাদের দেশেই আছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মৎস্য অধিদপ্তর ও ওয়ার্ল্ডফিশের যৌথ ইকোফিশ প্রকল্পের আওতায় ইলিশ অভয়াশ্রম-সংলগ্ন ১৩৬টি জেলে গ্রামে সহব্যবস্থাপনা চালু করা হয়েছিল।

সেখানে ৫৭৫টি ইলিশ সংরক্ষণ দল গঠন করা হয় এবং পদ্মা-মেঘনার ছয়টি অভয়াশ্রমে সহব্যবস্থাপনা কমিটি গড়ে ওঠে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় ৪০০ জন কমিউনিটি ফিশগার্ড নদী পাহারায় যুক্ত ছিলেন।

প্রকল্পের শেষ চার বছর, অর্থাৎ ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত, টানা ইলিশের বাম্পার উৎপাদন হয়েছিল। জেলেরা যখন নিজেদের সম্পদের মালিকানা অনুভব করেন, তখন তাঁরাই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে কার্যকর পাহারাদার।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এই কাঠামো ধরে রাখা যায়নি।

‘অবৈধ জাল বন্ধ করো, মৎস্য সম্পদ রক্ষা করো’ স্লোগান নিয়ে আমরা যে নাগরিক উদ্যোগ শুরু করেছিলাম, সেখান থেকেও একই শিক্ষা পেয়েছি।

ঘাটের মানুষ জানেন, কোন নৌকা রাতে নদীতে নামে, কোন আড়তে মাছ যায়, কোন দোকানে কারেন্ট জাল বিক্রি হয়। এই তথ্য প্রশাসনের কাছে পৌঁছানোর নিরাপদ পথ তৈরি করা গেলে নজরদারির চেহারাই বদলে যাবে।

এ বছরও বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে মা ইলিশ সংরক্ষণে নাগরিক উদ্যোগের অংশীজন সভায় বিশেষজ্ঞ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জেলে প্রতিনিধিরা একই কথা বলেছেন: সরকারি অভিযানের পাশাপাশি জনগণের পাহারা ছাড়া মা ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়।

তাহলে করণীয় কী? প্রথমত, প্রতিটি জেলে গ্রাম ও মাছঘাটে জেলেদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী ‘ইলিশ পাহারা দল’ গঠন করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার রাতগুলোতে এই দলের সদস্যরা পালা করে নদী ও ঘাটে নজর রাখবেন।

বিশেষ করে দুর্গম চর ও শাখানদীগুলোতে নজরদারি জোরদার করতে হবে, যেখানে প্রশাসনের নৌযান সহজে পৌঁছাতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, জনগণের এই পাহারার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি যোগাযোগ থাকতে হবে। একটি হটলাইন বা নির্দিষ্ট মুঠোফোন নম্বরে খবর পেলেই নৌ পুলিশ বা কোস্টগার্ড দ্রুত সাড়া দেবে। তথ্যদাতার পরিচয়ও কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে। জনতা নজরদারি করবে, আর আইন প্রয়োগ করবে রাষ্ট্র।

তৃতীয়ত, পাহারায় অংশ নেওয়া জেলেদের প্রণোদনা দিতে হবে। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই তাঁদের খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

পাশাপাশি পাহারা দলের সদস্যদের সম্মানী ও স্বীকৃতি দিতে হবে এবং পরবর্তী সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। যে জেলে নিজের পেটের খাবার জোগাড় করতে না পেরেও নদী পাহারা দেবেন, রাষ্ট্রকে তাঁর পাশে দাঁড়াতেই হবে।

চতুর্থত, নজরদারি শুধু নদীতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মাছের আড়ত, বরফকল, সড়কপথে মাছ পরিবহন এবং অবৈধ জাল বিক্রির দোকানেও স্থানীয় মানুষের নজরদারি থাকতে হবে।

পঞ্চমত, ইউনিয়ন পরিষদ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় গণমাধ্যমকে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। মা ইলিশ ধরা যাতে সামাজিকভাবেও নিন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়, সে জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ষষ্ঠত, নিষেধাজ্ঞা শেষে ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে। কোথায় কতটি অভিযান হয়েছে, কতটি অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং কোন এলাকায় জনগণের পাহারা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা জানাতে হবে। এতে ভালো উদ্যোগগুলোর উদাহরণ অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে, পাশাপাশি নজরদারির দুর্বলতাগুলোও চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, জেলেদের নিজেদের বুঝতে হবে, আজ যে মা ইলিশটি তিনি রক্ষা করছেন, কাল সেটিই অসংখ্য ইলিশ হয়ে তাঁর জালে ফিরবে। নিষেধাজ্ঞা জেলেদের শত্রু নয়; বরং এটি তাঁদের ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য একটি বিনিয়োগ।

এই উপলব্ধি জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। আস্থা, অংশগ্রহণ ও ন্যায্য সহায়তার মধ্য দিয়েই তা গড়ে তুলতে হয়।

ইলিশ কোনো একক সংস্থার সম্পদ নয়; এটি আমাদের সবার। রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ এবং জেলে-জনতার পাহারা যখন একসঙ্গে কাজ করবে, তখনই রাতের অন্ধকারে নদীতে নামানো অবৈধ জাল ঠেকানো সম্ভব হবে। এবারের ২২ দিন হোক সেই জাগরণের সূচনা।

মীর মোহাম্মদ আলী সহকারী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

* ই-মেইল: [email protected]


Advance News

সংবাদ পরিবেশনার আধুনিক সমাধান

কপিরাইট © ২০২৬ Advance News । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত